বিসিএস (শিক্ষা) : শুধুই শিক্ষকতা হলে সিভিল সার্ভিস ক্যাডার কেন

ছবি: এআই/প্রথম আলো

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় শিক্ষা খাতের জন্য একটি স্বতন্ত্র সিভিল সার্ভিস ক্যাডার বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার গঠনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এটি কি কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ, নাকি পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদার নেতৃত্ব তৈরি করাও এর লক্ষ্য—এই প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

সম্প্রতি শিক্ষা ক্যাডার সম্পর্কে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহলের মন্তব্য শিক্ষা অঙ্গনের দীর্ঘ দিনের এক পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের প্রশাসনিক ভূমিকার চেয়ে ‘চক-ডাস্টার-ব্ল্যাকবোর্ড’ কেন্দ্রিক শ্রেণি-শিক্ষকতায় অধিক মনোযোগী হওয়ার যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত সমাজে প্রচলিত এক ধারণারই প্রতিফলন। এর মাধ্যমে এমন একটি সরলীকৃত চিত্র ফুটে ওঠে, যেন শিক্ষা ক্যাডারের একমাত্র কাজ কেবল কলেজ পর্যায়ে পাঠদান করা।

কিন্তু প্রশ্নটি মৌলিক, যদি শিক্ষা ক্যাডারের কাজ কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই হয়, তবে ক্যাডার সার্ভিসের অধীন এমন একটি বিশেষায়িত কাঠামো গড়ার রাষ্ট্রীয় যৌক্তিকতা কী ছিল? শিক্ষকতা তো আলাদা পেশাগত কাঠামোর মাধ্যমেও সম্ভব। সে জন্য সিভিল সার্ভিসের ভেতরে আলাদা ক্যাডার সৃষ্টির প্রয়োজন কেন হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শিক্ষা ক্যাডারের জন্মদর্শন ও কাঠামোগত নকশা পুনর্বিবেচনা জরুরি।

আরও পড়ুন

ঐতিহাসিক কাঠামো ও দর্শন: সূচনালগ্নেই দ্বৈত ক্যারিয়ার পথ

১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার যখন বাংলাদেশে একীভূত সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, তখন যে ১৪টি ক্যাডার গঠন করা হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)। এই ক্যাডার গঠনের নেপথ্যের দর্শনটি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী: শিক্ষা ক্ষেত্র কেবল পাঠদানের চারণভূমি নয়, বরং এটি নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পনা, কারিকুলাম উন্নয়ন, তদারকি, গবেষণা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার একটি সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ শিক্ষা ক্যাডারকে শুধু শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটি পেশাদার স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস, ১৯৮০’-এর তফসিল বিশ্লেষণ করলে এটি আরও স্পষ্ট হয়। এই ক্যাডারটি কখনোই কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য ভাবা হয়নি; বরং একাডেমিক ও প্রশাসনিক—এই দুই ধারার সমান্তরাল ক্যারিয়ার বিকাশের পরিকল্পনা নিয়েই এটি গঠিত হয়েছিল। ক্যাডার তফসিলে কলেজ শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে একই ক্যাডারের আওতাভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১’ অনুযায়ী, কলেজ শিক্ষকতার একাডেমিক ধারা থেকে প্রশাসনিক পদে পদায়নের সুযোগ সুনির্দিষ্ট করা হয়। এর ফলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়।

এই কাঠামো ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল—একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও তার বিকাশের পরিসর বিস্তৃত থাকবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের নেতৃত্বে। সহজ কথায়, বিধিবদ্ধ কাঠামোতেই শিক্ষা ক্যাডারকে ‘শিক্ষক থেকে শিক্ষা প্রশাসক’—এই ধারাবাহিক পেশাগত বিবর্তনের রূপরেখা অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা আজও দৃশ্যমান। শিক্ষা ক্যাডার সদস্যরা কেবল কলেজেই অধ্যাপনা করছেন না, বরং তাঁরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), নায়েম, এনসিটিবি এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে মূল দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ শিক্ষকতা তাঁদের ভিত্তি হলেও কার্যপরিধি প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

সুতরাং ঐতিহাসিক এই নকশাই প্রমাণ করে শিক্ষা ক্যাডারের প্রশাসনিক ভূমিকা কোনো পরবর্তীকালের দাবি নয়, বরং এটি এই ক্যাডারের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে যদি এই দ্বৈত ক্যারিইয়ার কাঠামো নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা তৈরি হয়, তবে সেটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিচ্যুতি মাত্র।

শিক্ষকতা
প্রতীকী ছবি
শিক্ষা ক্যাডারের সব কর্মকর্তা প্রশাসক হবেন—এমনটি যেমন কাম্য নয়, তেমনি সবাই সারা জীবন কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন—এমন ধারণাটিও সেকেলে।

শিক্ষকতা বনাম শিক্ষাপ্রশাসক: দ্বৈত পরিচয়ের বাস্তবতা

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন, একাডেমিক প্রশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব, শিক্ষক-কর্মচারী ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষানীতি প্রয়োগের এক অপরিহার্য অংশ। এই বহুমাত্রিক ভূমিকার ওপর ভিত্তি করেই বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ধারণাটি জন্ম নিয়েছিল—যাতে শিক্ষার নীতিনির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে একটি সুদৃঢ় পেশাগত সেতুবন্ধ তৈরি হয়। মূলত, শ্রেণিকক্ষের জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চতর নেতৃত্বে রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তবে বর্তমানে এক বিপ্রতিপ বাস্তবতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে এই ক্যাডারের একটি বিশাল অংশকে কেবল শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ রাখার একধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে একটি মৌলিক কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে চলে আসে: যদি এই কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক দক্ষতাকে কার্যকরভাবে ব্যবহারই না করা হয়, তবে কি এই বিশেষায়িত ক্যাডারের মূল যৌক্তিকতা ম্লান হয়ে যায় না?

একটি ক্যাডারের অস্তিত্ব তখনই সার্থক ও অর্থবহ হয়, যখন তার পরিকল্পিত বহুমাত্রিক ভূমিকা বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ থাকে। শ্রেণিকক্ষ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত—শিক্ষার প্রতিটি স্তরে এই ক্যাডারের সদস্যদের পেশাদার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল এর মূল স্পিরিট। এই দ্বৈত পরিচয়কে অস্বীকার করা মানে হলো শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে একপক্ষীয় ও দুর্বল করে তোলা।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: শিক্ষক-প্রশাসক ধারার স্বীকৃতি

বিশ্বের অনেক দেশেই শিক্ষকতা একটি স্বতন্ত্র পেশাগত সেবা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তা সব সময় সিভিল সার্ভিসের অংশ নয়। তবু ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের শিক্ষা প্রশাসনের সিংহভাগই শিক্ষকতা থেকে উঠে আসা দক্ষ পেশাজীবীদের দ্বারা পরিচালিত। এর মূল কারণ হলো—শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, তা ঘোচাতে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

আন্তর্জাতিক এই মডেলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, এমনকি নীতিনির্ধারক পর্যায়েও সেই ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যাঁদের শিক্ষকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মূল দর্শনও এই আন্তর্জাতিক মডেলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ, শিক্ষা ক্যাডার কেবল শিক্ষক নিয়োগের কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি শ্রেণিকক্ষের গভীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার একটি বিশেষায়িত ব্যবস্থা। এটি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একধরনের পেশাগত নেতৃত্বের গ্যারান্টি।

যদি এই পেশাদার নেতৃত্বকে শিক্ষা প্রশাসনে অবমূল্যায়ন করা হয় বা তাঁদের ভূমিকা কেবল ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে এই ক্যাডার স্রেফ শিক্ষক নিয়োগের একটি সাধারণ কাঠামোতে পর্যবসিত হবে। এটি কেবল এই ক্যাডারের অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলবে না, বরং সিভিল সার্ভিসের সেই মূল দর্শনের সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক হবে যার ভিত্তিতে এটি গঠিত হয়েছিল।

ক্যারিয়ার–পথের দ্বৈত বিকাশ: শিক্ষা ক্যাডারের বাস্তবসম্মত কাঠামো

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ক্যাডারে প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মরত। এই বিশাল জনবলের প্রত্যেকেই শিক্ষা প্রশাসন বা নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত হবেন—এমনটি ভাবা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি তার প্রয়োজনীয়তাও নেই। বরং একটি আধুনিক ও পেশাদার ক্যাডারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো এর অভ্যন্তরে বহুমাত্রিক ক্যারিয়ার বিকাশের সুযোগ থাকা। শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রেও এই সত্যটি সমানভাবে প্রযোজ্য।

একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য দুটি পরস্পর-সম্পূরক কিন্তু স্বতন্ত্র বিকাশপথ থাকা প্রয়োজন—একাডেমিক উৎকর্ষ ধারা ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব ধারা। একদিকে, একদল কর্মকর্তা দীর্ঘ মেয়াদে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবেন। তাঁরা উচ্চমানের পাঠদান, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং তাত্ত্বিক ও ফলিত গবেষণার মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা ও বৌদ্ধিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করবেন। একটি জাতির মেধা বিকাশে এই ধারার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে আরেক দল কর্মকর্তা তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষা ও শিক্ষকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, তদারকি এবং নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বে এগিয়ে যাবেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তাঁদের এই প্রত্যক্ষ পরিচয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকে আরও বাস্তবমুখী, প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর করবে। এতে নীতি প্রণয়ন ও এর প্রয়োগের মধ্যবর্তী ব্যবধান ঘুচবে, যা বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় দুর্বলতা।

শিক্ষা ক্যাডারের সব কর্মকর্তা প্রশাসক হবেন—এমনটি যেমন কাম্য নয়, তেমনি সবাই সারা জীবন কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন—এমন ধারণাটিও সেকেলে। বরং একটি সুসংগঠিত ক্যারিয়ার কাঠামোর মাধ্যমে একাডেমিক উৎকর্ষ ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব—এই উভয় ধারার সমান্তরাল বিকাশই হওয়া উচিত শিক্ষা ক্যাডারের প্রকৃত ও আধুনিক দর্শন।

শিক্ষা ক্যাডার যদি কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের একটি কাঠামো হয়, তবে সিভিল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা সত্যিই প্রশ্নসাপেক্ষ। একটি আলাদা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ সেই লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট হতে পারত।

কাঠামোগত সংকট: যখন শিক্ষা ক্যাডার কেবল শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ

যখন একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা তাঁর পুরো কর্মজীবন কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই অতিবাহিত করেন এবং প্রশাসনিক বা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তখন তিনটি মৌলিক সংকটের সৃষ্টি হয়—

প্রথমত, কাঠামোগত অদক্ষতা—শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে এই খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের পরিবর্তে অন্য সার্ভিসের কর্মকর্তাদের আধিপত্য বজায় থাকায় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ধরনের ‘জ্ঞানগত শূন্যতা’ তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, পেশাগত হতাশা ও পরিচয় সংকট—বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া পার করে আসার পর যখন একজন কর্মকর্তার বহুমুখী মেধা ব্যবহারের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়, তখন তাঁর মধ্যে চরম পেশাগত হতাশা জন্ম নেয়। এটি সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গতিশীলতাকে ব্যাহত করে।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়—শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের শিক্ষা-প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব বিকাশের জন্য রাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে প্রশিক্ষণ প্রদান করে, তাঁদের কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ রাখলে সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল অর্জিত হয় না। এটি একধরনের কাঠামোগত অপচয়।

এই প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সাহসী প্রশ্ন সামনে চলে আসে—যদি একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা সারা জীবন কেবল শিক্ষক হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাঁকে একটি বৃহত্তর সিভিল সার্ভিস ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিল? কেবল শিক্ষক নিয়োগই যদি মূল লক্ষ্য হতো, তবে একটি স্বতন্ত্র ‘কলেজ সার্ভিস কমিশন’ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো আলাদা নিয়োগ প্রক্রিয়াই কি যথেষ্ট ছিল না? সিভিল সার্ভিসের অংশ হওয়ার অর্থই হলো—সরকারের প্রশাসনিক যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নীতিনির্ধারণী ও ব্যবস্থাপনামূলক স্তরে নেতৃত্ব দেওয়া। এই সুযোগ যদি অবারিত না থাকে, তবে ক্যাডার হিসেবে এর মূল দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

শিক্ষক থেকে শিক্ষা নেতৃত্ব—ক্যাডারের প্রকৃত দর্শন

বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এর যাত্রা শুরু হবে শিক্ষকতা দিয়ে, কিন্তু এর পূর্ণতা আসবে শিক্ষা নেতৃত্বে। একজন কর্মকর্তার কর্মজীবন এমনভাবে বিন্যস্ত হওয়ার কথা, যেখানে তিনি কলেজ, শিক্ষা বোর্ড, মাউশি অধিদপ্তর ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়—সবখানেই নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন। এর ফলে শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব হয়, যা যেকোনো কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।

সারকথা হলো—শিক্ষা ক্যাডার কেবল শিক্ষক নিয়োগের কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা নয়; বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ পেশাদার ব্যবস্থাপনা কাঠামো। যদি এই ক্যাডারের সদস্যদের কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে আলাদা একটি ‘সিভিল সার্ভিস ক্যাডার’ হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি তাঁদের শিক্ষা প্রশাসন, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়, তবে এই ক্যাডারই হতে পারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পেশাগত নেতৃত্বের মূল মেরুদণ্ড।

এই লক্ষ্য অর্জনে ও ক্যাডারের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বর্তমানে তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

১. প্রশাসনিক পদে অগ্রাধিকার—শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও প্রাধান্য নিশ্চিত করা।

২. দ্বৈত ক্যারিয়ার ট্র্যাক—ক্যাডারের ভেতরেই একাডেমিক এবং প্রশাসনিক এই দুটি পৃথক কিন্তু সম্পূরক ক্যারিয়ার পথ তৈরি করা।

৩. স্পষ্ট বিবর্তন কাঠামো—একজন কর্মকর্তা শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত কীভাবে ধাপে ধাপে বিকশিত হবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ ‘ক্যারিয়ার ম্যাপ’ নির্ধারণ করা।

‘শিক্ষা ক্যাডার কি শুধুই ক্লাসরুম ক্যাডার?’—এই প্রশ্নটি আদতে কোনো গোষ্ঠীগত বা ব্যক্তিগত পেশাগত পরিচয়ের লড়াই নয়; বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রশাসন কাঠামোর চরিত্র নির্ধারণের মৌলিক প্রশ্ন। শিক্ষা কি কেবল পাঠদাননির্ভর একটি সেবা মাত্র, নাকি জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত খাত—যার জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত ও পেশাদার প্রশাসনিক নেতৃত্ব? বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ধারণাটি জন্ম নিয়েছিল মূলত দ্বিতীয় দর্শন থেকেই।

বাস্তবতা হলো, শিক্ষা ক্যাডার যদি কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের একটি কাঠামো হয়, তবে সিভিল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বতন্ত্র ক্যাডার হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা সত্যিই প্রশ্নসাপেক্ষ। একটি আলাদা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ সেই লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু রাষ্ট্র যখন শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি জটিল, বিশেষায়িত এবং নীতিনির্ভর খাত হিসেবে বিবেচনা করে, তখন শিক্ষা ক্যাডার কেবল শিক্ষক তৈরির কারখানা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে শিক্ষা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী নেতৃত্ব তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।

তাই বর্তমান বিতর্কটি ক্যাডার থাকা বা না থাকার নয়; বরং ক্যাডার সৃষ্টির সেই মূল দর্শন বাস্তবায়নের। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার যদি একাডেমিক উৎকর্ষ এবং প্রশাসনিক নেতৃত্ব—এই দুই সমান্তরাল ধারায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, তবেই এর অস্তিত্বের যৌক্তিকতা অটুট থাকবে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষা প্রশাসনের এই সমন্বিত ও পেশাদার কাঠামোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা এবং তা কার্যকর করা আজ সময়ের দাবি।

*লেখক পরিচিতি: সৌরভ জাকারিয়া ও জাহিদ প্রভাত; শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা