এ দেশে শিক্ষকতা কি অলিখিত অপরাধ
শিক্ষকদের পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতি পাচ্ছেন, অথচ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকেরা পদোন্নতিবঞ্চিত
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতি দেওয়া হলেও প্রকৃত আর্থিক প্রণোদনা অনুপস্থিত।
শিক্ষকদের ন্যায্য প্রণোদনা ও মর্যাদা নিশ্চিতে পরিবহনসুবিধা, লাঞ্চ ভাতা ও আবাসন সহায়তা চালু প্রয়োজন।
সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পদোন্নতির পর পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারপরনাই, হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্যে আবার অনেকে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের ব্যাংকের ব্যাচমেটদের অধিকাংশই ২০২৪ সালেই ষষ্ঠ গ্রেড পেয়েছেন। সম্প্রতি জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হলে অতলান্ত বিষাদগ্রস্ত একজন শিক্ষক লিখেছেন, ‘এ দেশে শিক্ষকতা কি অলিখিত অপরাধ?’
২০২০ সালে যোগ দেওয়া অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকারদের পদোন্নতি হয়েছে, অথচ ২০১৮ সালে যোগদান করা শিক্ষকেরা, বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা এখনো পদোন্নতিবঞ্চিত। এমনিতেই শিক্ষকেরা ব্যাংকারদের মতো লাঞ্চ ভাতা, গৃহঋণ, গাড়ি-বাইক, ল্যাপটপ ক্রয়ের সুবিধা পান না, পরিবহনসুবিধাও সীমিত। অথচ একই দেশে, একই মুদ্রায়, একই বাজারব্যবস্থায় যাপিত জীবনের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটাতে হয়। যদি সময়মতো পদোন্নতিও না জোটে, তবে শিক্ষকতাকে দ্বিতীয় শ্রেণির পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এমন ভাবা অবান্তর নয়।
আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতিই যেন একমাত্র শিক্ষকদের নিয়তি। কেননা, ব্যতিক্রম ছাড়া যত দিন পর্যন্ত পদোন্নতি হলে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা না থাকে, সেই সময়কালের মধ্যে শিক্ষকদের, বিশেষ করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের, পদোন্নতির নজির নেই। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পদোন্নতির প্রশ্নটি প্রায়ই অকারণে আর্থিক সংশ্লেষের জটিল অঙ্কে আটকে যায়। রাষ্ট্রের কোষাগার সেই ব্যয় বহন করতে পারবে কি না—এই হিসাবই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য। অথচ বিগত বছরের পদোন্নতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পদোন্নতি কখনোই নিয়মিত ও সময়োপযোগীভাবে কার্যকর হয়নি। শুধু বিলম্ব নয়, বহু ক্ষেত্রে পদোন্নতি দেওয়া হলেও বেতন বা আর্থিক সুবিধার বাস্তব উন্নতি ঘটেনি; বরং পদোন্নতি কেবল নামমাত্র স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। পেশাগত মর্যাদা বা প্রণোদনার বাস্তব প্রতিফলন সেখানে অনুপস্থিতই রয়ে গেছে।
দেশের অধিকাংশ মানুষ অবগত নন যে ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ব্যক্তিরা চাকরি শেষে পেনশন নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের তুলনায় কম পান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা একসময় মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেতেন, ধীরে ধীরে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং এখন ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। এই অগ্রগতি প্রশংসনীয়।
পদোন্নতি হলে যদি বেতনই না বাড়ে, তাহলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে নামমাত্র স্বীকৃতি দিতে এত অভীহা কেন? বাস্তবে বহু বছর ধরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যক্রম শূন্য পদের সীমাবদ্ধতার কারণে স্থবির ছিল। অন্যদিকে একই ব্যাচের প্রশাসন, পুলিশ, কৃষি বা কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব ও মর্যাদার উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়েছেন। অথচ বিসিএস সাধারণ শিক্ষার ৩৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা আজ অবধি পদোন্নতিবঞ্চিত।
এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভাঙতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর্থিক সংশ্লেষবিহীন ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পর্যায়ক্রমে অন্য স্তরেও আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতি কার্যক্রম চালু রাখার মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাপ্য সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রয়াস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমবারের মতো বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টির যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ফাইল আজও আলোর মুখ দেখেনি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড শিক্ষক সমাজ। রাষ্ট্রের নীতি, উন্নয়ন ও মানবসম্পদ সৃষ্টির মহাযজ্ঞের কেন্দ্রে শিক্ষকেরা অবস্থান করেন। অথচ এই পেশাজীবী গোষ্ঠীটি দীর্ঘদিন ধরে প্রণোদনা, মর্যাদা ও কাঠামোগত ন্যায্যতার প্রশ্নে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৬০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, যা হাজারো শিক্ষক-কর্মচারীর পারিবারিক আনন্দ বহুগুণ বাড়াবে। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতার আরেকটি দিক স্পষ্ট—সরকারি শিক্ষকেরা এখনো কাঠামোগতভাবে নানা বঞ্চনার মধ্যে অবস্থান করছেন। জাতির বৃহত্তর কল্যাণে শিক্ষকদের চাকরি নন-ভ্যাকেশন ঘোষণা করার উদ্যোগকে শিক্ষক সমাজ স্বাগত জানিয়েছে।
অবকাশ বিভাগ বলতে সেই বিভাগকে বোঝায়, যেখানে নিয়মিত অবকাশ অনুমোদিত এবং কর্মরত কর্মচারীরা অবকাশকালীন কর্ম থেকে অব্যাহতি পান। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন অবকাশেও ভর্তি কার্যক্রম, পরীক্ষা, ফরম পূরণসহ নানা কারণে কার্যক্রম সচল রাখতে হয়। ফলে এই বিভাগের কর্মচারীদের প্রকৃত অবকাশ প্রায় অনুপস্থিত। উপরন্তু উত্তরপত্র মূল্যায়ন, প্রশ্ন প্রণয়ন, পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ণ—এ সবই অতিরিক্ত শ্রমনিবিড় কাজ, যার যথার্থ আর্থিক বা সামাজিক স্বীকৃতি অনুপস্থিত।
দেশের অধিকাংশ মানুষ অবগত নন যে ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ব্যক্তিরা চাকরি শেষে পেনশন নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের তুলনায় কম পান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা একসময় মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেতেন, ধীরে ধীরে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং এখন ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবনা এসেছে। এই অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু তুলনামূলক বাস্তবতায় দেখা যায়, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে স্থবিরতার শিকার। ২০০৯ সালের বেতন কাঠামোয় সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হওয়ার একটি বাস্তবসম্মত পথ ছিল; কিন্তু ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো সেই পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়। ফলে দীর্ঘ সেবা দিলেও অনেক শিক্ষক উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
এ বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়, যখন বিভিন্ন খাতের তুলনামূলক চিত্র সামনে আসে। দেশের ৫৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক কর্মজীবনে গ্রেড-১ পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে শিক্ষা ক্যাডার ও সিভিল এডুকেশন সার্ভিসের শিক্ষকেরা বাস্তবে গ্রেড-১, ২ বা ৩-এ উন্নীত হওয়ার সুযোগ প্রায় হারিয়েই ফেলেছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা মাধ্যমিক স্তর—সবখানেই শিক্ষাদানের মৌলিক লক্ষ্য এক ও অভিন্ন: জ্ঞান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ গঠন।
শহরের অনেক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বিভিন্ন বাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা ৪০-৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা, অতিরিক্ত সিটি অ্যালাউন্স এবং দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তেই অল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতি বাস্তবায়িত হয়। বিপরীতে সরকারি কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কাঠামোগত জটিলতার মধ্যে পড়ে বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকেন।
আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংক খাতের একই গ্রেডের কর্মকর্তারা অন্যান্য সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের তুলনায় একাধিক ইনসেনটিভ, নিয়মিত লাঞ্চ ভাতা, গৃহঋণ, গাড়ি বা মোটরবাইক ক্রয়ের সহজ ঋণসহ নানা আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। অথচ শিক্ষকেরা, যাঁদের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়, তাঁদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন, লাঞ্চ ভাতা কিংবা আবাসন সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত। একই রাষ্ট্রে সচিবালয় বা ব্যাংকের কর্মচারীদের জন্য যেখানে পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত, সেখানে বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকেরা প্রতিদিন ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কর্মস্থলে পৌঁছান।
ফলে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি কেবল শিক্ষকদের বেলায় এসে দরিদ্র হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো, শিক্ষকতা পেশা শুধু আদর্শবাদে টিকিয়ে রাখা যায় না; প্রয়োজন ন্যায্য প্রণোদনা ও সামাজিক মর্যাদা। একটি সমাজে মেধাবী তরুণেরা সেই পেশার দিকে ঝোঁকেন, যেখানে পেশাগত স্বীকৃতি, আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নতির বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক মেধাবী কর্মকর্তা শিক্ষা ক্যাডার ছেড়ে অন্যান্য পেশায় চলে যাচ্ছেন অথবা নন-ক্যাডার চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
অতএব, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে একই সঙ্গে সরকারি শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান জরুরি। পদোন্নতি চক্রকে নিয়মিত করা, সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে দীর্ঘস্থায়ী জট দূর করা, লাঞ্চ ভাতা, আবাসন সহায়তা, পরিবহনসুবিধা ও ঋণসুবিধার মতো বাস্তবসম্মত প্রণোদনা চালু করা—এসব পদক্ষেপ শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সহায়ক।
কারণ, শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণভোমরা শিক্ষকেরা যদি সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রণোদিত না হন, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, মানবসম্পদ সৃষ্টি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
একই গ্রেডের অন্যান্য পেশাজীবীর সঙ্গে শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করে সবাইকে সমান মর্যাদা ও প্রণোদনার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাফিয়া জান্নাত সকাল ও আজরিন জান্নাত সেবা