১৮০ সেকেন্ডে গবেষণার মডেল উপস্থাপন; ডেঙ্গু, এআই ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ভাবনা

বর্ষা এলেই বাড়ে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। হাসপাতালে বাড়তে থাকে রোগীর চাপ, উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। কিন্তু যদি আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেই জানা যায় কোথায়-কখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে? চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১৮০ সেকেন্ডে এমনই একটি গবেষণার গল্প শোনান বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তীব্র পাল। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও জলাবদ্ধতার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব আগাম শনাক্ত করার ধারণা মুহূর্তেই কৌতূহলী করে তোলে উপস্থিত ব্যক্তিদের।

শুধু ডেঙ্গু নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল তথ্য তৈরির প্রবণতা কমানো, স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, ব্লকচেইনভিত্তিক নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা কিংবা দুর্যোগে ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের মতো নানা গবেষণার গল্প উঠে আসে ‘থ্রি মিনিট থিসিস’ প্রতিযোগিতার মঞ্চে। আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন উৎসব ‘সাইব্লিটজ ২.০’-এর দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই প্রতিযোগিতা।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে প্রতিযোগীদের হাতে সময় ছিল মাত্র তিন মিনিট। একটিমাত্র স্থির চিত্র বা পোস্টারের সাহায্যে গবেষণার সমস্যা, পদ্ধতি, ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হয়েছে তাঁদের। ভিডিও বা একাধিক স্লাইড ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফলে জটিল গবেষণাকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাই হয়ে ওঠে মূল চ্যালেঞ্জ।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীরা গবেষণার নানা বিষয় তুলে ধরেন। একদল শিক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভুল তথ্য তৈরির সমস্যা নিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন। প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখান, উন্নত নির্দেশনা ব্যবহার করলে এআইয়ের ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। অন্য একটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কম্পিউটার প্রসেসরের গতি ও দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও ছিল নতুন নতুন ভাবনা। মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিভিত্তিক স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহের ধারণা দর্শকদের আগ্রহ কাড়ে। এ ছাড়া ‘সেলফ-হিলিং’ উপাদান, ব্লকচেইনভিত্তিক ‘সেইফপাস’ এবং ড্রোননির্ভর ত্রাণ বিতরণব্যবস্থার মতো গবেষণাও আলোচনায় আসে।

প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ স্পিকার সেশন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, টেলিযোগাযোগ, স্মার্ট অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। এতে আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কোর অপারেশনস) মো. আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান বক্তব্য দেন। শেষে পুরস্কার বিতরণীর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা। এ সময় বিজয়ীদের নামও ঘোষণা করা হয়।

থ্রি মিনিট থিসিসে চ্যাম্পিয়ন হয় টিম এম্বার, রানারআপ টিম জায়রিজ। হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন টিম ফৌরমাইন্ডস, রানারআপ টিম সাস। প্রজেক্ট শোকেসে চ্যাম্পিয়ন সিনক রোবোটিকস এবং রানারআপ টিম জিরো নেক্সট জেন।

এর আগে প্রথম দিন সকাল ৯টায় শুরু হয় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান তৈরির চ্যালেঞ্জে অংশ নেন প্রতিযোগীরা। কেউ স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, কেউ পরিবেশ কিংবা নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন।

একই সময়ে শুরু হয় স্টেমভিত্তিক বানান প্রতিযোগিতা ‘স্টেম বি’। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের জটিল শব্দের বানান, উচ্চারণ এবং সংশ্লিষ্ট ধারণা যাচাইয়ের এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

এরপর শুরু হয় প্রজেক্ট শোকেস প্রতিযোগিতা। সারি সারি টেবিলজুড়ে সাজানো ছিল শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত প্রকল্প। কোথাও সেন্সরনির্ভর যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা চলে, কোথাও শেষ মুহূর্তের কোডিং। বিচারকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অংশগ্রহণকারীরা তুলে ধরছিলেন নিজেদের ভাবনা, গবেষণা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের গল্প। দর্শনার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে ঘুরে দেখেন একের পর এক প্রকল্প।

আরও পড়ুন

দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সেশন ‘এসপিএএক্স’। কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি খাতের বর্তমান চাহিদা এবং দক্ষতা উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন সিমেন্স বাংলাদেশের আঞ্চলিক প্রধান ইরফান বিন আমদাদ চৌধুরী এবং ব্র্যাক আইটি সার্ভিসেসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মো. মিনহাজুল আবেদীন।

দুই দিনের পুরো আয়োজনেই ছিল শেখা, প্রতিযোগিতা এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ। অংশগ্রহণকারীরা যেমন নিজেদের কাজ উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন, তেমনি অন্যদের গবেষণা ও উদ্ভাবন থেকেও শিখেছেন নতুন কিছু।

আরও পড়ুন

আয়োজনে অংশগ্রহণকারী আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে অংশ নিয়ে বেশ ভালো লাগছে। আয়োজনটিও বেশ গোছানো ছিল।’

চুয়েট আইইইই স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সভাপতি মো. ইনজামাম উল হক সিয়াম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। শুধু চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নয়, গবেষণার ধারণা আছে—এমন সবাইকে সুযোগ করে দিতে এই আয়োজন করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, এ প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন সেগমেন্টে সরাসরি অংশ নিয়েছেন ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী। এই আয়োজনের টাইটেল স্পনসর ছিল শীস্টেম, গোল্ড স্পনসর মেঘনা গ্রুপ আর সহযোগিতায় প্রথম আলো।