দেশে গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য নেওয়া হয়েছে নানাবিধ উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে জেলায় জেলায় নতুন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় শতভাগ ভর্তি, ২৬ হাজার ১৯২টি বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৪ হাজার শিক্ষককে জাতীয়করণ, নতুন প্রজন্মকে আইটি খাতের ‘দক্ষ জনশক্তি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সারা দেশে ১৪ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, বিনা মূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রচলন, নতুন একাডেমিক ভবন স্থাপন করা, এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ, স্বল্প সময়ে ফলাফল ঘোষণা ইত্যাদি সরকার শিক্ষার উন্নয়নে করে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সব স্তরের শিক্ষকদের মতো আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রদেয় সুযোগ–সুবিধার চিত্রও একই। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা বেতনের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে আছেন। কয়েকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন স্কেল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা, সহকারী অধ্যাপকের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, সহযোগী অধ্যাপকের ৫০ হাজার টাকা এবং অধ্যাপকের ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। তবে ভারতসহ পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রভাষকের পদ নেই। সহকারী অধ্যাপকই শুরুর ধাপ। বেতন তুলনা ও ক্যারিয়ার সংস্থানবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘স্যালারি এক্সপ্লোরার’-এর তথ্যমতে, ভারতে একজন সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন ৪৭ হাজার ৩০৪ রুপি, সিনিয়র স্কেলপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপকের ৫৬ হাজার ৪৮০ রুপি, সহযোগী অধ্যাপকের ১ লাখ ৭ হাজার ৭৪৮ রুপি এবং অধ্যাপকদের ১ লাখ ১৬ হাজার ৭০ রুপি। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন আরও বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ–সুবিধার পাশাপাশি আবাসিকের সংকটও বেশ প্রকট। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আবাসিকসুবিধা প্রদান করা হলেও বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকাওয়াস্তে শিক্ষকদের এই সুবিধা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ জাতি গঠনের জন্য যে উন্নত মেধার প্রচারের প্রয়োজন, আমাদের দেশে সেটির বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। আবার শিক্ষকতা পেশাটিতে আসা মানুষগুলো দিনের পর দিন নানা সংকট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে তাঁদের মেধার সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দেওয়ার আগ্রহ থাকলেও হয়ে উঠছে না।

মোদ্দাকথা হলো, শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনের অবিরাম প্রচেষ্টাটি অব্যাহত রাখতে হলে সব বৈষম্য রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। সরকারি–বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য রোধে নিয়ম পরিবর্তন করে সেটি বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠনপূর্বক উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা, নানা সুবিধাদি বৃদ্ধি ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করা দরকার। তবেই সুনিশ্চিত হবে আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

লেখক: মো. শাহ জালাল মিশুক, সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।