প্রযুক্তির যুগেও ইংরেজি শেখা কেন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লবের ফলে ভাষা শিক্ষার উপকরণ এখন মানুষের হাতের নাগালে। আজ থেকে দুই বা তিন দশক আগেও যেখানে একটি ইংরেজি শব্দের অর্থ কিংবা সঠিক উচ্চারণ জানার জন্য বিশাল আকারের অভিধানের পাতা উল্টাতে হতো, সেখানে এখন হাতের মুঠোয় থাকা একটি স্মার্টফোনেই সব লভ্য। এক ক্লিকেই মিলছে বিশ্বমানের ডিকশনারি, ব্যাকরণ সংশোধনের সফটওয়্যার, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভাষা শেখার হাজারও অ্যাপস ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। অথচ এক অদ্ভুত ও আশঙ্কাজনক বাস্তবতা হলো: শিক্ষার এত সহজলভ্য উপকরণের যুগে দাঁড়িয়েও আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি বলা ও বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় দৃশ্যমান পিছিয়ে পড়ছে।
ইংরেজি শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যবইনির্ভর না রেখে ব্যবহারিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে দেশে চালু করা হয়েছিল ‘কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং’ (সিএলটি) বা যোগাযোগভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি। কিন্তু কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও এই পদ্ধতির কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি; বরং দেখা যাচ্ছে বহু শিক্ষার্থী বারো-চৌদ্দ বছর ইংরেজি পড়েও স্বাচ্ছন্দ্যে দুই বাক্য ইংরেজি বলতে পারে না, এমনকি নির্ভুলভাবে লিখতেও হিমশিম খায়। এই ব্যর্থতার পেছনে ব্যক্তি-শিক্ষার্থীর চেষ্টার অভাবের চেয়েও অনেক বেশি দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত ত্রুটি।
পরীক্ষাপদ্ধতি ও মূল্যায়নের গভীর কাঠামোগত ত্রুটি—
যেকোনো ভাষা আয়ত্ত করার চারটি মূল স্তম্ভ থাকে—শোনা, বলা, পড়া ও লেখা। একটি ভাষাকে কার্যকরভাবে শিখতে হলে চারটি দক্ষতার সুষম সমন্বয় প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, এমনকি টারশিয়ারি বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মূল্যায়ন–ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। আমাদের পুরো মূল্যায়ন বা পরীক্ষাপদ্ধতি কেবল পড়া ও লেখার ওপর ভিত্তি করে রচিত। ১০০ নম্বরের চূড়ান্ত পরীক্ষায় লিসনিং বা স্পিকিংয়ের ওপর কোনো নম্বর বরাদ্দ থাকে না। যেহেতু আমাদের শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থা চরমভাবে ‘জিপিএ’ ও মার্কস-নির্ভর, তাই পরীক্ষায় নম্বর না থাকলে সেই দক্ষতার চর্চা করতে কেউ উদ্বুদ্ধ হয় না। ফলস্বরূপ শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা অভিভাবক, কোনো পক্ষই শ্রেণিকক্ষে বা বাড়িতে ইংরেজি বলা কিংবা শোনার অভ্যাসে মনোযোগ দেন না। লিসনিং ও স্পিকিংকে অ্যাসেসমেন্ট বা পরীক্ষার মূল্যায়নের বাইরে রেখে ‘কমিউনিকেটিভ’ ইংরেজি শেখানোর প্রয়াস তাই শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিকাঠামোর অভাব—
কেবল নতুন মেথড বা থিওরি চালু করলেই ভাষাগত দক্ষতা অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ ও অবকাঠামো। সিএলটি বা যোগাযোগভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতির মূল শর্তই ছিল শ্রেণিকক্ষ হবে একটি মিথস্ক্রিয়ামূলক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলবে, নানা ধরনের গ্রুপ অ্যাকটিভিটি করবে এবং শিক্ষক সেখানে ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ বাস্তবতায় দেখা যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্সল এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে ৬০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে একটিমাত্র ছোট শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। এমন বিশাল আকারের ক্লাসে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্পোকেন চর্চার সুযোগ দেওয়া একজন শিক্ষকের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। এ ছাড়া বহু শিক্ষকের নিজেদেরও পর্যাপ্ত স্পোকেন ও লিসনিং ট্রেইনিং নেই। যথাযথ পরিবেশ তৈরি না করে, পর্যাপ্ত অডিও-ভিজ্যুয়াল সরঞ্জাম সরবরাহ না করে এবং শিক্ষকদের দক্ষ না করে কেবল কাগজ-কলমে নতুন পদ্ধতি চালু করায় প্রত্যাশিত ফল মেলেনি; আগের ব্যাকরণ ও অনুবাদের মাধ্যমে যেটুকু লেখার দক্ষতা অর্জিত হতো, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টপ-ডাউন নীতিনির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার দূরত্ব—
আমাদের শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের দুর্বলতা বিদ্যমান, যাকে বলা যায় ‘টপ-ডাউন’ বা ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া পলিসি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় বড় নীতিনির্ধারণী নীতি প্রণয়ন করেন উচ্চপর্যায়ের আমলা, বিদেশি পরামর্শক কিংবা শিক্ষাবিদেরা, যাঁদের মাঠপর্যায়ের গ্রাউন্ড রিয়ালিটির সঙ্গে প্রায়শই সরাসরি সংযোগ থাকে না। যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থীকে সরাসরি ডিল করছেন, সেই মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের ইংরেজি শিক্ষকের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে নীতি প্রণয়ন টেবিলে খুব কমই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোথায় বাধা আসছে, শিক্ষার্থীরা কেন মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছে, কিংবা কোন প্রযুক্তিটি বাস্তবে কাজ করছে আর কোনটি করছে না, তা মাঠের শিক্ষকই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তবিক ফিডব্যাক ছাড়া ওপর থেকে পলিসি বাস্তবায়ন করার ফলেই দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আমরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখে আসছি।
শিক্ষার্থীদের ইংরেজি–ভীতি দূর করার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা—
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ইংরেজি–ভীতি কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখন জরুরি ভিত্তিতে নিচের সংস্কারগুলো করা প্রয়োজন।
সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু: বোর্ড পরীক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থায় অবিলম্বে লিসনিং এবং স্পিকিং টেস্টকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্তত ২০-৩০ শতাংশ নম্বর যদি মৌখিক পরীক্ষা ও শুনে বোঝার দক্ষতার ওপর বরাদ্দ থাকে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তা চর্চায় বাধ্য হবেন।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়ন: শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া রুম ও ভাষাচর্চার সহজ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভুল ইংরেজি বললেও শিক্ষার্থীকে হাস্যাস্পদ হতে হবে না।
ডাউন-টু-আপ পলিসি প্রণয়ন: শিক্ষানীতি তৈরিতে কেবল থিওরিটিক্যাল বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর না করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষকদের মতামত সরাসরি যুক্ত করতে হবে।
প্রযুক্তির অসীম সুবিধা তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তা গ্রহণের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করবে। পরীক্ষার ভুল কাঠামো শুধরে এবং বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করে এগোতে পারলে তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় নিজেদের চূড়ান্ত দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।
লেখা: অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়