১.
র-তে রমরমা ‘রসালো রসায়নের রসিক রসায়নবিদদের রোজনামচা’ নামক এক শিরোনামে প্রথম আলোতে প্রকাশিত (১৭-২১ আগস্ট, ২০২৫) চার পর্বের একটা লেখা। যুক্তরাষ্ট্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদদের ডুকা মিলনমেলার আদ্যোপান্ত এতে বর্ণিত। ঢাকা ইউনিভার্সিটি কেমিস্ট্রি অ্যালামনাই ইন আমেরিকার সংক্ষেপ হলো ডিইউসিএএ বা ডুকা। তবে রসায়ন বিভাগ কর্তৃক কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত অ্যালামনাই ডিইউসিএএ হলো ঢাকা ইউনিভার্সিটি কেমিস্ট্রি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন।
রসায়ন একটা রসহীন ও কাঠখোট্টা বিষয়, তবে ব্যবহারিক রসায়নবিজ্ঞানটা সত্যিকারের রসালো। ব্যবহারিক রসায়নটাতে রসায়নবিদেরা রসিকতার রস পান। আর রসায়নের রস নিয়ে রসায়নবিদেরা হয়ে ওঠেন রসিক। তাই নিজেদের কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে রসিকতার মাধ্যমে সবাইকে হাস্যরস দিয়ে আনন্দ–উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে আয়োজিত হয় রসায়ন সন্ধ্যা, রসায়ন মিলনমেলা, রসায়ন পিকনিক, রসায়ন অলিম্পিয়াড, কিংবা রসায়ন সম্মিলনী—দেশে ও বিদেশে।
রস মানে আনন্দ, উচ্ছ্বাস, হাসি, খুশি, ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতি, বন্ধন ও সজীবতা। অন্যদিকে রসের ঘাটতিতে বিরস। নিরানন্দ, একঘেয়েমি, বিষণ্নতা, কান্না, তিক্ততা, অপূর্ণতা, কিংবা শুষ্কতায় বলি বিরস। ঢাবি জীবনে রসায়নের রস বিরসে অসংখ্য প্রাপ্তি যেভাবে রসায়নবিদদের জীবনকে গতিময় করে, অনেক অপ্রাপ্তি তেমনি কিছু তিক্ততা দেয়।
২.
রসের রসালাপ অথবা বিরসের বিষণ্নতায় থাকা শত শত মানুষের সঙ্গে জীবনের পথচলায় আমার ওঠাবসা। তাঁরা দেশে ও বিদেশে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, দিনমজুর ইত্যাদি হরেক রকম মানুষ। তাঁদের মধ্যে আছেন অগণিত রসায়নবিদ। এসব মানুষের জীবনের গল্প শোনা আমার নেশা—তাঁদের সফলতা, ব্যর্থতা, প্রেম, বিরহ, রস–বিরসের গল্প শুনি। বুকভরা আশা নিয়ে অনেকের মতো আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছি সোনালি সাতটা বছর ১৯৯৬-২০০২। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো সেইসব সোনালি দিনের জীবনের কথা, সমসাময়িক সিনিয়র, সহপাঠী ও শিক্ষকদের কথা লিপিবদ্ধ আছে প্রথম আলোতে প্রকাশিত (৬-৯ জুলাই, ২০২০) ‘যে পথে আলো জ্বলে’ লেখায়।
জীবনের পথ চলি, ছুটি এক শহর থেকে অন্য শহর, এক দেশ থেকে অন্য দেশ। বাংলাদেশ, জাপান, কানাডা, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পরিবেশে রসায়নবিদদের কাছে পাওয়া মানে পরিবারের মানুষকে পাওয়ার অনুভূতি। রসায়ন বিভাগ হলো আমাদের পরিবারের নাম, আর আমরা রসায়নবিদেরা হলাম তার সদস্য। রসায়ন পরিবারের অগণিত সদস্যের সঙ্গে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভাগের স্মৃতি রোমন্থন ও গঠনমূলক আলোচনা হয়। সমালোচনা গঠনমূলক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রসায়ন পরিবারের অগণিত সদস্যের সঙ্গে কথা হয়, ছাত্রজীবনের কথা, গবেষণার কথা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা। কথায় কথা বাড়ে, ফিরে ফিরে আসে রসায়ন বিভাগের গল্প। জাপানে ড. জাকির ভাই, ড. সেলিম ভাই, ড. হাকিম, ড. বাহাদুর। কানাডায় ড. মারিয়া আপা, ড. নুরুজ্জামান ভাই, ড. আখতার ভাই, ড. প্রসাদসহ অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রে ড. ফাহিম ভাই, ড. রহমান ভাই, ড. মাহবুব ভাই, ড. জামাল ভাই, ড. মংসানো ভাই, ড. রুহুল ভাই, ড. রওশান ভাই, ড. জসিম ভাই, ড. কামরুল ভাই, ড. আসাদ ভাই, ড. রব্বানী ভাই, ড. ফিরোজ ভাই, ড. খবির ভাই, ড. আরিফ ভাই, ড. রাহুল, ড. মুনির, ড. মারনি আপা, ড. সুরভি আপা, ড. দেলোয়ার ভাই, ড. নাজিম ভাই, ড. লুবনা আপা, ড. জাকারিয়া, ড. সোহেল, ড. লাকি, ইভা, ড. সাইফুল, ড. শামীম, জ্যোতি, ড. সাজ্জাদ, ড. হাসান, ড. ইমরান, ড. আনন্দ, ড. নাজমুল, ড. ইয়াকুব, ড. জাহাঙ্গীর, মাহফুজ, জয়সহ অনেকে। বাংলাদেশে ঢাবি কেমিস্ট্রি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পঞ্চম বার্ষিক সম্মিলনী ২০২৬–এর সন্ধিক্ষণে বিভাগে নিজেদের সময়ের রস বিরসের স্মৃতি রোমন্থন করতে উপরিউক্ত অ্যালামনাইদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে এই লেখকের প্রাণবন্ত কথা হয়।
৩.
যুক্তরাষ্ট্রে নেটওয়ার্কের সবচেয়ে সিনিয়র অ্যালামনাই আমাদের ড. ফাহিম ভাই। জামালপুরের মফস্বল অঞ্চল থেকে উঠে এসে আর্থিক ব্যাপারে বেশ উৎকণ্ঠা থাকলেও অনেক আশা নিয়ে ঢাবি রসায়নে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগের কথা। মেধাবী আর অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ তিনি। মিষ্টভাষী এই মানুষ তাঁর স্বভাবজাত কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে রসায়নে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কিন্তু মাস্টার্সের থিসিস ডিফেন্স মৌখিক পরীক্ষায় দুজন শিক্ষকের অবিচারে পাওয়া ৪০ শতাংশ নম্বর তাঁকে খুব ব্যথিত করেছিল, উল্লেখ্য পরীক্ষা পাসের জন্য এটা নিম্নতর নম্বর। অজৈব রসায়নের পরীক্ষাগারে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বুরেট ভেঙে যাওয়ায় দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের সেই তীর্যক মন্তব্য ‘তুমি তো পাসই করতে পারবে না’ পাওয়া আজকের অত্যন্ত সফল ব্যক্তিত্ব বিরাশি বছর বয়স্ক ডক্টর ফাহিম ভাই আজো তা ভোলেননি! স্বাধীনতার পরে মাত্র ২০ ডলার হাতে উচ্চশিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে একাডেমিক ও প্রফেশনাল জীবনে দারুণ অবদান রেখে সেখানেই থিতু হয়েছেন। তবে তিনি জানান ফেলে আসা অতীতের সেইসব দিনের মধুর স্মৃতিগুলোই বেশি।
রসায়ন অ্যালামনাইয়ের এক চমৎকার কিউট কাপল ড. রব্বানী ভাই ও ড. মারনি আপা। উইসকনসিন প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা দুজনেই গবেষণা ও শিক্ষকতা পেশায়। তাঁদের মতে এই রসায়ন বিভাগ জীবনে চলার জন্য শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। দুজনেই নিজ নিজ থিসিস সুপারভাইজারের ভূয়সী প্রশংসা করলেন—একজনের থিসিস সুপারভাইজার অধ্যাপক মুহিবুর রহমান ও অন্যজনের অধ্যাপক শফিকুল আলম। প্রায় ২৫ থেকে ২৮ বছর আগে স্নাতকোত্তর পাস করে জীবনের এই পর্যায়ে এসে বিভাগের কোনো কিছুতে ‘বিরস’ বলতে নারাজ। তবে ডিপ্লোমেটিক উত্তর, ছাত্রজীবনের কোনো অপূর্ণতা না খুঁজে এখন নিজের শিক্ষার্থীদের জন্য বেস্ট ইফোর্ট দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রজীবনে তুখোড় মেধাবী ছাত্র ড. কামরুল ভাই। রসায়ন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটোতেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। সে সময় থিসিস করেছিলেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করেছেন বায়ো-অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে। এই দুই বিষয়ের খুব ভিন্নতা থাকলেও বায়ো-অর্গানিকেও তিনি খুব ভালো করেছেন। তাঁর মতে ঢাবি রসায়ন বিভাগে আমরা ব্যাসিক কেমিস্ট্রির বিভিন্ন বিষয়েই মূলত ফোকাসড, তাই উচ্চশিক্ষায় প্রাণরসায়ন, ফলিত রসায়ন ও মেডিক্যাল রিসার্চ কঠিন হয় না। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বে বিএসসির প্রাথমিক পর্যায়ে মূল বিষয়ের বাইরে অন্যান্য অনেক পড়তে হয়, সেগুলোতে ভিন্নতা। তিনি এমআইটি তে পোস্টডক শেষে পেশাগত জীবনেও দারুণ সফল। তাঁর মতে প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক দর্শন থাকতে পারে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের নিজস্ব রাজনীতির দর্শন যেন কোনোভাবেই তাঁদের একাডেমিক এক্সিলেনসিতে (পারদর্শিতায়) প্রভাব না পড়ে।
রসায়নের অ্যালামনাই ড. জাকারিয়া একজন অত্যন্ত মেধাবী গবেষক। আইভি লিগের বিখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পোস্টডক করেছেন। তাঁর সহধর্মিণী আরেক অ্যালামনাই রসায়নবিদ ড. লাকি। দুজনেই যেমনটা মেধাবী, তেমনি ভদ্র ও অমায়িক মানুষ। ঢাবিতে ছাত্রাবস্থায় জাকারিয়া তেমন কোনো তথাকথিত ভালো ফলাফল করেননি, কিন্তু আমি তাঁকে জানি তিনি অসম্ভব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্র, লক্ষ্য অর্জনে অনবরত কাজে লেগে থাকা মানুষ। দেশে গবেষণা, টোফেল, জিআরই ইত্যাদি করে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর মতে রসায়ন বিভাগের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়া উচিত, কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের ডিমোটিভেশন বা নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়। বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী সন্তোষজনক ফলাফল করতে পারে না, কিন্তু তাদের জন্য দরকার মোটিভেশন, উৎসাহিত করা ও সহোযোগিতা করা। অবহেলা ও নিরুৎসাহিত হলে ভালো ট্র্যাকে ফেরা কঠিন, অগ্রগতিতে এটা বড় বাধা। বর্তমান সময়ে দেশ-বিদেশ অনেকে একাডেমিয়াতে সফলভাবে ক্যারিয়ার গড়েছেন, আবার কেউ কেউ স্বাধীনভাবে উদ্যোক্তা হয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই আমরা আশা করি আমাদের কেমিস্টি অ্যালামনাই সদস্যদের অনেককে ভবিষ্যতে এ ধরনের নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে পাব।
রসায়ন বিভাগের অ্যালামনাই ড. নাজমুলের জীবনের গল্প আমাকে খুব বিমোহিত করে। আমি খুব অভিভূত হই, আর অত্যন্ত মুগ্ধ হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে থাকা অবস্থায় তিনি বিয়ে করেন, শুনে খুব অবাক হয়েছি। এর থেকেও বড় বিষয় হলো জীবনের প্রতিকূলতাকে আলিঙ্গন করেই তিনি অনার্সে প্রথম হয়েছেন! মাস্টার্সেও তুখোড় রেজাল্ট। শিক্ষকতা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি একজন বড় গবেষক। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থনের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল রসায়ন বিভাগে প্রথম বর্ষে প্রথম দিনেই বড় হোঁচট খাওয়ার বিষয়। ঢাকার পার্শ্ববর্তী শহরের নিজ বাড়ি থেকে সেদিন খুব সকালে বের হয়ে পথে বাসে দেরি হওয়ায় ক্লাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর উপস্থিত হন। ক্লাসে থাকা শিক্ষক বড্ড অপমান করলেন, এবং ক্লাসে থাকার অনুমতিও মেলেনি। অপমানের রেশ কাটাতে অনেক সময় লেগেছিল, তবে ভালো ফলাফল করার দৃঢ় প্রত্যায় তাঁকে সফলতা দিয়েছে। তবু উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের কাছে থেকে প্রয়োজনীয় ভালো রিকমেন্ডেশন পেয়ে তাঁদের প্রতি নাজমুলের অনেক কৃতজ্ঞতা। বিভাগের গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনায় তাঁর মতে শিক্ষকদের শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়াটা খুব বেশি দরকার, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি দূর হতে হবে। দেশে রসায়ন গবেষণায় বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু আমরা সেটা মেনেই একটা বড় চাওয়া এই যে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের যেন অন্তত ভালো পড়াতে পারার যোগ্যতা থাকে। রসায়ন বিভাগের কোর্স সিলেবাস যথেষ্ট ভালো।
বয়সে তরুণ, অত্যন্ত কর্মঠ ও প্রাণচাঞ্চল্য আমাদের আরেক কিউট কাপল জুটি হলো ড. শামীম ও জ্যোতি। ঢাবি রসায়ন অ্যালামনাই। ভালো লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন প্রোগ্রামে জ্যোতির ছিল অগ্রণী ভূমিকা। অ্যালামনাই সম্মিলনী অনুষ্ঠান, রসায়ন অলিম্পিয়াড, নবীনবরণ, পিকনিক ইত্যাদি আয়োজনে তাঁর ছিল সক্রিয় উপস্থিতি। বিভাগের স্মৃতিচারণার কথায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এই পেশাজীবী জুটির রসায়নের সেই দিনগুলোতে খুব ভালো লাগার কথাগুলোই বেশ শোনা গেল।
৪.
বুকভরা আশা নিয়ে অনেকের মতো আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ঢাবি জীবনের সেইসব দিনের কথা প্রথম আলোতে বিস্তারিত লিখেছি, ‘যে পথে আলো জ্বলে’ শিরোনামে। বিজ্ঞান অনুষদে আমাদের ব্যাচের ক্লাস শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। আমার প্রথমত সুযোগ হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। পদার্থবিজ্ঞানে ছাত্রত্ব আরম্ভ করেও পরের সপ্তাহেই আমি রসায়ন বিভাগে নাম লেখাই। গাণিতিক সমীকরণ আর তত্ত্বে ভরা পদার্থ বিজ্ঞানটা আমি বুঝি না। তবে রসহীন রসায়নটা পড়তে মজা পাই, কিছুটা বুঝি।
রসায়ন বিভাগের প্রথম দিনের ক্লাসে গুরুগম্ভীর স্বভাবের অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কিছুটা খাটো গড়নের একজন শিক্ষক ২০০ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করলেন। কচি সদস্যদের কোলাহলে পূর্ণ কক্ষটিতে হঠাৎ পিনপতন নীরবতা। উনি অধ্যাপক মুহিবুর রহমান। পিএইচডি কেমব্রিজ। প্রখর স্মৃতিশক্তি তাঁর। ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির বস। পড়ানোর স্টাইল্টাই তাঁর অন্য রকম। মুগ্ধ হয়ে তাঁর সব কথা শুনলাম। মজা পেয়েছি। তবে দুর্ভাগ্য, আমার অজ্ঞ ব্রেনে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির পড়া কিছুই বুঝিনি! সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে টের পাই, আমি ঢের কম জানি।
ক্লাসসূচিতে চোখ রাখলাম, পরের ঘণ্টা জৈব রসায়নের। হাস্যোজ্জ্বল নরম মনের শান্ত শিক্ষক অধ্যাপক কাদের স্যার এলেন। রসায়ন বিভাগে তোমাদের স্বাগতম, তিনি কথা বলা শুরু করলেন। সব বিজ্ঞানের মূল হলো রসায়ন, বললেন তিনি। এটা ভালো করে শেখো। কী জানি ভালো লাগা পেয়ে গেলাম! আমি ইতিবাচক চিন্তার একজন মানুষ। অজানা অনেক কিছু। হতাশ হতে পারি, কিন্তু ভেঙে পড়ি না। বেসিক আলোচনা না করেই কিছু কথা শেষেই জৈব রসায়নের ‘রিয়াক্সন মেকানিজম’ আলোচনায় তিনি টার্ন নিলেন। নিজের সীমিত জ্ঞানেও দমে যাইনি। মজা আছে বিষয়টিতে। আরও মনোযোগী হই। ভালো লাগার সূচনা।
শিক্ষার উপকরণের সহজলভ্যতা, গুণী শিক্ষকের আধিক্য, আর্থিক সচ্ছলতাসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকার ছাত্রছাত্রীরা মেধায়-মননে এগিয়ে, তা অনস্বীকার্য, তাঁরা স্মার্ট। রসায়ন বিভাগে আমি তা দেখেছি। আমি মফস্সলের ছেলে। আমি ঢের কম জানি, তবু জানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। আমি কাঁদি। অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে! স্মার্টদের ভিড়ে কিছুটা হতবিহ্বল। তবে ভয়ে ভীত হইনি। গাঁওগ্রামের উন্মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের ভীতি থাকে না।
পরে অজৈব রসায়নের ‘অ্যানালিটিক্যাল’ ল্যাবরেটরি। ফ্লেম টেস্ট, চারকোল ট্রিটমেন্ট, টাইট্রেশন, ইনডিকেটর-লিটমাস, ফেনফথেলিন, থাইমল, মিথাইল অরেঞ্জ, মিথাইল রেড—এসব কী যেন হাবিজাবি কাজ। সবকিছু মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। বুঝি না। ল্যাবরেটরি ক্লাসের দায়িত্বে থাকা তিন শিক্ষকের একজন হলেন ড. এতমিনা ম্যাডাম। স্পষ্টভাষী, অপরূপ রূপের অধিকারী। আর সুন্দর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ঘোমটা পরা এই শিক্ষকের মধ্যে একজন মায়ের সব মায়া দেখতে পেলাম। তাঁর সঙ্গে আছেন একটু রাগী দুজন অধ্যাপক—ড. আলতাফ আর তাঁর সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ার। কোনো একদিন ভরসা খুঁজে এতমিনা ম্যাডামকে স্পষ্টতই বললাম অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবে আমার না বোঝার অপারগতা। দিন দিন পরম মমতায় একটু একটু করে তাঁর কাছে বিষয়টি শিখেছি। আত্মবিশ্বাসে ঢের জোর পেয়েছি।
রসায়নের কিছু বিষয় পড়তে মজা পাই। কিছু ক্লাসের পুরোটাই বুঝি না। তারপরও কোনো ক্লাস ফাঁকি দিইনি। শিক্ষকদের পড়ানো বিষয়গুলোকে নোট করেছি। প্রতিটি বিষয়ের আলাদা আলাদা পরিচ্ছন্ন নোট করতে হবে, দেখে শিখেছি। এই ফজলুল হক হলেই আছেন একই বিভাগের সিনিয়র তাজিম ভাই, রওশান ভাই, কামরুল ভাই। তাঁরা সবাই নিজ নিজ ক্লাসে প্রথম! সুযোগ খুঁজেছি তাঁদের সঙ্গে একটু কথা বলতে। মিশতে। তাঁরা ভালো ছাত্র, ভালো মানুষ হবেনই, আশা আমার। হ্যাঁ, ঠিক তা–ই। সুযোগও পেয়েছি। এগিয়ে যাওয়ার কৌশল বলেছেন তাঁরা আর দিয়েছেন সাহস।
অধ্যবসায়ে আরও মনোযোগী হই। দিন যায়। ধীরে ধীরে আস্থা বাড়ে। পেছনের সারির বেঞ্চ ছেড়ে সামনের সারিতে এগোচ্ছি। বাড়ছে সাহস। ক্লাসে শিক্ষককে বেশি বেশি প্রশ্ন করি। শিক্ষকের মনোযোগ কেড়েছি। বিধাতা বোধ হয় কথা শুনেছিলেন। প্রথম বর্ষ পরীক্ষা শেষে ফল বের হলো। খুব ভালো করেছি! ভিশন ঠিক করি, জয় করব। আর একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হব। পরে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। অধ্যয়নের বর্ষগুলো পেরিয়ে বিএসসি (সম্মান) পরীক্ষায়ও ভালো ফলের ধারাবাহিকতা থাকল। তবে মেধাতালিকায় প্রথম নয়, আমি দ্বিতীয় হয়েছি। কার্জন হল বিজ্ঞান অনুষদ থেকে সে সময় প্রথম চালু হওয়া ডিনস অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি!
খুব যত্নে লালিত স্বপ্ন আমার। একদিন শিক্ষক হব, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। না সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। অপূর্ণতা আছে, খুব বড় অপূর্ণতা। চোখের অবিরাম জলে ভেজা অপূর্ণতা। এমএসসি শেষ করে উড়াল দিয়ে চলে যাই দেশের বাইরে। জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট গবেষণা শেষ করি। টোকিওতে কতই–না সুযোগ, গবেষণার, চাকরির। না, সেখানে না, আমার স্বপ্ন আমার প্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছুটলাম দেশের টানে, বারেবারে। মোট তিনবার (২০০৬ থেকে ২০০৯)। রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হওয়ার চেষ্টায়। যোগ্যতার কোনো ত্রুটি ছিল বলে মনে হয় না। হয়নি, অজানা কারণে। বিখ্যাত টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের স্বনামধন্য দুজন শিক্ষক অধ্যাপক কিতাহারা ও অধ্যাপক ওয়াতানাবেরও সে কী সাপোর্ট! আমার জন্য তাঁরা চিঠি ও ই–মেইল লিখেছেন সিলেকশন কমিটির সবাইকে, ভিসি, ডিন, চেয়ারম্যানসহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার চেষ্টায় বারেবারে অনেক হতাশ হয়েছি। তৃতীয়বারে, প্রাণের কার্জন হলে দাঁড়িয়ে চোখের অবিরাম জলে ভিজিয়েছি গায়ে থাকা জামাটা। গড়িয়ে পড়া সেই জলে কার্জন হলের মাটিও সিক্ত হয়েছে। রসায়ন বিভাগের একজন তরুণ শিক্ষক তখন পাশে দাঁড়িয়ে। বিচারের ভার দিয়েছি সৃষ্টিকর্তার কাছে, উনি নিশ্চয়ই সব অবগত আছেন। ভেঙে পড়িনি। আছে মৃত্যুর আগে না মরার দৃঢ় মনোবল। মাঝে মাঝে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি, আমি কি হেরে গেছি? নাকি দেশ হেরেছে? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম আর দুর্নীতির খবর জানতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত (২৪ জানুয়ারি, ২০২১) ও বহুল প্রচারিত ‘আনুগত্য আর অনিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ’ লেখাটা পড়বেন।
৫.
জীবনের পথ চলি আর বারেবারে স্মৃতিতে ফিরে আসে প্রিয় ক্যাম্পাস কার্জন হল ও প্রিয় রসায়ন বিভাগ। স্মৃতির পাতায় সেই সাত বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। ১৯৯৬ থেকে ২০০২। আহ কী মজার সেই দিনগুলো! ভালো লাগা, খারাপ লাগা, বন্ধুত্ব, মনোমালিন্য সবই ছিল আমাদের। প্রেমও ছিল। ছিল সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। পেয়েছি শিক্ষা, করেছি ভালো ফলাফল। আমরা অর্জন করেছি বিবেকবোধ, বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা, পরিচিতি, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার শক্তি।
আহ সেইসব দিন! জীবনের বাস্ততায় আজ আমরা কাছাকাছি নেই। তাতে কী! আমাদের প্রাণের রসায়ন বিভাগটা আছে, থাকবে। নতুনেরা আসছে, আগামীতেও আসবে। তারা আসে অনেক স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নগুলো একসময় আলোর মুখ দেখে। স্বার্থান্বেষী মহলের কালো থাবায় কিছু স্বপ্ন মাটি চাপা পড়ে। ভুক্তভোগীকে কাঁদায় জনম জনম। আমিও কাঁদি—মাঝে মাঝে।
ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি রোমন্থন, আলোচনা-সমালোচনা গঠনমূলক কাজ। সমালোচনা গঠনমূলক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষায় মানোন্নয়নে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এখানে—
ক. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।
খ. শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি দূর হতে হবে।
গ. জাতি তৈরির মহান পেশা শিক্ষক হতে হলুদ-বেগুনি দল নয়, যোগ্যতা ও গবেষণার মানই যেন মুখ্য হয়।
ঘ. ঢাবিসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের নিজস্ব রাজনীতির দর্শন যেন কোনোভাবেই তাঁদের একাডেমিক এক্সিলেনসিতে (পারদর্শিতায়) প্রভাব না পড়ে।
ঙ. দেশে গবেষণায় বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু আমরা সেটা মেনেই একটা বড় চাওয়া এই যে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের যেন অন্তত ভালো পড়াতে পারার যোগ্যতা থাকে।
বাংলাদেশ থেকে মেধা পাচার, বা ব্রেন ড্রেনের হার কম হোক। প্রথম আলোতে প্রকাশিত (২০ মে ২০১৯) ‘মেধা পাচার’ লেখাটি পড়ে আমাদের বিবেকবোধ জাগ্রত হোক। রসায়ন বিভাগ, সব কর্মচারী, সব শিক্ষার্থী, সব শিক্ষক, ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিভাগের সব অ্যালামনাইয়ের জন্য শুভকামনা সব সময়ের জন্য। রস বিরসে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির এই ইতিকথা সামষ্টিকভাবে ঢাকা ইউনিভার্সিটি কেমিস্ট্রি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পঞ্চম বার্ষিক সম্মিলনী ২০২৬ পূর্বাপর বিভাগের ক্রমোন্নতিতে ভূমিকা রাখুক!
লেখক: ড. সাদেকুল ইসলাম, আমেরিকা