কিছুটা স্বপ্নের মতো

হর্নাডা এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ রেঞ্জের গেটে লেখকছবিটি লেখকের পাঠানো

মাস্টার্স শেষ করেছি মাত্র। দিন কাটছে চাকরির চেষ্টা ও নানা ল্যাবে যোগাযোগ করে। বিশ্বজুড়ে গবেষণার ফান্ডিংয়ে একধরনের মন্দা চলছে বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রে বসে থাকার সুযোগ কম আর বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসার পর সে সুযোগ তো আরও সীমিত।

চাকরি খুঁজতে খুঁজতেই চলে এল সামার। এরই মধ্যে ডাক পড়ল এক শিক্ষকের কাছ থেকে। তাঁর রিসার্চ সাইট নিউ মেক্সিকোতে। আমি থাকি অ্যারিজোনায়। দূরত্ব সাড়ে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। ঠিক করলাম বাসে যাব, অধ্যাপকও আমাকে সে পরামর্শই দিলেন। বাসে প্রায় আট ঘণ্টার পথ। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর এত দীর্ঘ বাস জার্নি আমার কখনো হয়নি। তবে মনটা রোমাঞ্চে ভরে ছিল, কারণ যাচ্ছি এক বিশ্ববিখ্যাত গবেষণাকেন্দ্রে—হর্নাডা এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ রেঞ্জ (Jornada Experimental Range)। উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত চিহুয়াহুয়ান মরুভূমি অঞ্চলে প্রায় ৭৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এটি এক বিশাল পরিবেশ গবেষণা ক্ষেত্র। গুগল ঘেঁটে জায়গাটি সম্পর্কে আগেই নানা রোমাঞ্চকর তথ্য জেনে নিয়েছিলাম।

চিহুয়াহুয়ান মরুভূমি অঞ্চলে ৭৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত পরিবেশ গবেষণা ক্ষেত্র আছে
ছবি: লেখকের পাঠানো

পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত এটি মূলত খুবই প্রত্যন্ত এক এলাকা, যা পরিবেশবিজ্ঞানীদের কাছে এক অনন্য ‘জীবন্ত পরীক্ষাগার’। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটিতে মার্কিন কৃষি বিভাগ (USDA) ও নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ রোধ ও চারণভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করে আসছে। সেখানে আমাকে এক মাসের জন্য যেতে হবে। মূলত ফিল্ডে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সেটআপ করা আর তথ্য সংগ্রহের (Data Collection) কাজে সাহায্য করতে হবে ল্যাবের পোস্ট-ডক গবেষক এলেককে। একদিকে দূরপাল্লার বাস জার্নির নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে এমন একটি ঐতিহাসিক মরুভূমি গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করার সুযোগ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম।

ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হলাম। নতুন জায়গা, নিশ্চয়ই দুর্দান্ত হবে! তবে জায়গাটি যে কতটা নির্জন ও প্রত্যন্ত, তা গুগলে এত ঘাঁটাঘাঁটি করেও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারিনি।

বাস থেকে নামার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। এলেক আমাকে বাসস্টেশন থেকে নিতে এলেন। সেখান থেকে আরও দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ। মূল গবেষণা এলাকায় অননুমোদিত যেকোনো যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

গাড়িতে যেতে যেতে নানা গল্প জমল। এলেক এখানকার প্রকৃতি আর বন্য প্রাণী নিয়ে বলছিল, ‘এখানে আমি একবার র‍্যাটলস্নেক দেখেছি, বিশাল সব গিরগিটি ঘুরে বেড়ায় আর রয়েছে বড় বড় কাঁটাযুক্ত ক্যাকটাস।’ কথাগুলো শুনে মনে মনে ভাবছিলাম, বাংলাদেশে কত কাদা-জল পেরিয়ে বড় হয়েছি, যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর গত তিন বছরে জীবনের কত বৈচিত্র্য সামলেছি—এই মরুভূমির ভয় দেখিয়ে লাভ আছে!

কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর কাঁচা রাস্তা শুরু হতেই ভুল ভাঙল। গাড়ি চলছে মাত্র ২৫ কিলোমিটার গতিতে, ঝাঁকুনিতে পথ যেন আর ফুরাতেই চায় না। যুক্তরাষ্ট্রে এমন দুর্গম কাঁচা পথ থাকতে পারে, তা হজম করতেই কিছুটা সময় লাগল!

যেতে যেতে পথে দেখা মিলল এক নিঃসঙ্গ কুকুরের। এলেক গাড়ি ধীর করে বলল, ‘গতকালও একে এই একই জায়গায় দেখেছি। আজকেও দেখলাম! রহস্য কী? দাঁড়াও, অ্যানিমেল কন্ট্রোলকে ফোন দিই।’

ইউকাগাছ
ছবি: লেখকের পাঠানো

আট ঘণ্টার বাস জার্নি আর এই কাঁচা রাস্তার ধাক্কায় আমি এমনিতেই আধমরা হয়ে আছি, এর মধ্যে অ্যানিমেল কন্ট্রোলকে ফোন! কী এক ঝক্কি! আধা ঘণ্টা পর তারা হাজির হলো। তবে আসল নাটক শুরু হলো তখন। অ্যানিমেল কন্ট্রোলের গাড়ি দেখেই ঝোপের ভেতর থেকে আরেক কুকুর বের হয়ে এল। দুই কুকুরকে সামলাতে বনকর্মীর হিমশিম অবস্থা। ফোন করে ডাকতে হলো আরেক সহকর্মীকে। আরও ১০ মিনিট পর আরেকজন এল এবং দুজন মিলে কুকুর দুটিকে কোনোমতে উদ্ধার করে নিয়ে গেল।

আরও মিনিট বিশেক পর আমরা পৌঁছালাম আমাদের ট্রেইলার হাউসে। গিয়ে দেখি, চারপাশের পরিবেশটা ঠিক যেন কল্পনার কোনো ক্যানভাস! তখন প্রায় রাত। ২৯ জুন, ২০২৬। সেদিন আকাশে ছিল ভরা পূর্ণিমা। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক, ডানা মেলে থাকা মরুভূমির ‘ইউকা’ (Yucca) গাছ আর অদূরে ছায়াবৃত পাহাড়। চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া মরুভূমির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কোনো এক অপার্থিব জগতে পা রেখেছি।

পরদিন সকাল ছয়টায় ফিল্ডে গেলাম। বিশাল বড় রিসার্চ সাইট। ইউসিএলএ (UCLA)-এর মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের সেদিন আমাদের সহায়তা করার কথা। সকালে মরুভূমির পরিবেশ সত্যিই চমৎকার—পাহাড়ে ঘেরা চারদিক, নীল আকাশে সারি সারি মেঘ। কিন্তু সকাল নয়টা বাজতেই চড়চড় করে বাড়ল রোদ! কড়া রোদে মরুভূমির বালুতে কাজ করার সময় বারবার মনে হচ্ছিল—আমাদের দেশের কৃষকেরা কতটা কষ্ট করে এই রোদে মাঠে ফসল ফলান!

এখানে মূলত মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) অর্থায়নে জলবায়ু ও মাটি–সংক্রান্ত প্রজেক্টগুলো পরিচালিত হয়। দেশটির স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এখানে কাজ করেন। কেউ কার্বন নিঃসরণ, কেউ সেচব্যবস্থা, আবার কেউ মাটির কার্বন ও নাইট্রোজেনের ভারসাম্য বিশ্লেষণ করছেন। সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো—পদের ভেদাভেদ ভুলে সবাই কঠোর পরিশ্রম করছেন, নিজের দায়িত্বটুকু পালন করছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

প্রথম সেশনের কাজ শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেইলরে ফিরলাম। তপ্ত রোদের তীব্র ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকেল পাঁচটায় আবার সাইটে যেতে হয়, আর কাজ শেষে রাতে ফিরে আটটা বাজলেই গভীর ঘুম। টানা এক মাসের রুটিন ছিল এটাই।

এরই মধ্যে খবর পেয়ে যোগাযোগ করলেন আমাদের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এক বড় ভাই। তিনি পরিবার নিয়ে কাছাকাছি একটি শহরে থাকেন। শুনে বললেন, ‘তুমি এই বনের মধ্যে উইকেন্ডে কী করছ? চলে এসো আমাদের বাসায়।’

গেলাম তাঁর বাসায়। প্রবাসজীবনে সেখানে যেন একটুকরা বাংলাদেশ খুঁজে পেলাম! বাংলায় কথা বলা, দেশি খাবারের স্বাদ আর চেনা আতিথেয়তা—মনটা ভরে গেল।

ভাইয়াদের সঙ্গে গেলাম হোয়াইট স্যান্ড ন্যাশনাল পার্কে। টুলারোসা বেসিনে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম জিপসাম বালিয়াড়ির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, যেখানে তুষারের মতো সাদা বালুর ঢেউ এক অপার্থিব ও স্বপ্নময় প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। কী ঠান্ডা বালু! একটু পানি পড়লেই সিমেন্টের মতো হয়ে যায়। জিপসাম আছে বালুতে প্রচুর, তাই এমনটা হয়।

যেদিন হেডকোয়ার্টারে ফিরব, সেদিন ছিল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ (১৯ জুলাই)। সারা দিন ভাইয়ের বাসায় ঘুরেফিরে ফাইনাল খেলা উপভোগ করে সন্ধ্যায় ফেরার পালা। ফেরার পথে ওয়েদার আপডেট দেখে পিলে চমকে উঠল—‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ বা আকস্মিক বন্যার সতর্কতা! পাহাড়ের উপত্যকা দিয়ে বৃষ্টির পানি তীব্র বেগে নেমে এসে নিমেষে পথঘাট ভাসিয়ে দেয়।

ভাইয়াদের গাড়িতে করে রওনা হলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতেই দেখি চারপাশ পানিতে থইথই করছে, গাড়ি চালানোর কোনো উপায় নেই। কল দিয়ে এলেককে পরিস্থিতি জানালাম। সে দ্রুত ল্যাব থেকে একটি ফোর-হুইল ড্রাইভ ট্রাক নিয়ে আমাদের উদ্ধার করতে এল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল আসার পথেই—পানির তোড়ে ট্রাকের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল!

আমি আর এলেক মিলে সেই হাঁটুপানিতে নেমে গাড়ি ঠেলে রাস্তার এক কোনায় নিলাম। জীবনে কখনো গাড়ি ঠেলিনি, ছোটবেলায় ওয়েস্টার্ন সিনেমায় এমন দৃশ্য দেখতাম। আজ আমি নিজেই সেই গল্পের চরিত্র!

ট্রেইলর ও লেখক
ছবি: লেখকের পাঠানো

আমাদের ট্রেইলরে ফেরার আর কোনো যানবাহন অবশিষ্ট নেই। প্রফেসর তখন ইউএসডিএর অফিসে জরুরি কল দিয়ে আমাদের জন্য একটি রাইডের ব্যবস্থা করলেন। তখন প্রায় সন্ধ্যা। এই মরু অঞ্চলে রাত আটটার দিকে সূর্য ডোবে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের গর্জন আর ঝিঁঝি পোকার শব্দে এক সুনসান নীরবতা।

অপেক্ষার সেই অন্ধকার মুহূর্তে এলেক আমার কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইল। আমাদের দেশ কেমন, ভৌগোলিক অবস্থান কতটা বৈচিত্র্যময়, আর ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কেন বিশ্বমানচিত্রের মানুষ এ দেশকে আপন করে নিয়েছে—সেই গল্প শোনালাম। তাঁকে ফোনে দেখালাম আমাদের নকশিকাঁথার রূপ, পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসবের ছবি, আর শোনানাম বাংলার ঝুম বৃষ্টি ও রাতের জোনাক পোকার গল্প।

গল্পের মাঝেই হঠাৎ দূরে গাড়ির আলোর ঝলকানি আর ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। অবশেষে অপেক্ষার অবসান!

সেদিন যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা লিখে প্রকাশ করার মতো শব্দভান্ডার হয়তো আমার নেই। মনে হচ্ছিল, কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের কোনো ওয়েস্টার্ন উপন্যাসের পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে উঠেছি আমি নিজেই। জীবনে তো খুব বেশি চাওয়ার কিছু নেই—এমন কিছু খাঁটি আনন্দ আর রোমাঞ্চ স্মৃতির থলেতে জমা করতে পারাই হয়তো জীবনকে সুন্দর করে তোলে।

*লেখক: তাবাসসুম তামিমা প্রিয়াংকা, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।