টিম সামির

শুরুতে বিজ্ঞাপনশিল্পে কাজ করতেন সামির আসরান রাহমান। ২০১১ সালে তাঁর ‘সিসিমপুর’–এর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হলো। সে সময় ছোট অ্যানিমেশনগুলোর গল্প লিখতেন তিনি। পরিচালনা করতেন। ‘সেই সময়ে কয়েকজন গুণী অ্যানিমেটর ও কার্টুনিস্টের সঙ্গে পরিচয় হলো। কাজ করে ভালো লাগল। মনে মনে ভাবছিলাম, এদের সবাইকে নিয়ে একটা দল করতে পারলে মন্দ হতো না। একটু গুছিয়ে নিয়ে ২০১৩ সালে শুরু করি “মাইটি পাঞ্চ স্টুডিও”। উদ্দেশ্য ছিল—কিছু অ্যানিমে বা কার্টুন চরিত্র বানানো, যেগুলোকে আমরা নিজেদের বলে দাবি করতে পারব। ধার করা কোনো কার্টুন চরিত্রের মুখে বাংলা না শুনে নিজেদের তৈরি চরিত্রে বাংলা শোনাটা আসলে অন্য রকম আনন্দের। এটা ঠিক যে আমরা বাণিজ্যিক কাজ করি, বিজ্ঞাপনের কাজ করি। তবে পাশাপাশি আমরা নিজেদের কল্পনার বাংলা চরিত্রগুলো ডিজাইন করি, অ্যানিমেশনে রূপ দিই।’

default-image

মাইটি পাঞ্চ স্টুডিওর তৈরি চরিত্রগুলো যে একান্তই নিজেদের, সেটা চরিত্রের নাম শুনলেই বোঝা যায়—‘ডালিম কুমার’, ‘ক্যাপ্টেন কাঁঠাল’, ‘মিস শাবাশ’। অ্যানিমেশনের পাশাপাশি এসব চরিত্রের কমিকস নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য, দুই দেশেই কাজ করতে চেষ্টা করছেন তাঁরা। সামির বলছিলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশি চরিত্রগুলো দিয়ে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করা যায়, সে সুযোগও খুঁজছি। ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংকের মতো বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আমরা বাণিজ্যিক কাজ করেছি। সামনে হয়তো আরও হবে।’

টেপা পুতুল যখন অ্যানিমেশনে

ঘুরেফিরে দেশের বেশ কজন কার্টুনিস্ট ও অ্যানিমেটর কাজ করেছেন মাইটি পাঞ্চ স্টুডিওর সঙ্গে। কেউ হয়তো প্রকল্পভিত্তিক কাজ করেছেন। কেউ যুক্ত আছেন বছরজুড়ে। দীর্ঘদিন মাইটি পাঞ্চ স্টুডিওর কনসেপ্ট আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন কার্টুনিস্ট আসিফুর রহমান। এখন কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে থ্রিডি মডেলিং, আর্ট অ্যান্ড অ্যানিমেশন নিয়ে পড়ছেন তিনি। মৌলিক ও দেশি চরিত্র দাঁড় করানোর চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আসিফ বলেন, ‘যেমন ধরুন, আমরা টেপা পুতুল নিয়ে কাজ করেছি। যেহেতু এটা আমাদের পরিচিত চরিত্র, আমাদের কাজ ছিল একে আমাদের স্টাইলে উপস্থাপন করা। চরিত্রটি নির্মাণের সময় বেশ কিছুদিন টেপা পুতুল নিয়ে ভেবেছি, দেখেছি। আমাদের অফিসেও বেশ কয়েকটা টেপা পুতুল আছে। ওদের হাত-পা নাড়ানো যায় না। আঙুল নেই, শুধু দাগ কাটা। এ রকম প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হয়েছে। সুপারহিরো ক্যারেক্টার দাঁড় করাতে গিয়েও আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চেষ্টা করেছি।’

default-image

একটু একটু করে তাঁদের পরিচিতি বাড়ছে। সামির যেমন বলছিলেন, ‘“ঢাকা কমিকন”–এ আমাকে একবার বিচারক করা হয়েছিল। আমি আমার মতো কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটা ছোট্ট ছেলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। দেখলাম ও আমাদের কমিকসের চরিত্র “শাবাশ” সেজে এসেছে। এটা দেখে খুব ভালো লেগেছিল।’

হেসেখেলে অফিস

অ্যানিমেশনগুলোর গল্প লেখার কাজটা মূলত সামিরই করেন। তবে শুরুতেই গল্পের প্রেক্ষাপট নিয়ে দলের সবার সঙ্গে আলোচনা করেন, পরামর্শ নেন। এরপর কাজ ভাগ হয়ে যায়। কনসেপ্ট আর্টিস্ট রোমেল বড়ুয়া বলছিলেন, ‘আসল মজাটা হয় ডায়ালগ তৈরির সময়। সামির ভাই তাঁর গল্প অনুযায়ী আমাদের দিকে যেকোনো একটা সংলাপ ছুড়ে দেন। আমরাও উত্তর দিই। এভাবে মুখে মুখে স্ক্রিপ্ট দাঁড়িয়ে যায়।’

দলটির প্রায় সবাই-ই বলেন, স্টুডিওতে হাসি-আনন্দের মধ্যেই কাজ চলতে থাকে। কেমন? দলের সদস্য, অ্যানিমেটর ঐশিক জাওয়াদ বলেন, ‘অফিসে একটা গেমিং জোন আছে। লাঞ্চ টাইমে তাড়াতাড়ি খেয়ে, বাকি সময়টা গেম খেলতে ব্যস্ত হয়ে যায় সবাই। করোনার সময়ে অফিস যখন বন্ধ ছিল, এই মজাগুলো খুব মিস করেছি।’ আরেক সদস্য জুনাইদ ইকবাল ইশমাম বলছিলেন, ‘কারও কোনো কাজ শেষ হলে আমরা সার্ভারে আপলোড করি। সবার ডিজাইন সবাই দেখে, পরামর্শ দেয়। ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগে।’

ভবিষ্যতে নেটফ্লিক্সের মতো বড় প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও কাজ করার স্বপ্ন দেখে এই তরুণেরা। তাঁরা মনে করেন, বড় বিনিয়োগ পেলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়ার একটা সুযোগ পাবেন। তখন হয়তো সত্যিই ডালিম কুমার উড়ে বেড়াবে দেশ থেকে দেশান্তরে।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন