জ্বালানিসংকট, নতুন সময়সূচি ও ব্লেন্ডেড লার্নিং: শিক্ষা খাতে সম্ভাবনা, না শঙ্কা?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিস চলবে সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত, আগে ছিল সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। অন্যদিকে ব্যাংকে লেনদেন চলবে সকাল নয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত এবং ব্যাংক বন্ধ বিকেল চারটার মধ্যে।
এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা খাতেও নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের আলোচনা চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে জোড়-বিজোড় ভিত্তিতে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীর পাঠদান চালু করার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। অর্থাৎ এক দিন অনলাইনে ক্লাস হলে পরদিন সশরীর ক্লাস নেওয়া হবে। অনলাইন ক্লাস হলেও শিক্ষকদের সশরীর উপস্থিত থেকে পাঠদান করতে হবে এবং ব্যবহারিক ক্লাসগুলো সরাসরি শ্রেণিকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে।
এ প্রস্তাব মূলত ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতিরই একটি রূপ, যেখানে সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং অনলাইন শিক্ষণ একসঙ্গে পরিচালিত হয়। তাত্ত্বিকভাবে এই পদ্ধতি শিক্ষার নমনীয়তা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি দক্ষতা অর্জন এবং সময় ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নির্ভরযোগ্য ডিভাইস, যেমন ল্যাপটপ, ট্যাব বা কম্পিউটার থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া অনলাইন অংশ কার্যকর হবে না।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষণপদ্ধতি ও কনটেন্ট ডিজাইন সঠিকভাবে পরিকল্পিত হতে হবে।
তৃতীয়ত, দক্ষতা ও সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। একটি গবেষণায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রিন্সিপালদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে সবার সচেতনতা থাকলেও প্রাত্যহিক পাঠদানপ্রক্রিয়ায় এর ব্যবহার খুবই সীমিত।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, এ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে বহু শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় ডিভাইস ও ইন্টারনেট–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। ফলে শিক্ষার সুযোগে মারাত্মক অসমতা তৈরি হয়, যা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ইন্টারনেটের দুর্বলতা ও উচ্চ খরচ অনলাইন শিক্ষাকে অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর করে তোলে। বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ক্লাসে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া এবং পাঠ বুঝতে অসুবিধা—এসব সমস্যা শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। শ্রেণিকক্ষে শারীরিক যোগাযোগের অভাবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় কম অনুপ্রাণিত বোধ করে, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হারায় এবং বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।
শিক্ষকদের অপ্রস্তুতিও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ব্লেন্ডেড লার্নিং কার্যকর করতে হলে অনলাইন ও অফলাইন পাঠদান সমন্বয়ের দক্ষতা প্রয়োজন, যা অনেক শিক্ষকের ক্ষেত্রে এখনো সীমিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকেরা জুম, গুগল ক্লাসরুম, মিটের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় দক্ষ নন। এমনকি তাদের কাছে থাকা ফোনটিও অনলাইন ক্লাস চালানোর জন্য উপযুক্ত নয়। কোভিড-১৯–এর সময়ে অনলাইন ক্লাস নেওয়াটা শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষার জন্য কোনো গুরুতর বিষয় না হয়ে নিছক একটি কর্তব্যে পরিণত হয়েছিল। যার ফলাফল আমরা বাংলাদেশ এবং অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে করা অনেক গবেষণায় দেখতে পাই।
ফলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এই পদ্ধতি চালু হলে পাঠদানের মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহারের ফলে মনোযোগ কমে, আসক্তি বাড়ে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনলাইন অংশে সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই করা কঠিন, যা সামগ্রিক শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে শৃঙ্খলার অভাব ও অনিয়মিত অংশগ্রহণের কারণে শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
তবে সরকারের এই উদ্যোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয়। জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি। কিন্তু শিক্ষা খাতে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে বাস্তব পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ব্লেন্ডেড লার্নিং বা নতুন এই শিক্ষাপদ্ধতি প্রাথমিকভাবে মেট্রোপলিটন এলাকার বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ এবং লার্নিং আউটকাম বা শেখার ফলাফলে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্লেন্ডেড লার্নিং একটি সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হলেও বাংলাদেশের বর্তমান অবকাঠামো, ডিজিটাল বৈষম্য এবং প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এটি সহজে সফল না–ও হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষক- শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি ছাড়া এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে শিক্ষা খাতে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের কার্যকর কোনো বিকল্প আছে কি না, তা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি উপযুক্ত সমাধান খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে পাঠ্যক্রম নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিকে এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে, যাতে তা ব্লেন্ডেড লার্নিং ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, বিশেষত বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং নতুন ব্লেন্ডেড লার্নিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফলে কোনো ধরনের ডিজিটাল বৈষম্য সৃষ্টি না হয়। একই সঙ্গে গড়ে ওঠা ডিজিটাল শিক্ষার অবকাঠামোকে বছরব্যাপী কার্যকর রাখতে হবে এবং তা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
*লেখক: শুভাশীষ দাশ, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, ফেনী