ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার বিবর্তন: বাংলাদেশে শুরু যেভাবে

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন হলেও বর্তমানের ব্রিটিশ কারিকুলাম ও আন্তর্জাতিক মানের স্কুলগুলো সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছেছবি: ফ্রিপিক

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র—কবি সুনির্মল বসুর বিখ্যাত এই পঙ্‌ক্তিটির বিশ্বায়নের যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে শতবর্ষ আগেই। এই উপমহাদেশে আঞ্চলিক ভাষার শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষারও প্রসার ঘটতে শুরু করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশে এটি পেয়েছে নতুন মাত্রা। অতীতে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন হলেও বর্তমানের ব্রিটিশ কারিকুলাম ও আন্তর্জাতিক মানের স্কুলগুলো সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে যে মুখস্থনির্ভর ও রুদ্ধ দুয়ারের শিক্ষাব্যবস্থা দেখিয়েছেন, আধুনিক কারিকুলাম ঠিক তার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। এখানে পাঠ্যবইয়ের তথ্যের চেয়ে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার সুযোগকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার ইতিহাস বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। ১৯১২ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মাধ্যমে যে যাত্রার শুরু, তা বর্তমানে এক বিশাল শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন ১৬৮টির বেশি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে। বিশেষ করে কেমব্রিজ ও এডেক্সেল কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে।

আরও পড়ুন

আধুনিক এই শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শন হলো ‘মগজধোলাই’ বা তথ্য মুখস্থ করার পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসা। হীরক রাজার দেশে প্রশ্ন করা বারণ থাকলেও বর্তমানের ব্রিটিশ কারিকুলামে প্রশ্ন করা ও যৌক্তিক উত্তর খোঁজাটাই শেখার প্রধান অংশ। আধুনিক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক এখন আর কেবল তথ্য প্রদানকারী নন; বরং একজন মেন্টর হিসেবে কাজ করেন। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু ভালো ফল বা জিপিএ দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, পাশাপাশি প্রবলেম সলভিং ও ক্রিটিক্যাল থিংঙ্কিং একজন শিক্ষার্থীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রাখে।

‘হীরক রাজার দেশে’র উদয়ন পণ্ডিতের ছোট্ট পাঠশালায় অগণিত প্রতিকূলতা ছিল। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও চ্যালেঞ্জ কম নয়, তবে সুযোগ বেড়েছে বহুগুণ। ব্রিটিশ কারিকুলামের আদলে গড়ে ওঠা বর্তমান পাঠদানের পদ্ধতিতে শিশুকে শেখানো হয়—‘কীভাবে ভাবতে হয়’, ‘কী ভাবতে হয়’।

ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের মানচিত্র এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ সময়ে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে প্রবলেম সলভিং স্কিলের বিকল্প নেই। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীদের হাতে–কলমে সমস্যা সমাধানের যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। এ দক্ষতা ভবিষ্যতে তাদের করপোরেট জগতে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে বড় ঝুঁকি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত করে তোলে বলে মত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে দেখা যায়, আধুনিক পদ্ধতির শিক্ষার্থীরা যেকোনো নতুন পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তাদের মধ্যে কেবল সমস্যা দেখার পরিবর্তে সমস্যার মূলে গিয়ে সমাধান খোঁজার একটি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টি তৈরি হয়। পাশাপাশি দলীয় কাজের মাধ্যমে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা ও যৌক্তিকভাবে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার গুণাবলিও তারা স্কুলজীবন থেকেই অর্জন করে।

আজকের এই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ওপর যথাযথ বিনিয়োগ করলে সে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পৃথিবীতে নিজের পথ নিজে তৈরি করে নিতে পারবে। নতুন সময়ে আমাদের এই নতুন পাঠপদ্ধতির গুরুত্বই বারবার উঠে আসছে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতে।’