নীতিনির্ধারণী গবেষণায় তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে জাতীয় সংসদ
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে আরও গতিশীল করতে এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা শাখা থেকে নীতিনির্ধারণী ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করে একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের শিক্ষক, গবেষক ও উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সংসদীয় কার্যক্রমে সরাসরি অবদান রাখার এবং নীতিনির্ধারণী স্তরে গবেষণাভিত্তিক মতামত তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ। বিশেষ করে যাঁরা সমাজবিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শাখায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন, তাঁদের জন্য এই প্রকল্প দেশের সংসদীয় ব্যবস্থার মানোন্নয়নে কাজ করার চমৎকার পথ উন্মুক্ত করেছে।
গবেষণার নির্ধারিত ক্ষেত্র
সংসদ সচিবালয়ের গবেষণা কর্মসূচির আওতায় এবারের বিজ্ঞপ্তিতে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত সময়োপযোগী ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথমত, ‘জাতীয় সংসদে কার্যকর সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা: বর্তমান অবস্থা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং সংস্কারের রূপরেখা’ নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির আধুনিকীকরণ: আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে তুলনামূলক পর্যালোচনা ও সংস্কার-রূপরেখা’ বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, ‘জনগণের সঙ্গে সংসদের কার্যক্রমের সংযোগ: বর্তমান অবস্থা ও উন্নয়নের উপায়’।
চতুর্থত, ‘জনগণের কাছে সংসদ সদস্যের জবাবদিহি এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় কারিগরি শিক্ষার প্রসারে তাঁদের ভূমিকা’ শীর্ষক বিষয়ে কাজের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পঞ্চম ক্ষেত্র হিসেবে ‘অডিট প্রতিবেদনের আলোকে সংসদীয় প্রতিকারের: সরকারি হিসাব–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন, অনুসরণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থার মূল্যায়ন’ বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই বিষয়গুলো দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গবেষকদের যোগ্যতা, বাজেট ও মেয়াদের রূপরেখা
এই মর্যাদাপূর্ণ গবেষণায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদনকারী গবেষকদের নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার মাপকাঠি পূরণ করতে হবে। বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী, গবেষককে সমাজবিজ্ঞানের শাখাগুলোর যেকোনো বিষয়ে কমপক্ষে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। তবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে থিসিস গ্রুপের শিক্ষার্থীদের বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে। পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জ্ঞান, দক্ষতা ও কাজের পূর্বাভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
সাধারণ গবেষকদের ক্ষেত্রে বয়স অনূর্ধ্ব ৫০ বছর নির্ধারিত থাকলেও সংসদ সদস্য বা সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই বয়সসীমা শিথিলযোগ্য রাখা হয়েছে। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাস। গবেষণা কার্যক্রমের ধরন ও পরিধি বিবেচনা করে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য ভ্যাট, ট্যাক্সসহ অনধিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বাজেটের মধ্যে গবেষণা–সংশ্লিষ্ট সেমিনার ও মূল্যায়ন বাবদ খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আবেদনের প্রক্রিয়া, নিয়মাবলি ও সময়সীমা
গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থীদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রস্তাব জমা দিতে হবে। প্রতিটি প্রস্তাব বাংলা অথবা ইংরেজি যেকোনো একটি ভাষায় তৈরি করতে হবে এবং এর দৈর্ঘ্য তিন থেকে পাঁচ পৃষ্ঠা বা এক হাজার শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা আবশ্যক।
গবেষণা প্রস্তাবে অবশ্যই গবেষণার শিরোনাম ও সারসংক্ষেপ, গবেষণার পটভূমি, যৌক্তিকতা ও উদ্দেশ্য, গবেষণার পদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনা, প্রত্যাশিত ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রভাব এবং সমবায়িক ও বিস্তারিত বাজেট অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর সঙ্গে গবেষক বা গবেষণা দলের জীবনবৃত্তান্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনপত্র সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক। প্রস্তুতকৃত গবেষণা প্রস্তাব ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পৌঁছাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের পর কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। আগ্রহী প্রার্থীরা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট www.parliament.gov.bd ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদনপত্র দাখিল করতে পারবেন অথবা তা সরাসরি ই-মেইল কিংবা দাপ্তরিক ঠিকানায় প্রেরণ করতে পারবেন।
উন্নত সংসদীয় চর্চা ও নীতিনির্ধারণে গবেষণার গুরুত্ব
একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ ও জনগণের মধ্যকার সেতুবন্ধন সুদৃঢ় করতে গবেষণা ও নথিপত্রভিত্তিক পর্যালোচনার বিকল্প নেই। সংসদ সচিবালয়ের এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মধ্যে নিবিড় মেলবন্ধন তৈরি হবে, অন্যদিকে তেমনি সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও কার্যপ্রণালি বিধির সংস্কারে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশমালা পাওয়া যাবে। কারিগরি শিক্ষা প্রসার কিংবা অডিট প্রতিবেদনের বাস্তবায়নসংক্রান্ত গবেষণালব্ধ ফলাফল দেশের সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখাবে বলে আশা করা হচ্ছে।