শিক্ষক দিবসের আগে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের পদোন্নতিবঞ্চনার অবসান হবে কি
প্রতিবছর শিক্ষক দিবস আসে, শিক্ষকতার মর্যাদা নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি কলেজ ও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সামনে বছরের পর বছর ধরে একটি প্রশ্নই জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। সেটি হলো যোগ্যতা অর্জনের পরও বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত থাকার অবসান হবে কি কোনো দিন? শিক্ষক দিবসে যখন শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও অবদানের কথা উচ্চারিত হয়, তখন এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ, বক্তৃতার মঞ্চে শিক্ষকের মর্যাদা স্বীকার করা আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই মর্যাদার প্রতিফলন ঘটানো এক বিষয় নয়।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য গত ২৩ জুলাই ২০২৬ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে দুটি পৃথক স্মারকে ডিপিসি সভা আহ্বান করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেডে প্রাপ্যতার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। ২৭ জুলাই সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা আর হয়নি। এরপর নতুন করে ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর তিন দিন বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির বা ডিপিসির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর সভার কার্যক্রম শেষ হলেও এখনো পদোন্নতির সরকারি আদেশ বা জিও জারি না হওয়ার কারণ হিসেবে শূন্য পদের সংকট এবং সুপারনিউমারারি পদ সৃজন না হওয়াকে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ের কর্মকর্তার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৮২ জন। বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১টি। অর্থাৎ প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সাংগঠনিক সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১ কর্মকর্তার। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য প্রথম পদোন্নতির পথই কার্যত বন্ধ। শিক্ষা কার্যক্রমের গুণগত মান রক্ষা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মকর্তাদের হতাশা দূর করা এবং পদোন্নতিবঞ্চনা নিরসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রয়াত অধ্যাপক বি এম আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গত জানুয়ারিতে প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী ৩২তম, ৩৩তম, ৩৪তম, ৩৫তম, ৩৬তম ও ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাসহ সরকারি কলেজ জাতীয়করণ বিধিমালা, ২০০০-এর আওতায় আত্তীকৃত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মোট ২ হাজার ৮২৩ জন প্রভাষক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য ছিলেন; কিন্তু এরই মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা বিদ্যমান পদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শূন্যপদ নেই। সাম্প্রতিক ডিপিসি সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলেছেন, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হলে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো যখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন যে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি অপরিহার্য, তখন সেই পদ সৃষ্টির ফাইলটি কোথায় আটকে আছে? কাদের অবহেলায় হাজারো শিক্ষক কর্মকর্তার যাপিত জীবন জেরবার? কারণ, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব নতুন কোনো বিষয় নয়। গত ৪ জানুয়ারি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপর এরই মধ্যে ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারাও পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। প্রস্তাব পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক প্রয়াত হয়েছেন। সময় গড়িয়েছে, ব্যাচের পর ব্যাচ পদোন্নতির যোগ্য হয়েছে; কিন্তু ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির সেই ফাইল এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
অর্থাৎ একদিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি দিতে হলে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই, অন্যদিকে সেই পদ সৃষ্টির ফাইলই যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকে, তাহলে পদোন্নতি আটকে থাকার দায় থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সত্যিই নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পারে?
প্রশ্নটি কেবল কয়েক হাজার কর্মকর্তার পদোন্নতির নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অচলাবস্থার প্রশ্ন। বছরের পর বছর একজন কর্মকর্তা একই পদে আটকে থাকবেন, পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করবেন, ডিপিসি হবে; কিন্তু প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি না হওয়ায় পদোন্নতির আদেশ হবে না; অথচ যে পদ সৃষ্টির মাধ্যমে এই জট খুলতে পারে, সেই ফাইলই যদি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পড়ে থাকে, তাহলে পদোন্নতিবঞ্চনার এই দুর্ভোগের দায় কার?
শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া প্রায় ১৭ মাস ধরে কার্যত স্থবির। দীর্ঘ চার বছরে প্রভাষকদের পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার ২০২৫ সালে। অন্যদিকে একই সময়ে অন্যান্য ক্যাডারে পদোন্নতির ধারাবাহিকতা রয়েছে। ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালে এবং ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে পদোন্নতি পেয়েছেন। এরই মধ্যে ৩৮তম বিসিএস পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং অন্যান্য ক্যাডারের ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে প্রথম পদোন্নতি পেয়ে পরবর্তী কর্মরত রয়েছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তাকে সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা ও /////////////////////THE EDVISORS (A Think Tank for Bangladesh Civil Education Service)-এর///////////////// পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে ২৪তম থেকে ৩৮তম ব্যাচ পর্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং পদস্বল্পতা নিরসনে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিসিএস প্রশাসনসহ অন্যান্য অনেক ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ কর্মকর্তারা নিয়মিত ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। বিপরীতে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে ষষ্ঠ গ্রেডে কোনো পদোন্নতি হয়নি। ২০২৫ সালে একসঙ্গে ১ হাজার ৮৭০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সংখ্যাটি বড় হলেও শিক্ষা ক্যাডারে প্রতিবছর বিসিএসের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এককালীন বড় পদোন্নতির পরিবর্তে প্রয়োজন নিয়মিত ও পূর্বানুমেয় পদোন্নতি ব্যবস্থা। এক বছরে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া মূলত দীর্ঘদিনের জমে থাকা জট কমায়; কিন্তু এর মাধ্যমে স্থায়ী কাঠামোগত সমাধান হয় না। এরই মধ্যে পদোন্নতি জট নিরসনে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার নজিরও রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে শূন্য পদ ও আর্থিক সংশ্লেষের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশেষ ব্যবস্থায় পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই মাসেও দশম গ্রেডের ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে নবম গ্রেডের বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি ও ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের প্রচলিত ধারার বাইরে বিভাগীয় শহরে পদায়নও দেওয়া হয়। তবে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একই সময়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
ডিপিসি শেষ হওয়ার পরও জিও জারি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একই বিসিএস ব্যাচে, একই দিনে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল অর্জনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অভিন্ন প্রক্রিয়া থাকলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ক্যাডারভেদে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল একটি ব্যাচের পদোন্নতি নয়। একই বিসিএস ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবসের আগে তাই সরকারি কলেজ ও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সামনে প্রশ্ন একটাই—দীর্ঘদিনের এই পদোন্নতি জটের কি এবার স্থায়ী সমাধান হবে?
*লেখক: অরিয়ন তালুকদার, সাফিয়া জান্নাত সকাল, আজরিন জান্নাত সেবা, শিক্ষক ও লেখক