default-image

পেশাজগতে ইদানীং ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা শব্দযুগল বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। নিজের ও অন্যের আবেগগুলো জানা, বোঝা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা ও পরিস্থিতি বুঝে অন্যের সামনে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আবেগ প্রকাশ করাই হলো আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা।

একটা সময় চাকরির ক্ষেত্রে পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফলই প্রধানত গুরুত্ব পেত। আবার বলা হতো, চাকরি পেতে হলে ‘মামার জোর’ লাগে। এখন সময়টা অন্য রকম। দীর্ঘ মেয়াদে ‘মামার জোর’–এর চেয়ে ‘মেধার জোর’ আপনাকে এগিয়ে রাখবে বেশি। শুধু পড়ালেখায় জোর দিলেই হবে না, ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ নজর দিতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে কে কেমন, তা জানতে নিয়োগকর্তারা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের ওপর গুরুত্ব দেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়–জীবন থেকেই আমাদের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন মাত্রা সম্পর্কে ধারণা রেখে নিজেকে দক্ষ করার কথা ভাবতে হবে।

যেভাবে আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ করবেন

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও কার্নেগি ফাউন্ডেশনের গবেষণায় জানা যায়, যেকোনো পেশায় দক্ষতা বিকাশের জন্য ৮৫-৮৭ ভাগ গুরুত্বপূর্ণ হলো সফট স্কিল (সাধারণ দক্ষতা), আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তি দক্ষতা। আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সাধারণভাবে এমন সব দক্ষতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের আবেগ বোঝার পাশাপাশি অন্যরা কী ভাবছেন, কী অনুভব করছেন, তা অনুধাবন করতে পারেন। আবেগ ও পরিস্থিতি বুঝে ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করাই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। এখন যেকোনো পেশায় দক্ষতা উন্নয়নের জন্যই আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা বিকাশের বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেসের শিক্ষক লিলা জ্যাকোভিচের মতে, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স হচ্ছে পাঁচটি দক্ষতার সমন্বয় মাত্র। দক্ষতাগুলো হলো, ব্যক্তি সচেতনতা, স্বনিয়ন্ত্রণ, অনুপ্রেরণা, সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা বা সহানুভূতি। এই পাঁচটি দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে নিজেকে ইতিবাচক ও কার্যকর হিসেবে বিকশিত করা যায়।

নিয়মিত ব্যক্তি-সচেতনতার চর্চা: নিজের সচেতনতা সম্পর্কে জানার ধাপ হচ্ছে তিনটি। আপনি কী করছেন, কী অনুভব করছেন, আর আপনি কী জানেন না। কোনো কাজ করার সময় কী করছেন, কীভাবে করছেন, তা গভীরভাবে জানার চেষ্টা করুন। যেকোনো কাজ ধাপে ধাপে গুছিয়ে করা শিখতে হবে। দিনের বিভিন্ন সময়কে কাজের জন্য ভাগ করে নিন। যেমন সকালে ২০ মিনিট পত্রিকা পড়বেন, রাতে ২০ মিনিট ক্লাস অ্যাসাইনমেন্টের জন্য সময় দেবেন। এ ছাড়া নিজের মনের জোর বাড়ানোর জন্য ধ্যান বা শরীরচর্চাতে নিয়মিত সময় দিন।

কোনো কাজ করার সময় নিজের অবস্থা ও আবেগের দিকে খেয়াল রাখুন। কোন কারণে দুশ্চিন্তা বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরীক্ষার আগে পড়ার চাপের কারণে দুশ্চিন্তায় পড়লে আগে থেকেই ভাগ ভাগ করে পড়া শেষ করুন। ক্লাসের কোনো প্রোজেক্ট আগের দিন করার চাপ না নিয়ে আগেভাগে শুরু করে, দলের মধ্যে ভাগ ভাগ করে কাজ শেষ করুন। দুশ্চিন্তা বা চাপ থাকবেই, তা যতটা সময় নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা শিখতে হবে।

নিজের আবেগ কাজে লাগানোর কৌশল আয়ত্ত করা: আমরা ক্লাসের পড়া পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে যাই অনেক সময়। আসলে কি পড়ার ওপর বিরক্ত হই নাকি যা পড়ছি তার ওপর?—এ প্রশ্ন উত্তর জানতে হবে। যা পড়ছি তার ওপর বিরক্ত হলে এমন কিছু খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে পড়ার বিষয়টি দারুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার একটানা কখনই পড়াশোনা বা কোনো কাজ করা উচিত নয়। একটু বিরতি নিয়ে নিয়ে অনেক সময় ধরে কাজ করা শিখতে হবে। কোনো কারণে রেগে গেলে কিংবা মন খারাপ হলে কেন রেগে যাচ্ছেন, তা খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে নিজের আবেগের নানা মাত্রা সম্পর্কে জানা যায়, তা নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখা যায়।

নিজেকে অনুপ্রাণিত করার শিক্ষা: অনেকেই আমরা কোনো কাজ শুরু করলে তা শেষই করতে চাই না। কোনোমতে ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। নিজেকে অনুপ্রেরণা না দিলে যেন ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রোজেক্ট করা শেষ হয় না আমাদের। এ ক্ষেত্রে নিজেকে অনুপ্রাণিত করা শিখতে হবে। শুধু ভিডিও দেখে বা অন্যদের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হওয়া চলবে না, নিজের জন্য নিজের কৌশল বানাতে হবে। ক্লাসের প্রোজেক্টে ভালো কিছু করতে চাইলে অভিজ্ঞ কারও সঙ্গে কথা বলে কৌশল বের করা যেতে পারে। কিংবা বিভিন্ন ওয়ার্কশপ বা সেমিনারে অংশ নিয়ে অভিজ্ঞদের কথা শুনে নিজের কাজ ও নিজেকে বুঝতে হবে। ‘সারা দিন কিছুই ভালো লাগে না’—এমন রোগে যাঁরা আক্রান্ত, তাঁরা শারীরিক শ্রমের কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন। সামাজিক বিভিন্ন কাজে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে নিজেকে নতুন করে চিনতে পারেন।

অন্যের সম্পর্কে জানার কৌশল জানতে হবে: পরীক্ষার খাতায় শিক্ষক ঠিক কী ধরনের উত্তর প্রত্যাশা করছেন, অনেক শিক্ষার্থী সেটা বুঝতে পেরে সেভাবেই উত্তর লেখেন। আবার অনেকেই প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ লিখে আসেন। ক্লাসের কোনো প্রোজেক্ট বা প্রেজেন্টেশনে শিক্ষক বা বিচারকেরা কী দেখতে চান, কী শুনতে চান—তা না ভেবেই আমরা অনেকে গরগর করে মুখস্থ বলে দিই। যেকোনো পরিস্থিতিতে সব সময় অন্যরা কী ভাবছেন, তাঁদের মনে কী চলছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সফল ব্যক্তিরা মানুষের মন জয় করেন এভাবেই। যাঁরা বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব দেন, তাঁদের নেতৃত্বের কৌশল জানার চেষ্টার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বিকাশের দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।


নানাভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে সব শেখার সুযোগ নেই। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত শেখার মন তৈরির দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের ওপর হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের অনেক নিবন্ধ আছে, তা পড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের ওপর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনলাইন কোর্স আছে। কোর্স করার মাধ্যমে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করা যাবে। ওয়েবসাইট: bit.do/eWqpQ। ডেনিয়েল গোলম্যানের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বইটি পড়ার মাধ্যমেও বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করতে পারেন।

লেখক: ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0