গতকাল শনিবার এ গবেষণা প্রবন্ধ জাহান আরা উপস্থাপন করেন ‘প্রথম জামাল নজরুল ইসলাম জাতীয় তরুণ গবেষক সম্মেলনে’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে অংশ নেন তাঁর মতো আরও ৫২৮ তরুণ গবেষক। তাঁদের কেউ তিন মিনিটে গবেষণার সারমর্ম তুলে ধরেন। আবার কেউ পোস্টারের মাধ্যমে গবেষণার বিষয়বস্তু পোস্টারে প্রদর্শন করেন। কেউ আবার সরাসরি গবেষণাকর্মের বর্ণনা দেন। ৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁরা এসেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

default-image

সম্মেলনের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডি সোসাইটি। প্রাণবন্ত এ সম্মেলন আয়োজনে সহযোগিতা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, এ কে খান ফাউন্ডেশন, জনতা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, স্টেলার, বার্জার পেইন্টস, হাবিব তাজকিরাস, কনফিডেন্স সল্ট, নেসক্যাফে, সিনমিন ও প্রথম আলো।

জাহান আরার প্রবন্ধটি বিচারকদের নজর কেড়ে নেয়। তিনি এ প্রবন্ধের জন্য একটি শাখায় তরুণ গবেষকের মধ্যে সেরাদের সেরা হয়ে সম্মাননা জিতে নেন। অবশ্য শুধু তিনিই নন, তিন ভাগে তাঁর মতো এমন আরও ১৩ জন সেরাদের সেরা গবেষকের সম্মাননা জিতে নেন। ছয়টি শাখায় তাঁদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

default-image

ছয়টি শাখা হলো পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল, জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, কৃষি ও উদ্ভিদ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যা এবং বাণিজ্য। এসব বিষয়ে গবেষকেরা গবেষণাকর্ম উপস্থাপন ও গবেষণার পোস্টার প্রদর্শন করেন। পাশাপাশি এসব শাখায় গবেষণার আইডিয়া উপস্থাপন করা হয়।

পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা যাঁরা

পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মোহাম্মদ ফরহাদ মজুমদার। জীববিজ্ঞানের পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের রক্তিম বড়ুয়া। কৃষি, পরিবেশ ও উদ্ভিদবিদ্যার পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের ফারজাহান আক্তার। চিকিৎসার পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা হন আইসিডিডিআরবির গবেষক অরিন্দম সিং। বাণিজ্যের পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাহিন রওশন চৌধুরী। সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যার পোস্টার শাখায় সেরাদের সেরা হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রিয়াঙ্কা দত্ত।

গবেষণাকর্ম বর্ণনায় সেরাদের সেরা যাঁরা

default-image

এ বিভাগটি মূলত সরাসরি গবেষণাকর্মের বর্ণনার। গবেষকেরা বিচারকদের সামনে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধটির বর্ণনা দেন। এ বিভাগের জীববিজ্ঞান শাখায় সেরাদের সেরা হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অন্তরা সাহা। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান শাখায় আইসিডিডিআরবির গবেষক সুস্মিতা দে। বাণিজ্য শাখায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের আবদুল্লাহ আল মামুন। কৃষি, পরিবেশ ও উদ্ভিদবিদ্যা শাখায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের সাঈদ মোহাম্মদ মোরশেদুর রহমান। এ ছাড়া কলা ও মানববিদ্যা শাখায় সেরাদের সেরা হন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড কোয়ালিটেটিভ স্টাডিজের নাসরিন জাবিন।

অন্যদিকে গবেষণায় আইডিয়া উপস্থাপনে সেরাদের সেরা হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট্রি বিভাগের নুরজাহান আক্তার।

এক অন্য রকম দিন

তরুণ গবেষকদের জন্য গতকালটা ছিল একেবারে অন্য রকম। তাঁরা একে অপরের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছেন। হাতে-কলমে গবেষণার পাঠ নিয়েছেন। সরাসরি গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করেছেন। পোস্টারের মাধ্যমে গবেষণাকর্ম তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিন মিনিটের মধ্যে বাংলা ভাষায় গবেষণার বর্ণনা করেছেন। আর বিচারকেরা তাঁদের মতামত জানিয়ে তরুণদের উৎসাহ জুগিয়েছেন।

default-image

সকাল ১০টায় সম্মেলনটি শুরু হয়। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিরীণ আখতার। আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘কল্পনা ও উদ্ভাবনের পথে আগামী প্রজন্ম’। আয়োজনের প্রথম পর্বে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সহ-উপাচার্য বেনু কুমার দে, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নাসিম হাসান। এতে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্ষদ সদস্য ও গবেষক সেঁজুতি সাহা। তরুণদের বিজ্ঞান গবেষণায় উদ্বুদ্ধকরণ পর্বে মূল বক্তা ছিলেন প্রথম আলোর যুব সমন্বয়ক কর্মসূচির প্রধান মুনির হাসান। ‘জামাল নজরুল ইসলাম স্মারক বক্তৃতার’ বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আরশাদ মোমেন। স্পটলাইট স্পিকার ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত। স্মৃতিচারণা করেন বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের মেয়ে সাদাফ সিদ্দিকি ও নারগিস ইসলাম।
দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তরুণ গবেষকদের মূল্যায়ন জরুরি বলে সম্মেলনে মত দেন জ্যেষ্ঠ গবেষকেরা। আইনুন নিশাত তরুণ গবেষকদের উদ্দেশে দীর্ঘ আলোচনায় বলেন, ‘গবেষণা হচ্ছে কোনো বিষয়ে গভীরে যাওয়া। জ্ঞানের পরিধি থাকতে হবে প্রশস্ত। এ জন্য পড়ার বিকল্প নেই। কিন্তু গবেষণার সময় একটা সরু এলাকায় যেতে হবে। গবেষণার প্রধান সমস্যা হচ্ছে মেথডলজি (পদ্ধতি)। তোমরা গবেষণার তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে বসে প্রথমে পদ্ধতি ঠিক করবে। তারপর পদ্ধতি ধরে এগোবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণার টপিক বেছে নেওয়ার সময় সিরিয়াস হতে হবে। সুপারভাইজার হয়তো তিনটা টপিক বলেছিল। এর মধ্যে একটা বেছে নিয়ে কাজ শুরু করেছ। কাজ করতে গিয়ে দেখা যাবে কিছুদিন পর টপিক পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু সে সময় টপিক বদলানো যাবে না। যে টপিক নিয়ে কাজ শুরু করেছ, সেটাই শেষ করতে হবে।’

default-image

অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি না করে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ধসে গেছে। আমরা চাই না বাংলাদেশের অর্থনীতিও তিন-চার বছরে এমন বিপদে পড়ুক।’

গবেষক সেঁজুতি সাহা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এর পাশাপাশি সমাধানও বের করতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের বিষয়ে সেঁজুতি সাহা বলেন, বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম চাইলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চলে আসেন। নিশ্চয়ই অনেক বাধা তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু এসব বাধা তিনি পার করে গেছেন।

default-image

প্রথম আলোর যুব সমন্বয়ক কর্মসূচির প্রধান মুনির হাসান বলেন, গবেষণা করতে হলে শুরুতেই পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। এ জন্য গবেষণা প্রবন্ধ পড়তে হবে। গবেষণায় সফল হতে হলে সময় দিতে হবে। একাগ্রভাবে লেগে থাকতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ধৈর্যসহকারে গবেষণা করতে হবে। একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লক্ষ্য স্থির করতে হবে। তিনি আরও বলেন, গবেষকদের দেশ ও সমাজ সচেতন হতে হবে। জীবনের অন্য দিকগুলোর আনন্দ উপভোগ করতে জানতে হবে। ভ্রমণপিপাসু হতে হবে। পর্যাপ্ত সহায়তা ও উৎসাহ জোগালে একজন তরুণ গবেষক অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারেন। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ প্রথম আলোর গণিত অলিম্পিয়াড ও শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসের অংশগ্রহণকারীরা। এখানকার বিজয়ী প্রতিযোগীদের পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে প্রথম আলো। এঁদের মধ্যে অনেকেই হার্ভার্ড, এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে গেছেন। প্রথম আলো এ কাজ বরাবরই করে যাচ্ছে।

গবেষক সম্মেলনে বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন