ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি: অধ্যাদেশে স্বস্তি, রূপরেখায় প্রশ্ন

সাত সরকারি কলেজকোলাজ: প্রথম আলো

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি হয়েছে। ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে কয়েক বছর ধরে চলমান অস্থিরতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিরোধের প্রেক্ষাপটে এ অধ্যাদেশকে অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস হিসেবে দেখছেন। অন্তত একটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে—এটিই অধ্যাদেশটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তবে একটি আইনি কাঠামো দাঁড়ালেও উচ্চশিক্ষার গুণগত মান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারত্বের প্রশ্নে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অধ্যাদেশের প্রস্তাবনায় সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে, যা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকতা এবং সনদায়নের ক্ষেত্রে একক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার পথ সুগম করতে পারে। এর ইতিবাচক দিক হলো, এটি সাত কলেজের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কথা বলেছে এবং স্বতন্ত্র নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তনের নামে জগন্নাথ কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বিলোপ হয়েছে। সে বিবেচনায় এই সংবেদনশীল দিকটি আমলে নেওয়া প্রশংসনীয়।

অধ্যাদেশের সংজ্ঞা অংশে ‘স্কুল’, ‘ডিপার্টমেন্ট/ডিসিপ্লিন’ ও ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ শিক্ষার মতো আধুনিক উচ্চশিক্ষা ধারণার অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এটি দেশের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী কলেজভিত্তিক শিক্ষাধারাকে ভিত্তি করে আরও সমন্বিত, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ও গবেষণামুখী একাডেমিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ইউজিসি ও বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের ভূমিকার স্বীকৃতি উচ্চশিক্ষার মাননিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সংযুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের এককভাবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতার ধারণাকে সমর্থন করে। কিন্তু শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক’ ও ‘কলেজ শিক্ষক’ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই একটি দ্বৈত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। এতে একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য একীভূত একাডেমিক পরিচয় নিশ্চিত করা হলেও, অন্যদিকে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে স্তরভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে একধরনের আমলাতান্ত্রিক এলিটিজমের চরিত্র আরোপ করা হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে একাডেমিক কর্তৃত্ব, পদমর্যাদা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশের প্রথম খসড়ার স্কুলিং মডেলভিত্তিক হাইব্রিড কাঠামোটি সাত কলেজের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা, উচ্চমাধ্যমিক স্তর বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা, নারী শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি, শিক্ষার বাণিজ্যিকীরণের অভিযোগসহ নানাবিধ কারণে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময় শিক্ষার্থীদের সনদসংক্রান্ত মৌলিক দাবি, কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও সম্পত্তির মালিকানা, অ্যালামনাই ও সাত কলেজের বিসিএস শিক্ষকদের স্বার্থ প্রভৃতি সূক্ষ্ম বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। অংশীজনদের মতামত ও নানামুখী প্রত্যাশার আলোকে শেষ পর্যন্ত পূর্বের মডেল থেকে সরে গত ২২ জানুয়ারি ‘সংযুক্ত কলেজ’ মডেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যাদেশ জারি হয়।

আরও পড়ুন

অধ্যাদেশের ধারা–৬-এর বিভিন্ন উপধারার মাধ্যমে, সংযুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে এমফিল/পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ ও বিশেষায়িত কোর্স পরিচালনা, সংযুক্ত কলেজের শিক্ষকদের গবেষণামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, সংযুক্ত কলেজের অবকাঠামোসহ শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়গুলো ইতিবাচক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনায় নতুনত্ব বহন করে। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতায় ছাত্রসংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতার সংস্কৃতি উচ্চশিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে। পাশাপাশি ধারা-৩২ অনুযায়ী ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব একটি আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী সংযোজন। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।  

তবে অধ্যাদেশটির চুলচেরা বিশ্লেষণে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই—এর মূল লক্ষ্য কি সত্যিই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা, না দীর্ঘদিনের অস্থির পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আপাতভাবে সন্তুষ্ট রাখা? বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় প্রশাসনিক সমঝোতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অংশীজনদের স্বার্থরক্ষার বিষয়গুলো যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তাতে এই প্রশ্ন অমূলক বলে মনে হয় না। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রচলিত প্রশাসনিক সংস্কৃতির ধারায় এখানেও জনস্বার্থের আড়ালে একটি বিশেষ এলিট শ্রেণির স্বার্থরক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গোষ্ঠীর ক্ষমতাচর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এখানে আইনগতভাবেই সংরক্ষিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

আরও পড়ুন

অবশ্য সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা সত্ত্বেও এ অধ্যাদেশে শিক্ষার্থীদের কিছু মৌলিক প্রত্যাশা পূরণের প্রশ্নে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ২০১৭ সালে সাতটি সরকারি কলেজ হঠাৎ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা ভেবেছিল এবার কলেজগুলোতে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে তারা দেশের সর্বোচ্চ ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ডিগ্রি ও সনদ অর্জনের সুযোগ পাবে। কিন্তু সে আশাভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হয়; পরীক্ষা, ফল প্রকাশ ও একাডেমিক কার্যক্রমে বিলম্ব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। উপরন্তু, সার্টিফিকেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকলেও শিক্ষার্থীদের ‘অধিভুক্ত কলেজের’ বলে চিহ্নিত করা হয়, যা তাদের প্রত্যাশার চূড়ান্ত ভাঙন ঘটায়।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি—যেখানে অধিভুক্তির তকমা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে সনদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল মুখ্য।  বিশেষত অধ্যাদেশের ধারা ৪৬-এ বর্ণিত ভর্তি পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতি অনুযায়ী, মেধাক্রম ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাস এবং সংযুক্ত কলেজসমূহে ভর্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে একই ভর্তি প্রক্রিয়ার আওতায় থেকেও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অবস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে পার্থক্য তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডিগ্রি ও সার্টিফিকেটের ফরম্যাট, নামকরণ বা কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাস ও সংযুক্ত কলেজভিত্তিক কোনো পার্থক্য থাকবে কি না—সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এই অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে সার্টিফিকেটের সমতা এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুযোগের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি করে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—সে বিষয়ে বিদ্যমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নটি অধ্যাদেশে বিশেষ গুরুত্ব পায়। অধ্যাদেশের ধারা ২৬, ৩৬ ও ৩৭ অনুযায়ী গঠিত যথাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেট, অর্থ কমিটি এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটিতে সংযুক্ত কলেজের কোনো শিক্ষক বা প্রশাসকের প্রতিনিধিত্ব না রাখা সেই পর্যবেক্ষণকে আরও প্রবল করে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল একাডেমিক কার্যক্রম যাঁদের মাধ্যমে সরাসরি পরিচালিত হবে, তাঁদের যদি একাডেমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা না হয়, তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ও কার্যক্রমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র প্রতিফলিত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বিশেষ করে, ধারা ২৭-এ অন্তর্ভুক্ত একাডেমিক কাউন্সিলে সংযুক্ত সাত কলেজের কোনো একাডেমিশিয়ান তথা শিক্ষককে সদস্যভুক্ত না করার ফলে একাডেমিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া সরকারি কলেজে উপাধ্যক্ষ একটি প্রশাসনিক পদ হলেও অধ্যক্ষকে আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হয় বলে, উপাধ্যক্ষ সাধারণত একাডেমিক বিষয়গুলো তদারকি করে থাকেন। অথচ অধ্যাদেশের সর্বত্র, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতই যথারীতি সাত কলেজের অন্যতম প্রশাসনিক পদ উপাধ্যক্ষকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

ধারা ৬ (জ) অনুযায়ী শিখন সহকারী বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (টিএ) পদ অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচায়ক। স্নাতকোত্তর ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে এই পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে টিএ নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক শিক্ষক নিয়োগের অভিজ্ঞতা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করে তোলে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন পদে কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের বিষয়টিও অধ্যাদেশে গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব প্রশ্ন ও সংশয় নিরসন না হলে, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট পদটি কার্যকর শিক্ষাসহায়ক শক্তি হয়ে ওঠার বদলে একটি প্রতীকী ও বিতর্কিত পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে আরও একটি মৌলিক প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি উন্নত সংস্করণে পরিণত হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই একটি এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়, পার্থক্য কেবল পরিসরে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন অধিভুক্ত কলেজের পাশাপাশি মূল ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম (এমফিল/পিএইচডি ও বর্তমানে স্নাতক (সম্মান) ) চলমান আছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে। পার্থক্য হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশব্যাপী বিস্তৃত ও অসংখ্য কলেজ এর অধিভুক্ত, বিপরীতে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কেবল ঢাকা শহরের সাতটি সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে গঠিত। এখানে ‘অধিভুক্ত কলেজ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সংযুক্ত কলেজ’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও কার্যগত দিক থেকে ব্যবস্থাটি প্রায় একই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অধ্যাদেশে এই সাত কলেজের বাইরে অন্য কোনো কলেজকে ভবিষ্যতে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে এটি বিস্তৃত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত পরিসরে পরিচালিত একটি এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোর নাম নয়; এটি জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণার বিস্তার, একাডেমিক স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষার উৎকর্ষ নিশ্চিত করার একটি প্রাণবন্ত বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠান। অথচ অধ্যাদেশে গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহায়ক একাডেমিক পরিবেশ গঠন, কিংবা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উৎকর্ষ ও বৌদ্ধিক বিকাশ অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েট নয়, বরং চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সামগ্রিক প্রক্রিয়া—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও দিকনির্দেশনামূলক অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোটি আদৌ কতটা গভীরভাবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়-চেতনা’ ধারণ করতে পারবে, সে বিষয়ে সংশয় থেকে যায়।

সন্দেহ নেই, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার ফল। এটি একদিনে সব সমস্যার সমাধান দেবে—এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। তবে যে অধ্যাদেশ একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করছে, সেখানে উচ্চশিক্ষার দর্শন, লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা আরও স্পষ্ট হওয়া জরুরি ছিল। এই অধ্যাদেশ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে স্বস্তি এনে দিলেও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রশ্নাতীত রাখতে পারেনি। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই কাঠামোর ভেতর থেকেই কীভাবে একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা সংস্কৃতি ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়। নচেৎ অধ্যাদেশ থাকবে, কাঠামো থাকবে, কিন্তু নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যার আলয়’ হয়ে ওঠার গৌরব অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।

লেখক পরিচিতি: সাব্রী সাবেরীন ও সৌরভ জাকারিয়া, শিক্ষক