মুখস্থবিদ্যার ‘অসাধারণ’ জ্ঞানসমাচার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়
এ সপ্তাহে ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমার এক আত্মীয় পরীক্ষার্থী, তিনি পরীক্ষা শেষে প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করায় বিষয়টি নজরে পড়ল। শুনেছি সাধারণ জ্ঞান অংশে কিছু প্রশ্নের নমুনা নিম্নরূপ—
•পান্ডা দৈনিক কী পরিমাণ বাঁশ খায়? উত্তর: ৩৮ কেজি।
•২০২০ সালের বর্ষসেরা ফুটবলার কে? উত্তর: রবার্ট লেভানডফস্কি।
• ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রের পরিচালক কে? উত্তর: মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী, কিন্তু উপন্যাসের রচয়িতা: আবু ইসহাক।
•ম্যারাডোনা কত সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন? উত্তর: ১৯৭৭ সালে।
•ক্রিকেট ব্যাটের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কত? উত্তর: ক্রিকেট ব্যাটের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৯৬ ও ১০ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার।
আমার অনুমান, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই এ প্রশ্নগুলো করেছেন। তা দেখে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম, সে কথা মনে পড়ে গেল! বাংলা অংশে একটি প্রশ্ন ছিল—‘সোনার তরী’ কবিতায় ‘সোনার তরী’ কথাটি কতবার ব্যবহৃত হয়েছে?
নিশ্চয়ই এ অংশের প্রশ্ন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষক। বোধ করি, তিনি মনে মনে নিজেকে বিশেষ চালাক ভেবেছিলেন প্রশ্নটি করতে পেরে যে এবার পরীক্ষার্থীদের বেশ জব্দ করা গেল!
ঘটনাক্রমে তখন এইচএসসির বাংলা সিলেবাসের সব কবিতা আমার আগাগোড়া মুখস্থ ছিল। তাই আমি পরীক্ষার হলে এ প্রশ্ন দেখে মনে মনে কবিতা পড়ে গুনে বের করেছিলাম কতবার ‘সোনার তরী’ কথাটি আছে ওই কবিতায়!
তারপর বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি, ওই প্রশ্নকর্তা শিক্ষক ছিলেন নিতান্ত একজন মানুষ। এসব বুদ্ধিহীনতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ফসল! তিনি হতে পারেন বাংলার শিক্ষক, কিন্তু ‘সোনার তরী’ কবিতার মর্মার্থ অনুধাবন আর ছাত্রদের এ ব্যাপারে যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য তা নিয়ে যথার্থ প্রশ্ন করতে পারা—এ দুই বিষয়ের কোনো ক্ষেত্রেই তাঁর কোনো ধারণা নেই! সম্ভবত, সেই প্রশিক্ষণও তাঁর নেই!
আমি নিজে শিক্ষক অথবা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ নই, এখানে শুধু নিজের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা আর ভাবনা আপনাদের সঙ্গে বিনিময় করছি। অনেকের সঙ্গে আলাপ করে দেখেছি যে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে এমন ভাবনা শুধু আমার একার নয়।
এখন নিজেদের ছাত্রজীবনের মূল্যায়ন করে দেখি, আমাদের স্কুল-কলেজের বাংলা বইয়ের পাঠ্যক্রমে ও পরীক্ষায় জোর দেওয়া হতো অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুখস্থ করার বিষয়ে। যেমন কবি সুফিয়া কামালের জন্ম বরিশালের কোথায়, কত সালে কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মাতুলালয় কোনো গ্রামে ছিল ইত্যাদি ‘অসাধারণ’ জ্ঞানের তথ্যে। সে তুলনায় কোনো একটি কবিতার মর্মার্থ যথাযথভাবে অনুধাবন করা কিংবা কোনো প্রবন্ধের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে লেখালেখির যোগ্যতা অর্জনের বালাই আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে বিশেষ ছিল না!
আমার মতে এর জন্য সাধারণত স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকেরা দায়ী নন! স্কুল-কলেজ পর্যায়ে যাঁরা শিক্ষকতা করতে যান, তাঁরা কতটুকু যোগ্য ও কেন অধিকতর যোগ্য লোকেরা এসব চাকরিতে যান না বহুকাল, তার বহু আর্থসামাজিক কারণ আছে, যা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক রচনা, শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কারে নানা সময়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা থাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্ঞানী-গুণী শিক্ষকদেরও। তাঁরা কেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব মুখস্থনির্ভর নির্বুদ্ধিতার চাষাবাদের চক্র চালিয়েই যাচ্ছেন, তার কারণ ভেবে পাই না!
পরিস্থিতি দেখে স্পষ্ট যে দেশের এই শীর্ষ পর্যায়ের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রণেতারা একটি জীবন পার করে দিচ্ছেন পৃথিবীর অন্যান্য অগ্রসর শিক্ষাব্যবস্থায়, যেসব যুগোপযোগী পদ্ধতি অবলম্বনে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতা যাচাই করা হয়, তার তেমন কিছুই না জেনে এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তা প্রয়োগের তেমন কোনো চেষ্টা না করেই। অথচ তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজ নিজ বিষয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিদ্বান ব্যক্তি হিসেবে আমাদের আলোচনার মধ্যমণি হয়ে আছেন। অথচ শিক্ষক হিসেবে নিজেদের মূল কাজের ক্ষেত্রেই তাঁরা উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার আনতে পারছেন না!
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে, যখন গুগল করলেই মাইক্রোসেকেন্ডে যেকোনো তথ্য পাওয়া যায়, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বাছাই প্রক্রিয়ায় ‘পান্ডা কী পরিমাণ বাঁশ খায়’ অথবা ‘ম্যারাডোনা কবে প্রথম ফুটবল খেলেছিলেন’ কিংবা ‘কোন মন্ত্রণালয় কবে গঠিত’—এসব তথ্য মুখস্থ রাখতে বাধ্য করার যৌক্তিক কারণ কী?
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম গত দশক থেকে পৃথিবীর চলমান প্রযুক্তিবিপ্লব ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দশকগুলোয় কোন কোন বিষয়ে ছাত্রছাত্রী ও কর্মপ্রত্যাশীদের দক্ষতা অর্জন জরুরি, নিয়মিত তার তালিকা প্রকাশ ও তা নিয়ে গবেষণা করে থাকে। সেখানে কমপ্লেক্স প্রবলেম সলভিং, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি রয়েছে শীর্ষ ১০ প্রয়োজনীয় দক্ষতার তালিকায়! আর আমরা ২০২১ সালেও এসে ভর্তি-ইচ্ছুকদের যোগ্যতা মাপছি তারা কত বেশি অপ্রয়োজনীয় তথ্য মনে রাখতে পারে তার ভিত্তিতে!
এ চক্র আমাদের স্কুল পর্যায় থেকে শুরু হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছুঁয়ে বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে! আর তা হলো প্রক্রিয়ামাত্র, ফলাফল আমরা টের পাই যখন এসবের কর্মফল রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
অথচ আমাদের অনেক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে বিশেষায়িত বিভাগ রয়েছে। তারা কেন এত বছরেও এ মুখস্থবিদ্যার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান তৈরি করতে পারছে না? বিশ্বের নানা দেশে অ্যাপটিউট টেস্টভিত্তিক অনেক সফল মডেল শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই নব্বই দশক থেকেই ব্যবহার করে আসছে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটও তেমন ধারা অনুসরণ করে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে বহু বছর। অন্যরা কেন তা অবলম্বন করতে পারছে না?
সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির নামে স্কুল–কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে গত দশক থেকেই নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা হচ্ছে। তা যদি শেষমেশ স্থান, কাল ইত্যাদির নাম ও অপ্রয়োজনীয় তথ্যে ঠাসা মস্তিষ্ক তৈরি করে, তাহলে এসব পরীক্ষা–নিরীক্ষার ফলাফল শেষমেশ প্রায় শূন্যই বলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞ গবেষকদের কাছে তাই আমাদের আকুল অনুরোধ, এই মুখস্থবিদ্যার চক্র এবার শেষ করুন! অ্যাপটিউট টেস্টের যেসব সফল মডেল বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবহার করে, তা থেকে উদাহরণ নিয়ে আমাদের এখানেও ছাত্রছাত্রীদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও চিন্তার সক্ষমতা যাচাই করা যায়—এমন পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করুন। স্কুল–কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যক্রমও সেভাবে সংস্কার করুন।
পান্ডা দৈনিক কত কেজি বাঁশ খায়—এ তথ্য মুখস্থ রাখে, এমন গুণী প্রজন্ম তৈরি আমরা আর চালিয়ে যেতে চাই না!
*লেখক: উন্নয়নকর্মী