চিকিৎসাশিক্ষায় ৬৩ শতাংশই ছাত্রী, ডেন্টাল ও নার্সিংয়েও এগিয়ে

টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক, বগুড়াছবি: প্রথম আলো

দেশে চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় এখন যত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, তাঁদের প্রায় ৬৩ শতাংশই নারী। ডেন্টাল শিক্ষায়ও ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে বেশি; আর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। তবে কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নারী চিকিৎসকদের হার এখনো কিছুটা কম।

শিক্ষায় নারীদের এগিয়ে যাওয়ার যে চিত্র প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিফলন ঘটছে চিকিৎসা শিক্ষায়ও। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই ধারাবাহিকতা সমানভাবে থাকছে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজের বাইরে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীর হার ৪০ শতাংশের নিচে।

৮-১০ বছর ধরেই মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ছাত্রীদের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। শুধু ভর্তি নয়, এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। ফলে নতুন চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশকারীদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনে শিক্ষার অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে।

মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে চিকিৎসা শিক্ষা দেওয়া হয়। এ কোর্সে নারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বোঝা যায়, চিকিৎসক হওয়ার পথে মেয়েরা এখন বড় অংশজুড়ে রয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ছাত্রীদের এগিয়ে থাকা দৃশ্যমান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১০৯টি (পরে আরও দুটির অনুমোদন হয়) সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৫১ হাজার ৩১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ ছাত্রী। সরকারি ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে মোট শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ নারী। অন্যদিকে বেসরকারি ৭২টি মেডিক্যাল কলেজে নারী শিক্ষার্থীর হার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।

মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে চিকিৎসা শিক্ষা দেওয়া হয়। এ কোর্সে নারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বোঝা যায়, চিকিৎসক হওয়ার পথে মেয়েরা এখন বড় অংশজুড়ে রয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ছাত্রীদের এগিয়ে থাকা দৃশ্যমান।

তবে কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নারী চিকিৎসেরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। ৩৯তম (বিশেষ) বিসিএসে ৬ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৫৩ শতাংশ, নারী ৪৭ শতাংশ। যদিও এই বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনকারীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। একই চিত্র দেখা যায় ৪২তম (বিশেষ) বিসিএসেও। এতে ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন প্রায় ৫১ শতাংশ; আর নারী ৪৯ শতাংশ। আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর অংশ ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন

ডেন্টাল ও নার্সিংয়েও এগিয়ে নারীরা

শুধু এমবিবিএস নয়, চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিক্ষায়ও নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিটে শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে ৭ হাজার। তাঁদের ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ নারী। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। দেশে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ ও ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৪৭৫। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী প্রায় ৪০ হাজার। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ ছাত্রী।

চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য চিকিৎসক, ডেন্টাল চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ—সব পেশারই গুরুত্ব রয়েছে। তবে শিক্ষায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি কর্মজীবনে তাঁদের অংশগ্রহণ, পেশাগত উন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগ কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা একেবারে নতুন নয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেডিক্যালে ভর্তি ও এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই ১০ বছরে দেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ৪৮ হাজার ৭৭৭ জন এমবিবিএস পাস করেন। তাঁদের মধ্যে নারী ছিলেন ২৬ হাজার ৯০১ জন, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশ।

তবে কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নারী চিকিৎসেরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। ৩৯তম (বিশেষ) বিসিএসে ৬ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৫৩ শতাংশ, নারী ৪৭ শতাংশ। যদিও এই বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনকারীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী।

মেধা, পারিবারিক আগ্রহ ও শিক্ষায় অগ্রগতি

চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এগিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি বিষয় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এই তিন স্তরেই ছাত্রীর হার ৫০ শতাংশের বেশি। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলের সূচক জিপিএ-৫ অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে। ফলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এর মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার প্রতি মেধাবী ছাত্রীদের আগ্রহ এবং পরিবারগুলোর উৎসাহও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এর পেছনে পারিবারিক, আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার সুযোগ, পেশা নির্বাচনের পছন্দ এবং ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের মতো বিষয়গুলোও কাজ করছে।

ছাত্রীদের পড়াশোনায় ভালো করা এবং এগিয়ে যাওয়া ইতিবাচক দিক। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতেই তাঁরা মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে। মফস্‌সল এলাকায় কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে নারী চিকিৎসকদের কাজ করতে নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ

চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁদের পেশাগত আগ্রহ। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলেন ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা। এতে দেখা যায়, নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুরুষ ও ৫২ শতাংশ নারী। পুরুষ চিকিৎসকদের ৮৭ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা মেডিসিন ও সার্জারি বিষয়ে। আর নারী চিকিৎসকদের ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা গাইনি ও প্রসূতিরোগ বিষয়ে। গবেষণা প্রবন্ধটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে অনলাইন মেডিক্যাল জার্নাল প্লজ ওয়ানে প্রকাশিত হয়।

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রীদের পড়াশোনায় ভালো করা এবং এগিয়ে যাওয়া ইতিবাচক দিক। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতেই তাঁরা মেডিক্যালে ভর্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে। মফস্‌সল এলাকায় কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে নারী চিকিৎসকদের কাজ করতে নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।

আবদুল হামিদ বলেন, চিকিৎসার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত শাখায় নারীদের অংশগ্রহণও তুলনামূলক কম। অনেকের আগ্রহ গাইনি ও প্রসূতিরোগের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি শাখায় বেশি দেখা যায়। চিকিৎসার বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।