উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব ও শ্রমবাজারে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা

শোয়েব হাসান, চিফ বিজনেস অফিসার, নেক্সটজবজ লিমিটেড

দেশে বেকারদের বড় অংশ চাকরি খোঁজেন পরিচিতজনের মাধ্যমে। অনেকেই বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাজ খোঁজেন। যাঁর চেনাজানা কম, তিনি প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই পিছিয়ে পড়েন। জেলা শহরের মেধাবী শিক্ষার্থী, পরিবারের প্রথম স্নাতক কিংবা সুপারিশ করার মতো কেউ নেই—এমন তরুণের জন্য সুযোগের দরজা অনেকটাই বন্ধ। কাজের ঘাটতির সঙ্গে দক্ষতার অমিল এবং যোগ্য চাকরিপ্রার্থী ও খালি পদের মধ্যে সংযোগের অভাব সংকটকে আরও গভীর করছে।

উচ্চশিক্ষিতদের অবস্থা নাজুক। বিবিএসের হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত। ২০১৭ সালে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার ছিলেন চার লাখের মতো। আট বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১০ সালে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ। চাকরিপ্রত্যাশী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন।

বেকারত্বের আলোচনা সাধারণত চাকরির সংখ্যা ঘিরেই আবর্তিত হয়, তবে তথ্য-উপাত্তের গভীর বিশ্লেষণে এই সমস্যার তিনটি ভিন্ন স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, দেশে তীব্র কাজের ঘাটতি রয়েছে; যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হিসাবে প্রতিবছর সাত লাখের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক পাস করছেন, সেখানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্বাভাবিক পরিবেশে দেশ বড়জোর তিন লাখ স্নাতককে চাকরি দিতে পারে। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল; কারণ, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, গত ও চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় বছরে নিট নতুন কর্মসংস্থান হবে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজারের মতো, যা নতুন স্নাতকদের সংখ্যার চেয়েও কম।

দ্বিতীয় স্তরটি হলো দক্ষতার অমিল, যেখানে সনদ থাকলেও তরুণদের কাজের প্রস্তুতি থাকছে না। অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণে সরকারের গঠিত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্নাতক পাস তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে আসেন, যাঁদের বড় অংশ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী; অথচ নিয়োগকর্তারা খোঁজেন হিসাব, বিক্রয়, তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রযুক্তির মতো হাতে-কলমে দক্ষতা। বিআইডিএসের গবেষণাও বলছে, নিয়োগকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রমবাজারে পাওয়াই যায় না, যার ওপর নতুন হুমকি হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), যা প্রাথমিক পর্যায়ের কারিগরি পদের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে তরুণদের ওপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে।

তৃতীয় সমস্যাটি হলো সংযোগের ঘাটতি ও তথ্যের অভাব, যার কারণে একটি পদের বিপরীতে বিপুল আবেদন জমা পড়লেও নিয়োগকর্তারা যোগ্য প্রার্থী পান না, বিশেষ করে মানবসম্পদ বিভাগ বা সুপরিচিত ব্র্যান্ড না থাকা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত সিভি যাচাইয়ের লোকবল ও সময়ের অভাবে শেষ পর্যন্ত পরিচিতজনের সুপারিশেই নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সংকুচিত করে তুলছে। অন্যদিকে চাকরিপ্রত্যাশীরা একের পর এক আবেদন করেও কোনো জবাব পান না। কেন বাদ পড়লেন, তা-ও জানতে পারেন না। কোন প্রতিষ্ঠানে কী দক্ষতা লাগে, বেতন কত—এসব তথ্যও সহজে মেলে না।

বেকারের সংখ্যা দিয়ে শ্রমবাজারের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মজীবীদের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সেখানে নিয়োগপত্র নেই, সামাজিক সুরক্ষাও নেই। বিবিএসের হিসাবে আরও ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ মানুষ আংশিক বেকার। তাঁরা কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের সময় বা দক্ষতার পুরো ব্যবহার হচ্ছে না।

নারীদের ক্ষেত্রে বাধা আরও বেশি। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো অনেক নারী শ্রমবাজার থেকেই সরে গেছেন। বিবিএসের হিসাবেও এর ইঙ্গিত মেলে। ২০২৪ সালে এক বছরে দেশের শ্রমশক্তি কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার, যার প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী। যাঁরা কাজ খোঁজাই ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁরা বেকারের হিসাব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নেই এমন তরুণের সংখ্যাও গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণে সরকারের গঠিত টাস্কফোর্স।

নতুন কাজ সৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। সংযোগের ঘাটতি কমানো সে তুলনায় দ্রুত সম্ভব, আর এখানেই ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা বদলে দিতে পারে এর চিত্র। খালি পদ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বেতনের তথ্য এক জায়গায় স্পষ্ট থাকলে চাকরিপ্রত্যাশীর অনিশ্চয়তা কমে। আবেদন, বাছাই ও যোগাযোগের ধাপ গোছানো থাকলে নিয়োগকর্তার সময় বাঁচে। প্রার্থীও জানতে পারেন, তাঁর আবেদনের কী হলো এবং তিনি বাছাইয়ের কোন পর্যায়ে আছেন।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও আছে। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বাছাই হলে যোগ্য প্রার্থীও বাদ পড়তে পারেন। যাঁদের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই, শুধু অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা তাঁদের জন্য নতুন বাধা তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তি বাছাইয়ের কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত মূল্যায়ন মানুষকেই করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আকিজ রিসোর্স নিজ উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম নেক্সটজবজ (nextjobz.com.bd) চালু করে। নেক্সটজবজ স্কুল থেকে অবসর পর্যন্ত মানুষকে শেখা, উন্নতি ও কাজের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চায়। চাকরিপ্রত্যাশীরা এখানে চাকরি খোঁজার সুযোগ পায়। আছে লার্নিং ল্যাবের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ। ক্যাম্পাস কানেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও নিয়োগকর্তাদের সংযোগের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া বিদেশে ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত তথ্যও দেওয়া হয়।

নিয়োগকর্তারা এখানে চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে প্রার্থী শর্টলিস্ট করা পর্যন্ত কাজ এক জায়গায় করতে পারেন। এর বাইরে রয়েছে নেক্সটরিসোর্স নামের আলাদা সেবা, যার মাধ্যমে হেডহান্টিং, স্টাফিং ও প্রার্থীর তথ্য যাচাই করা হয়। জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের অনেক যোগ্য পেশাজীবী প্রকাশ্যে চাকরির আবেদন করেন না; হেডহান্টিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের সরাসরি খুঁজে বের করা হয়। এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগের সাফল্য অবশ্য মাপতে হবে বাস্তব ফলাফলে। আবেদনের পর প্রার্থীরা সময়মতো জবাব পাচ্ছেন কি না, নিয়োগকর্তারা কম সময়ে উপযুক্ত কর্মী পাচ্ছেন কি না, ঢাকার বাইরের ও নারী প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর আসতে হবে যাচাইযোগ্য তথ্যে।

সংযোগের সংকট কাটাতে কয়েকটি পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নিয়োগকর্তারা বিজ্ঞাপনে কাজের দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বেতনসীমা স্পষ্ট করতে পারেন। প্রতিটি আবেদনের জবাব দেওয়ার চর্চাও চালু করা যায়, সেটি নেতিবাচক হলেও। এতে চাকরিপ্রত্যাশীদের আস্থা বাড়ে।

তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ইন্টার্নশিপ, ব্যবহারিক প্রকল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত করা দরকার। টাস্কফোর্সও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য মাপা উচিত সনদের সংখ্যায় নয়, প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কাজ পেলেন, কিংবা পেশাগত উন্নয়ন অথবা পদোন্নতি হলো তার ভিত্তিতে।

পাশাপাশি, সরকারকে বিনিয়োগের পরিবেশ ফেরাতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ব্যাংক খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজার নিয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ জরুরি। কোন খাতে কত পদ খালি, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, এসব তথ্য না থাকলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারক সবাইকে অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

একই সঙ্গে, নিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায় আছে। তাদের উচিত চাকরির তথ্য যাচাই করা, প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সহজ বাংলায় আবেদনের ব্যবস্থা রাখা, যাতে কম পড়াশোনা জানা মানুষও নিজের যোগ্যতা তুলে ধরতে পারেন।

নতুন কর্মসংস্থান তৈরি সময়সাপেক্ষ। কিন্তু যে চাকরিগুলো এখন আছে, সেগুলো যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ এখনই শুরুর উপযুক্ত সময়।

লেখক: শোয়েব হাসান, চিফ বিজনেস অফিসার, নেক্সটজবজ লিমিটেড