অনলাইন শিক্ষা কাজে আসছে কি

শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন যোগ করেছে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাস। স্কুল বন্ধ। স্কুলে গিয়ে পড়ার বদলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইন শ্রেণিকক্ষের পড়ায় অংশ নিচ্ছে বিশ্বের লাখো শিক্ষার্থী। অনলাইনে ক্লাস করাচ্ছেন শিক্ষকেরা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ক্লাসে বসে পড়ার প্রাচীন ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন। বিশ্বের অনেক স্থানেই এখন স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা নতুন মাত্রা পেয়েছে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনের পর্দায়।

জাতিসংঘের বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা সংস্থা ইউনেসকো বলেছে, চলতি সপ্তাহ নাগাদ কোভিড-১৯–এর কারণে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ৮৫ কোটি শিক্ষার্থী এখন শিক্ষা বা কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে করোনার কারণে বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন ও প্রভাব নিয়ে মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার ডটকমে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা খাতের আর্থসামাজিক অবস্থা ও অনলাইন শিক্ষার বিশদ বিবরণ সেখানে আছে।

বিশ্বের অনেক দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর নেই ইন্টারনেট সংযোগ। এমনকি অনলাইনে পড়াশোনা করার জন্য নেই স্মার্টফোনও। তাই প্লাস্টিক বেচে ইন্টারনেট খরচে জোগাড় করছে ইন্দোনেশিয়ার দিমাস আনোয়ার পুত্রা। আর ইন্টারনেট সংযোগ পেতে গাছের ওপর ওঠার খবরও আমরা গণমাধ্যমে পড়েছি। নেচারের এই প্রতিবেদন আবারও সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
default-image

শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর করোনার পূর্ণ প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদেরা। তাঁরা চাইছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও শিক্ষার উপযোগী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও সরবরাহ করতে।

শিক্ষা খাতে বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার দীঘদিন ধরে রয়েছে। মহামারির অনেক আগে থেকেই বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উন্মুক্ত কোর্স বা অনলাইনে শ্রেণি পাঠদানে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। আর্থসামাজিক ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি পাঠদানের বিকল্প পন্থা হিসেবে এ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। করোনার কারণে এখন সেই বিকল্প ব্যবস্থাই শিক্ষাকাঠামোয় প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছে। যদিও পাশাপাশি এ পরিবর্তিত ব্যবস্থার প্রভাবগুলোর আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি।

করোনার কারণে শুরু হওয়া অনলাইন ক্লাসের বৈষম্য ও ত্রুটির রয়েছে। এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য হুমকিও হয়ে উঠেছে।

মহামারি শুরুর আগে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো ২০৩০ সাল নাগাদ সব শিশুর জন্য ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দিকে ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহের মধ্যে এটি (প্রাথমিক শিক্ষা) অর্জনের সম্ভাবনাই সবচেয়ে জোরালোভাবে দেখা যাচ্ছিল।

default-image

কিন্তু করোনাভাইরাস সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন না হওয়ার ঝুঁকিটাই বেশি। আর যদি লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তবে এর দায় করোনারই।

বিশ্বের অনেক দেশে ইতিমধ্যেই স্কুলে পড়া শুরু হয়েছে। তবে দেশুগুলো অধিকাংশই উন্নত বিশ্বের। এখনো বিদ্যালয় বন্ধ ৫২টি দেশে। এ অবস্থায় ইউনেসকো মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দৈনিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এসব কথা জানিয়েছে।

অনলাইন ক্লাসের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বিশ্বের দক্ষিণ গোলার্ধের নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলো। মোদ্দা কথা, করোনার আপাতসমাধান অনলাইন শিক্ষায় যে বিল্পব চলছে, তাতে অংশ নিতে পারছে না এসব দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যাসহ নানা কারণেই এমনটা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্যমতে, বিশ্বের ৩৬ কোটি শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট সংযোগ নেই। উন্নয়নশীল অনেক দেশের সরকার এ কারণে ব্রডব্যান্ডের পাশাপাশি টেলিভিশন ও রেডিওতে বিকল্প ক্লাস বা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে।

default-image

বিশ্বের যেসব দেশের করোনার প্রকোপ বেশি বা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি, সে দেশগুলো স্কুলে খুলে দিতে পারেনি। সামাজিক দূরত্ব মানার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের যথেষ্ট অভাব আছে অনেক দেশে। স্কুলের ক্লাস শুরু করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তাই একটু কঠিনই। উন্নত দেশগুলো শুরু করছে ধীরে ধীরে। উন্নত হোক বা অনুন্নত দেশ হোক, দরিদ্রতম পরিবার ইন্টারনেট সংযোগবিহীন থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এ বৈষম্য দিন দিন আরও বেড়ে যাবে।
শিক্ষাজীবন শেষে যেহেতু পরবর্তী সময়ে চাকরি, আয় এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে, তাই শিক্ষার বঞ্চনা সারা জীবন ভোগ করতে হবে অগণিত প্রজন্মকে। এই বঞ্চনা সারানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া বাজারে টিকা এলেও উন্নয়নশীল দেশের সব মানুষের কাছে তা পৌঁছাতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে। আর এ ধারণা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। তাই মহামারি পরিস্থিতিতে কীভাবে সর্বজনীন শিক্ষাপ্রযুক্তির উন্মেষ ঘটানো যায়, তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বিশেষজ্ঞদের।

তবে এ অবস্থা সবখানে এক রকম নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটু উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফ্রি অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মহামারির কারণে বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ঘিরে। তারা যদি এখন শিক্ষিত হওয়ারই সুযোগ না পায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার পাঠ গ্রহণইবা পরবর্তী সময়ে কীভাবে করবে?

default-image
শিক্ষাজীবন শেষে পরবর্তী সময়ে চাকরি, আয় এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে, তাই শিক্ষার বঞ্চনা সারা জীবন ভোগ করতে হবে অগণিত প্রজন্মকে। এই বঞ্চনা সারানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া বাজারে টিকা এলেও উন্নয়নশীল দেশের সব মানুষের কাছে তা পৌঁছাতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে

বাস্তবতা হলো, করেনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে আরও অনেক দিন। অনলাইন শিক্ষাই তাই প্রকৃত বিকল্প হিসেবে চালিয়ে নিতে হবে। আর ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগ যদি সরাসরি শিক্ষক, পাঠাগার এবং গবেষণাগারের বিকল্প হয়; তাহলে বর্তমান ব্যবস্থায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী এর কোনো সুবিধাই গ্রহণ করতে পারবে না; বিশেষত যাদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহ অর্থনৈতিক মন্দায় দারুণ সংকটে। সবকিছু মিলিয়ে এই মুহূর্তে শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দে ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রযুক্তি উপকরণ সরবরাহের কোনো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোকে এখন থেকেই এ ব্যাপারে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রকল্প তৈরির পরামর্শ দিচ্ছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0