শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ইতিহাসের পথে পথে

কলাভবনের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রতীক অপরাজেয় বাংলা।ছবি: সংগৃহীত

কলাভবনের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রতীক অপরাজেয় বাংলা। এই ভাস্কর্যের মাঝখানে হাতে গ্রেনেড ও কাঁধে রাইফেল নিয়ে দাঁড়ানো কৃষক, বাঁ পাশে চিকিৎসার বাক্স হাতে নার্স, ডান পাশে দুই হাতে রাইফেল তুলে ধরা তরুণ ছাত্র জানান দেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ। ডাকসুর উদ্যোগে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। তরুণ ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ তাঁর তিন বন্ধুকে মডেল করে ভাস্কর্যটির কাঠামো দাঁড় করান।

অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকেই কলা অনুষদের ডিন অফিসের ফটকের ওপর একটি বর্ণিল ম্যুরাল দেখা যায়। তাতে সবুজের মধ্যে লাল এবং তার ভেতরে বাংলাদেশের মানচিত্র, এমন একটি পতাকাকে ঘিরে হাজারো মানুষের ভিড়। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলার ছবির ভিত্তিতে তৈরি ম্যুরাল।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ কলাভবনে ওড়ানো হয়েছিল বাংলাদেশের এই জাতীয় পতাকা। সেদিনের সেই ছবি আছে আলোকচিত্রের সংকলন নিয়ে প্রকাশিত ‘ঢাকা ১৯৪৮-১৯৭১’ গ্রন্থে। ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিষদের নেতারা ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র-গণসমাবেশের আহ্বান করেন। এর আগে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তৎকালীন ইকবাল হল) ছাত্রলীগ নেতারা বৈঠক করে সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মধ্যে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্রখচিত একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। ২ মার্চ সকাল থেকেই দল–মতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ মিছিলে মিছিলে রাজপথ কাঁপিয়ে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেলা ১১টায় সংগ্রামী ছাত্রসমাজের পক্ষে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রব গাঢ় সবুজ জমিনের মধ্যে লাল বৃত্তে মানচিত্রখচিত ‘স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা’ প্রথম উত্তোলন করেন। এরপর থেকে সারা দেশে এই পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে।

অপরাজেয় বাংলার সামনের পথ ধরে একটু হাঁটলেই শহীদদের নামফলক দেখা যায়। চারটি ফলকের দেয়ালে চিত্রিত ছবিগুলো যেন মহৎ প্রাণের ধারক ও বাহক। একই ধরনের না হলেও ‘স্মৃতি চিরন্তন’ নামে ১৯৪ জন শহীদের নামাঙ্কিত ১৪টি ফলক নির্মিত হয়েছে ভিসি চত্বরসংলগ্ন ফুলার রোড সড়কদ্বীপে। এই স্থাপনার চারপাশে মানুষের বেদম ওঠানামা চললেও এখানকার শতবর্ষী কড়ই গাছের ছায়া পরম মমতায় প্রতিমুহূর্তে আগলে রাখে ফলকগুলো।

জগন্নাথ হল, সলিমুল্লাহ হল ও বুয়েটের সড়কদ্বীপে নান্দনিক ভাস্কর্য চত্বর মন কেড়ে নেয়। স্থপতি শামীম শিকদারের হাতে গড়া শ্বেতবর্ণের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নামের এই ভাস্কর্য চত্বরে রয়েছে ১৮ জন শহীদের সঙ্গে সমাজ, দেশ ও পৃথিবী বদলে দেওয়া ১১৬ জন বুদ্ধিজীবীর মুখাবয়ব। বঙ্গবন্ধু থেকে ইন্দিরা গান্ধী, লালন থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে হুমায়ূন আহমেদ—সবাই যেন এখানে কানে কানে কথা বলছেন অবিরাম!

ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের গেটের সামনে এখন হকারদের রমরমা ব্যবসা-বাণিজ্য। বোঝার উপায় নেই ১৯৫২ সালে এখানেই (তৎকালীন ঢাবি কলাভবনে) রচিত হয়েছিল সেই দুনিয়াকাঁপানো ৩০ মিনিটের কাব্য: ভাষা আন্দোলন। তখন কলাভবন ছিল এখানেই। ছিল ছায়াঘন আমতলা, যেখানে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা জড়ো হয়েছিলেন। দাবি একটাই, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যখন মিছিল বের হয়, তখন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বরকতসহ জব্বার। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। স্মৃতিবিজড়িত আমতলার সেই আমগাছ ডাকসু সংগ্রহশালায় সযত্নে রাখা হলেও জায়গাটি সংরক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ কিংবা সরকারের সংস্কৃতি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি, ব্যাপারটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

লেখক।

দোয়েল চত্বরের পাশে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যের ঢাকা গেট বিলীন হয়েই গেছে বলা চলে। এখন যে জীর্ণ থাম তিনটি আছে, সেগুলোও হয়তো মেট্রোরেলের কারণে ধীরে ধীরে মুছে যাবে। কিন্তু মুছে যাবে না এর ইতিহাস। কারণ, মোগল সম্রাট আওরঙ্গেজেবের আমলে বাংলার সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করতে এবং স্থলপথে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলুদ রঙের এ গেট নির্মাণ করেছিলেন।

টিএসসির সড়কদ্বীপে বীরদর্পে দ্রোহ ছড়াচ্ছে রাজু ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যের রাজু আসলে কোনো আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, সেটা নিয়ে অনেকেরই দ্বিধা আছে। কেউ কেউ মনে করেন, রাজু ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। আসলে তা নয়। রাজু শহীদ হয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতাধর দুই ছাত্র সংগঠনের (এই দুই ছাত্র সংগঠনের নাম সবাই জানেন) গোলাগুলিতে। ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ আর দশ দিনের মতোই টিএসসিতে এসেছিলেন রাজু। বন্ধুদের সঙ্গে খোশগল্পে ফুরিয়ে যেতে পারত তাঁর বিকেলটি। কিন্তু যাঁর রক্তে সন্ত্রাসবিরোধী চেতনা, তাঁর পক্ষে তো খোশগল্পে মশগুল হওয়া চলে না। জানতে পারলেন, কিছুক্ষণ আগে সন্ত্রাসীরা গোলাগুলি করেছে। এর প্রতিবাদে বন্ধুদের নিয়ে মিছিল বের করেন তিনি। মিছিলে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় দেখে ভয় ধরে যায় সন্ত্রাসীদের মনে। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর থামাতে ছোড়া হয় দুই রাউন্ড গুলি। গুলি লাগে রাজুর শরীরেও। ধরাধরি করে বন্ধুরা হাসপাতালে নিলেও আর ফেরানো যায়নি তাঁকে। সেই থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকিত মানুষের প্রেরণা রাজু। মঈন হোসেন রাজু। এই অকুতোভয় তরুণের স্মরণে ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী নির্মাণ করেন রাজু ভাস্কর্য। এটির উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর।

টিএসটির ভেতরের মাঠে রয়েছে গ্রিকদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন গ্রিক মন্দির। মন্দির হিসেবে পরিচিত হলেও এটি আসলে একটি গ্রিক পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুস্মৃতি বহন করা স্মৃতিসৌধ বা মনুমেন্ট। এর ভেতরে ঢোকার দরজার ওপরে গ্রিক ভাষায় যা লেখা আছে, তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘তারাই আশীর্বাদপ্রাপ্ত, যারা সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মৃত্যুর জন্য নির্বাচিত হয়েছে।’ আনুমানিক ১৮০০-৪০ সালে এটি নির্মিত হয়েছিল। গ্রিকরা আজ ঢাকায় নেই, কিন্তু অবহেলায় টিএসসির এক প্রান্তে পড়ে আছে ওদের এই ছোট্ট ঘর।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি বেদনাবিধুর দিন। এদিন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসার কথা ছিল বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় ১৪ আগস্ট রাতে আনন্দে থই থই করছিল পুরো ক্যাম্পাস। দেয়াললিখন, ব্যানার, ফেস্টুন আর তোরণে তোরণে ছেয়ে গিয়েছিল প্রতিটি আঙিনা। টিএসসি মিলনায়তনের ভেতরে করা হয়েছিল মূল মঞ্চসজ্জা। মঞ্চে সেট করা হয়েছিল ১৬টি মাইক্রোফোন। রাত ১২টার মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল মুখে ১২ ফুট উঁচু প্রতিকৃতি। ডাস–সংলগ্ন স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর সেদিন ছিল না। এখানে জাতীয় ফুল শাপলার নকশাসহ ১৬ ফুট উঁচু একটি স্বাগত সজ্জা করা হয়েছিল। কলাভবনের মূল সিঁড়ির দুই পাশে করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দুটি ম্যুরালচিত্র। আর দেয়ালগুলো সেজেছিল ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ স্লোগানে। ভোরের আলো ফুটতেই রোকেয়া হল থেকে সাদা জমিনে লাল পাড়ের শাড়ি পরে খোঁপায় বেলি ফুল গুঁজে বেরিয়ে এসেছিলেন মেয়েরাও। অথচ তাঁরা তখনো জানতেন না, কী ঘটে গেছে রাতের আঁধারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ বুঝতে পারেননি, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে চক্রান্তকারীদের বুলেটে রক্তের বন্যায় কোন ভোর রচিত হচ্ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ বুক চিরে রক্তিম যে ভোর সেদিন এসেছিল, সে ভোর কেউ চাননি!

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর গুমোট একটি পরিস্থিতি নেমে আসে। কিন্তু সেই গুমোট পরিস্থিতির মধ্যেই আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েকজন সাহসী তরুণ প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেন একটি প্রতিবাদী সংকলন। বঙ্গবন্ধুকে বিষয় করে রচিত একগুচ্ছ ছড়া আর কবিতায় সাজানো সংকলনটির নাম ছিল ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ঐতিহাসিক ওই সংকলনের প্রকাশক হিসেবে মুদ্রিত ছিল ‘সূর্যতরুণ গোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর নাম। যদিও এ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন কোনো সংগঠন ছিল না। ছিল না কোনো প্রকাশকও। এ সংকলনের সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল সূর্যসেন হলের ১০২ নম্বর কক্ষ থেকে। কক্ষটি ছিল গণিত বিভাগের ছাত্র আবদুল আজিজের। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সংগঠক। গ্রেপ্তার এড়াতে এককভাবে সংকলনটির কোনো সম্পাদক না থাকলেও এই সংকলনের নেপথ্যে ছিলেন আবদুল আজিজ। সংকলনটি প্রকাশের পরিকল্পনা, লেখা সংগ্রহ, ছাপাখানা নির্ধারণ, মুদ্রণব্যয় জোগাড়, প্রচ্ছদ নির্মাণ, বাঁধাই ও বিতরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছেন আবদুল আজিজ।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান’, দিলওয়ারের ‘এ তো ভঙ্গ বঙ্গ নয়’, হায়াৎ মামুদের ‘মুজিবের এপিটাফ’, রাহাত খানের ‘যখন সময় হবে’, মাহমুদুল হকের ‘বকুল গন্ধ বাঘের চোখে’, নির্মলেন্দু গুণের ‘মুজিব মানে মুক্তি’, মোহাম্মদ রফিকের ‘ব্যাঘ্র বিষয়ক’, ভীষ্মদেব চৌধুরীর ‘পিতা: তোমার জন্য’, মহাদেব সাহার ‘আবার আসিব ফিরে’, লুৎফর রহমান রিটনের ‘একটি ছেলের জন্য’, কামাল চৌধুরীর ‘একজন প্রেমিকের কথা’সহ মোট ৩০ জন কবির ৩০টি কবিতা ও ছড়া স্থান পায় এতে। সেই পাথরচাপা অন্ধকার সময়ে অনবদ্য এই সংকলন মানুষের মধ্যে প্রশান্তির ঢেউ নিয়ে আসে। মুহূর্তেই সব কপি বিক্রি হয়ে যায়!

লিখতে লিখতে পাতার পর পাতা শেষ হবে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের বয়ান শেষ হবে না। আসলে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই ইতিহাসের খোলা বই। এর এক খণ্ড জমিনও পাওয়া যাবে না যেখানে ইতিহাসের চিহ্ন নেই। হলগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কোনো না কোনোভাবে ইতিহাসের ছোঁয়া লেগে আছে। দেয়ালে দেয়ালে কান পাতলেও শোনা যাবে, ইতিহাস কথা কয়...


*লেখক: তাওহিদা জাহান, চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়