হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গবেষণায় অন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় নতুন আশা
বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল (এইচএমএস) চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত, যেখানে মানবস্বাস্থ্য ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী বহু আবিষ্কার হয়েছে। এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক ড. আহমেদ আয়েদুর রহমানের গবেষণায় মানবদেহের অন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন আশা দেখতে পাচ্ছেন গবেষকেরা। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. আহমেদ রহমানের গবেষণার মূল ক্ষেত্র অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র, এটিকে বিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় মস্তিষ্কও বলেন। অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্রকে বলা হয় এন্টারিক নার্ভাস সিস্টেম (ইএনএস)। এই জটিল স্নায়ুতন্ত্র আমাদের পরিপাকতন্ত্রের চলাচল, শোষণ ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আহমেদ আয়েদুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের (এমজিএইচ) গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর গবেষণা বিশেষ করে হির্শস্প্রুং রোগের মতো জন্মগত অন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এই রোগে অন্ত্রের একটি অংশে স্নায়ুকোষ থাকে না, ফলে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। বর্তমানে এর একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা অস্ত্রোপচার, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এতে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হন না, অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থেকেই যায়।
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের এলিনর অ্যান্ড মাইলস শোর ফেলোশিপ পেয়েছেন আহমেদ আয়েদুর রহমান, যা কেবল ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় গবেষকদের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আহমেদ আয়েদুর রহমানের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অটোলোগাস এন্টারিক নিউরাল স্টেম সেল (ইএনএসসি) প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। তাঁর গবেষণা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ন্যাচার কমিউনিকেশনস, নিউরন এবং জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশনে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্ত্রের স্বাভাবিক গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। প্রচলিত অস্ত্রোপচারনির্ভর চিকিৎসার বাইরে একটি জৈবিক সমাধানের ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
আহমেদ আয়েদুর রহমান অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্ত্রের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের একটি অভিনব পদ্ধতিও দেখিয়েছেন। সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজিতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কোলিনার্জিক নিউরনকে নীল আলো দিয়ে উদ্দীপিত করলে কোলাইটিসের প্রদাহ কমে। এটি ওষুধনির্ভর চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ভবিষ্যতে বায়োইলেকট্রনিক থেরাপির পথ তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে আহমেদ আয়েদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বজুড়ে অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নত চিকিৎসা এখনো সীমিত। তাই যদি এই গবেষণাগুলো ভবিষ্যতে ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে সফল হয়, তবে তা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জিনগত রোগ ও জিন থেরাপির সম্ভাবনা—
সেল থেরাপির পাশাপাশি ড. আহমেদ আয়েদুর রহমানের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জিনগতভাবে সৃষ্ট মসৃণ পেশির রোগ নিয়ে কাজ করা। সম্প্রতি তাঁরা মাল্টিসেস্টেমেটিক স্মুথ মাসল ডিসফাংশন সিনড্রোম (এমএসএমডিএস) নামক একটি বিরল জিনগত রোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেছে। এই রোগ একটি নির্দিষ্ট জিনগত ত্রুটির কারণে হয়।
এ বিষয়ে আহমেদ আয়েদুর রহমান বলেন, এই জিনগত পরিবর্তন অন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রিসিশন মেডিসিন বা লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। যেহেতু রোগটির সুনির্দিষ্ট জিনগত কারণ জানা আছে, তাই ভবিষ্যতে জিন থেরাপির মাধ্যমে মূল ত্রুটি সংশোধনের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হয়েছে। যদিও এই গবেষণা এখনো প্রাক্-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে, তবে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
আহমেদ আয়েদুর রহমান আরও বলেন, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের একজন মেডিক্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবে এমন পরিবেশে কাজ করছি, যেখানে মৌলিক গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি এবং রোগীকেন্দ্রিক ক্লিনিক্যাল প্রোগ্রাম একই প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত। ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে বিরল জিনগত রোগের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত প্রোগ্রাম রয়েছে। ফলে ল্যাবে উদ্ভাবিত কোনো থেরাপি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে তা দ্রুত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে। আহমেদ আয়েদুর রহমানের ভাষায়, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ নয়। আমরা এমন বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজছি, যা দ্রুতই সরাসরি রোগীদের উপকারে আসবে।’
আহমেদ আয়েদুর রহমানের গবেষণা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) থেকে একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান দ্বারা সমর্থিত, যা বিশ্বমানের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণাকে এগিয়ে নিতে প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তিনি আমেরিকান নিউরোগ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড মোটিলিটি সোসাইটির (ANMS) ডিসকভারি গ্রান্ট অর্জন করেছেন, যা আন্ত্রিক প্রদাহজনিত রোগ (IBD) নিয়ে তাঁর গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া তিনি হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের এলিনর অ্যান্ড মাইলস শোর ফেলোশিপ লাভ করেছেন, যা কেবল ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় গবেষকদের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হার্ভার্ড—
খুলনায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা আহমেদ আয়েদুর রহমানের বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ ছিল শৈশব থেকেই। পিএইচডি করতে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি ডিসিপ্লিনে শিক্ষকতা করেছেন, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাঁর অসাধারণ একাডেমিক দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি গবেষণার জন্য অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, মেলবোর্নে (২০১২–২০১৭) এবং ম্যাককোয়ারি ইউনিভার্সিটি, সিডনিতে (২০১৭–২০২০) শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ও ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে (এমজিএইচ) গবেষক হিসেবে যোগ দেন।