গত এক বছরে অবসরের সংজ্ঞা বদলে গেছে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। ক্যাম্পাসে ফেরা হয় না অনেকদিন হলো। কীভাবে কাটছে শিক্ষার্থীদের সময়? সেটাই ছাত্রছাত্রীরা লিখে জানাচ্ছেন ‘এ সময়ের দিনলিপি বিভাগে’। আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন এই ইমেইলে: [email protected]। অথবা যোগাযোগ করুন স্বপ্ন নিয়ের ফেসবুক পেজে।
কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে থাকার কথা, সেখানে এখনো ভর্তি পরীক্ষার অপেক্ষায় আছি। এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেল আমাদের। মনে হচ্ছে যেন খাদে পড়েছি, কিংবা বলতে পারেন ঝুলে আছি। খাদে পড়ে টের পেলাম, ছুটে চলার এই জীবনে স্থিরতা নেই বললেই চলে। এই থমথমে পরিবেশের মধ্যেই কী করা যেতে পারে, ভাবছিলাম। আরও অনেকের মতো ফেসবুকেই সময় কাটছিল বেশি।
দিন যেতে যেতে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, অনলাইন কোর্সের বিভিন্ন ওয়েবসাইটগুলো স্বল্পমূল্যে, কিংবা বিনা মূল্যেও অনেক কোর্সে নাম নিবন্ধন করার সুযোগ দিচ্ছে। লুফে নিলাম সেসব সুযোগ। বরাবরই প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার আগ্রহ অনেক। এখন সময়টাও প্রযুক্তির। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা তো লাগবেই। ঘরে ফোন আছে, কম্পিউটার আছে। এসব যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার যদি না-ই শিখতে পারি, তাহলে পেশাজীবনে পায়ের নিচে শক্ত মাটি পাব কী করে!
খাদে পরে থাকা সময়টায় অল্প অল্প করে অনেক সফটওয়্যারের কাজ শিখেছি। অ্যাডোবি, মাইক্রোসফট, ইত্যাদি সফটওয়্যারের অ্যাপ্লিকেশনগুলোর ব্যবহার শিখেছি। সেই সঙ্গে শিখেছি, ফেসবুক পেজ কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। আমার এক আত্মীয়ের একটা ব্যবসায়িক পেজ আছে। সেই পেজের দেখভাল করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখছি। একজন রোভার স্কাউট হিসেবে অংশগ্রহণ করেছি নানা অনলাইন সেমিনারে।
এসবের পাশাপাশি লেখালেখির চেষ্টা করছি। লেখালেখি করতে গিয়ে শিখেছি, অনলাইনের মাধ্যমে কীভাবে সঠিক খবর পেতে হয়। বিভিন্ন সাইট ঘাঁটাঘাঁটি করে লেখাও পড়তে হচ্ছে অনেক। কলেজে পড়ার সময় আবিষ্কার করেছিলাম আমার অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ। মঞ্চে অভিনয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল তখনই। সেই সূত্রে বাইরের মঞ্চেও কাজ করেছি। কিন্তু এই লকডাউনে প্রথম ক্যামেরার সামনে ও পেছনে কাজ করেছি ছোট পরিসরে। কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করেছি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান।
এই লেখা পড়ে আপনার মনে হতে পারে, খুব ব্যস্ত সময়ই পার করেছি আমি, তাই না! আসলে এই দীর্ঘ অবসরে যা কিছু ‘কাজের কাজ’ করেছি, তার প্রায় সবটাই তুলে আনার চেষ্টা করলাম। এই এক বছরে অবসরের সংজ্ঞাই পালটে গেছে। এখন অবসর সময় বলে কিছু নেই, বরং আমরা বলি ঘরবন্দী জীবন। ঘরবন্দী হওয়ায় কিছু লাভও হয়েছে। জীবনবোধ, জীবনের মূল্য, এমন কঠিন শব্দগুলোর অর্থ কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে আমার মতো অনেক শিক্ষার্থী। একাডেমিক পড়াশোনার ভাড়ে বারান্দার কাঠগোলাপ, বাগানবিলাস গাছের বেড়ে ওঠা, ফুল ফোটা সেভাবে দেখা হয়নি আগে। একটা বাড়ি কীভাবে একটা একটা করে ইট বসিয়ে তৈরি হয়, নির্মাণাধীন ভবনের দিকে তাকিয়ে সেটাও কখনো দেখা হয়নি। এমনকি বারান্দায় বাকবাকুম করে ডাকা কবুতরগুলোকে কীভাবে পোষ মানাতে হয়, কখনো কি ভেবেছি? এই সব মিলিয়েই তো আমাদের ঘরবন্দী জীবন।
নোশিন হুমায়রা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থী