বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে প্রায় দেড় বছর বন্ধের পর ১২ সেপ্টেম্বর দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুললেও এখনো সব শ্রেণির শিক্ষাক্রম স্বাভাবিক হয়নি। শুধু চলতি বছরের ও আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সশরীর ক্লাস প্রতিদিন হচ্ছে। অন্য শ্রেণিগুলোর ক্লাস সপ্তাহে এক দিন হচ্ছে। তা-ও যেদিন যে শ্রেণির ক্লাস থাকবে, সেদিন কেবল ওই শ্রেণির দুটি বিষয়ের ক্লাস হবে।

এ রকম পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম চলার সময়েও অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চালু রাখাসহ আরও বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের গবেষণা প্রতিবেদনে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের পরিকল্পনা হলো যেসব শ্রেণির সশরীর ক্লাস সপ্তাহে এক দিন হবে, সেসব শ্রেণিতে চলমান অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চালু থাকবে। তবে প্রতিদিন ক্লাস হবে এমন শ্রেণির জন্য হয়তো চলমান অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম না-ও রাখা হতে পারে।

করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি শুরু হয়। তখন শিক্ষার্থীদের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকার গত বছরের ২৯ মার্চ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য রেকর্ড করা ক্লাস সংসদ টেলিভিশনে প্রচার শুরু করে। এরপর গত জানুয়ারিতে ‘এডুকেশন ওয়াচ’ নামে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে গণসাক্ষরতা অভিযান। তাতে দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এসব দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। নিয়েছে মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। তারও আগে গত বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে বলা হয়েছিল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ৫৬ শতাংশ টেলিভিশনের ক্লাসে অংশ নেয়নি।

এ রকম পরিস্থিতিতে সরকার গত বছরের নভেম্বর মাসে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম শুরু করে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ে একেক সপ্তাহের জন্য বিভিন্ন রকমের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রণয়ন করা পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে মাউশি এই অ্যাসাইনমেন্ট বিতরণ করে। নিজ নিজ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে (ওয়েবসাইটেও দেওয়া থাকে) শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকেরা কী কী অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়, তা সংগ্রহ করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসে এই নির্ধারিত কাজ খাতায় লিখে নির্ধারিত দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমা দেয়। বন্ধের সময়ে অভিভাবকেরাও তা জমা দিতে পারতেন। জমা দেওয়ার পর শিক্ষকেরা সেটি মূল্যায়ন করে ‘অতি উত্তম’, ‘উত্তম’, ‘ভালো’ এবং ‘অগ্রগতি প্রয়োজন’—এই চার ধরনের ভাগ করেন শিক্ষার্থীদের। তারপর সেটি দেখার জন্য আবারও শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হয়।

এই অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখতে পারছে, সেটি জানার জন্য গত বছরের অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমের ওপর গবেষণা করে বেডু। ‘গুগল ফরম’ ব্যবহার করে অনলাইনে জরিপের কাজটি করা হয়। এখন প্রতিবেদন তৈরির কাজটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সম্প্রতি এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই গবেষণার তথ্য নিয়ে একটি উপস্থাপনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সারা দেশের ২ হাজার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ১৩ হাজার ৫৯ জন শিক্ষক, ৯ হাজার ৬১৭ জন শিক্ষার্থী, ৮ হাজার ৩৫৬ জন অভিভাবক এবং ৪৮৬ জন তদারক কর্মকর্তার (মাঠপর্যায়ে কর্মরত শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা) ওপর এই জরিপ করা হয়। মূল জরিপটি করার আগে পরীক্ষামূলকভাবেও কিছুসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যক্রমটি যাচাই করা হয়।

শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনার প্রকাশ

এই জরিপের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়েছিল চলমান অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল। তাতে জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। আর প্রায় ৯২ শতাংশ শিক্ষক এবং প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধান জানিয়েছেন, অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। তদারক কর্মকর্তারাও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মতোই মত দিয়েছেন।

অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৯’ উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান হওয়া কিশোরগঞ্জের এস ভি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ কবীর প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি তিনি একজন অভিভাবকও। তাঁর এক সন্তান নবম শ্রেণিতে পড়ে। আরেকজন উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী। শিক্ষকের পাশাপাশি অভিভাবক হিসেবেও তাঁর মূল্যায়ন হলো, এই কার্যক্রম ভালো। কারণ, করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে চলা ছুটির সময়ে অনলাইনে ক্লাস হলেও উপস্থিতি ছিল কম। কিন্তু অ্যাসাইনমেন্টে সব শিক্ষার্থীকেই অংশ নিতে হয়েছে। যারা সময়মতো দিতে পারেনি, তাদের পরে দেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, যা ইতিবাচক দিক। আর অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে যেসব কাজ দেওয়া হয়, তার বেশ কিছু শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে করতে হয়।

নিজে শেখায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে শিক্ষার্থীরা

অ্যাসাইনমেন্ট লেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজে নিজে শেখায় (স্বশিখন) উদ্বুদ্ধ হওয়ায় ইতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। এর মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশ শিক্ষক, ৮৮ শতাংশের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান এবং ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বশিখনে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।

এর প্রতিফলনটি বোঝা গেল রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অ্যাসাইনমেন্ট করার কার্যক্রম দেখে। যেদিন সে অ্যাসাইনমেন্ট লেখে, সেদিন সে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে নিজে নিজে কাজটি করে।

এ ছাড়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উত্তরেও স্বকীয়তা দেখতে পেয়েছেন বেশির ভাগ শিক্ষক। এমনকি অ্যাসাইনমেন্ট বাতিল হওয়ার হারও কম। এর মধ্যে ৫ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষক এবং ৬ শতাংশের মতো প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সরাসরি নোট ও গাইড বই ব্যবহারের কারণে অ্যাসাইনমেন্ট বাতিল হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে

অ্যাসাইনমেন্ট লেখার ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা অনেক বেড়েছে। ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিমত দিয়ে বলেছে, ভুল জানতে পেরে পাঠ্যবই থেকে ভালোভাবে পড়ে নিয়েছে। প্রায় সমসংখ্যক শিক্ষক জানিয়েছেন, ভুলত্রুটি জানতে পেরে শিক্ষার্থীর পাঠ্যবই থেকে ভালোভাবে পড়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, এই অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে। আর ৮৭ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, তাঁদের সন্তানেরা এই কার্যক্রমের মাধ্যমে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হয়েছে। একই কথা বলেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।

এ ছাড়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে এবং আন্তযোগাযোগ দক্ষতা বেড়েছে। অ্যাসাইনমেন্টের উত্তরে শিক্ষার্থীদের সবল ও দুর্বলতার দিকগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান বেশির ভাগ শিক্ষক। মাত্র দুই ভাগের কিছু বেশি শিক্ষক বলেছেন, এই কাজটি করা হয়নি। আর সবল ও দুর্বলতার দিকটি জানতে পেরে উপকৃত হওয়ার কথা জানিয়েছে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। তারা বলছে, এটি জানার পর ভুল জানতে পেরে পাঠ্যবই থেকে বিষয়টি ভালোভাবে যেমন পড়ে নিয়েছে, তেমনি পরবর্তী কাজের সময় শিক্ষকদের নির্দেশনা কাজে লাগিয়েছে এবং যা পরবর্তী অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজেও এসব অ্যাসাইনমেন্ট দেখছেন। তাঁর মূল্যায়ন হলো, কাজটি ভালো হচ্ছে। এ জন্য এটি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

সুপারিশ

বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিক বিবেচনায় এই কার্যক্রম যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তা অর্জিত হয়েছে। শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটি কৌশল হিসেবে শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালেও অ্যাসাইনমেন্ট কৌশল ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। জরিপে অংশ নেওয়া অংশীজনেরাও এটা অব্যাহত রাখতে বলেছেন। তবে সে ক্ষেত্রে মূল্যায়ন নির্দেশিকা আরও সুনির্দিষ্ট করার মাধ্যমে আরও নির্ভরযোগ্য করা যেতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের শিখন সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য অসদুপায় রোধের বিষয়ে তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আহসান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাসাইনমেন্ট হলো সৃজনশীল শিক্ষার অন্যতম একটি পদ্ধতি। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয়ভাবে যেভাবে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে, তাতে কিছু সমস্যাও হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অ্যাসাইনমেন্ট লেখার মডেল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমের বাস্তবায়নটি বিদ্যালয়কেন্দ্রিক এমনভাবে হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থেই নিজে নিজে শিখতে পারে। সে রকম ব্যবস্থা করে এটি চালু রাখতে হবে।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন