প্রথম আলো: কিছু সমস্যার কথা বললেন, বাস্তবতা হলো নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সারা দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এখনো শুরুই করা যায়নি। কী বলবেন?

মনজুর আহমদ: শিক্ষাব্যবস্থায় সামগ্রিক যে দুর্বলতা আছে, সেটিই এখন দেখা গেল। এ নিয়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী কার্যক্রম নেওয়া হয়নি। একটি বড় সমস্যা হলো, আমাদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে কাজ করতে পারে না। মনে হচ্ছে বিপদে পড়ে যাচ্ছি। আগের শিক্ষাক্রমও প্রস্তুতিসহ নানা কারণে ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যায়নি। আমাদের শিক্ষকের সংখ্যায় বড় সমস্যা আছে। নতুন শিক্ষাক্রমটি উচ্চাভিলাষী। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত যা হওয়ার কথা, তা কোথায়? আর চার-পাঁচ দিনের ওরিয়েন্টশনের মতো প্রশিক্ষণ দিলে চলবে? এটি বিরামহীন চলা উচিত। শুধু পাঠ্যপুস্তক লিখলেই হবে না। পাঠ্যপুস্তক লেখা নিয়েও তো সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে।

প্রথম আলো: তাহলে আনন্দময় শিক্ষার জন্য কী করা উচিত?

মনজুর আহমদ: এ জন্য নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ কম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীপিছু ১০-২০ বছর ধরে প্রকৃত খরচ হিসাব করলে খুব একটা উন্নতি হয়নি। সে জন্য মানসম্মত শিক্ষা হয় না। আমাদের আশপাশের দেশগুলোও আমাদের তুলনায় বেশি খরচ করছে। আমাদের যথেষ্ট শিক্ষক নেই, শিক্ষকের যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ঠিক নেই, ঠিকমতো উপকরণ নেই, যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান করা হয় না। প্রাথমিকে খোঁজ নিন, কত বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনেক পদও খালি। এ জন্য পরিকল্পনা করে না এগোলে সমস্যা থেকেই যাবে।

প্রথম আলো: আমরা দেখি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয় যত গুরুত্ব দেওয়া হয়, মানবসম্পদ উন্নয়নে ততটা গুরুত্ব নেই। যেমন পিটিআইয়ের বিদ্যমান ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ কোর্সকে সংকুচিত করে ১০ মাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মনজুর আহমদ: অবকাঠামোয় জোর দেওয়া হচ্ছে, এক অর্থে এটি ঠিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। একটি শ্রেণিকক্ষে যে পরিবেশ থাকা দরকার, তা অনেক জায়গায় নেই। আর শিক্ষকের যেমন অভাব আছে, তেমনি দক্ষতারও অভাব আছে। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একসময় সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সিইনএড) নামে কোর্স ছিল। সেটি ছিল এক বছর মেয়াদি। তখন মনে করা হলো, সেটি যথেষ্ট নয়, মানও ঠিক নয়। সে জন্য সংস্কার করে কোর্স ১৮ মাস করা হলো। ২০১২ সাল থেকে ধাপে ধাপে সব পিটিআইয়ে এ কোর্স চালু করা হলো। এখন আবার সেটি কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কী? মনে হচ্ছে, কোনো কর্মকর্তা বিষয়টি ভাবলেন আর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হলো। ১৮ মাসের কোর্সের সমস্যার সমাধান না করে এখন ‘মাথাব্যথা হয়েছে, মাথা কেটে ফেল’—এমন অবস্থা করা হলো।

প্রথম আলো: দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। কিন্তু অনেকগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইউজিসি কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দিচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মনজুর আহমদ: আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাতেই নানা সমস্যা আছে। উচ্চশিক্ষায়ও তা দেখতে পাচ্ছি। মান রক্ষা করে উচ্চশিক্ষার যেভাবে বিস্তার হওয়া দরকার ছিল, সেটি করা যাচ্ছে না। এখানে কিছুটা রাজনৈতিক ব্যর্থতাও আছে। সরকারি-বেসরকারি এত এত বিশ্ববিদ্যালয় হলো, কিন্তু সেগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসির) যে ধরনের সক্ষমতা, লোকবল দরকার, তা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগেও সমস্যা আছে। উচ্চশিক্ষার জন্য যে ধরনের পরিবেশ ও মর্যাদা দরকার, তারও অভাব রয়েছে।

প্রথম আলো: আপনি শিক্ষার জন্য ‘মেগা প্রকল্পের’ কথা বলেন। এটি একটু বিস্তারিত বলবেন?

মনজুর আহমদ: আমাদের অবকাঠামো খাতে অনেক মেগা প্রকল্প হচ্ছে। এ নিয়ে গর্ব করার মতো বিষয় আছে। শিক্ষা জাতির ভবিষ্যতের জন্য, উন্নতির জন্য একটি অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়। তাহলে শিক্ষার জন্য কেন মেগা প্রকল্প নিচ্ছি না? শিক্ষার ক্ষেত্রে মেগা প্রকল্প কিন্তু অবকাঠামোর মতো বিষয় নয়। এখানে সামগ্রিক শিক্ষা খাতকে একটি পরিকল্পনায় এনে কাজটি করতে হবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হব। কিন্তু সে জন্য আমাদের মানবসম্পদের সক্ষমতা, উন্নয়নে কি কোনো পরিকল্পনা আছে? সে জন্যই সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। সুতরাং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেটা শুধু কথা নয়, কাজে হতে হবে। শিক্ষার সুশাসন ও বিকেন্দ্রীকরণে পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষা ও মানবসম্পদের জন্য অভিন্ন মন্ত্রণালয় দরকার, যাতে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা নেওয়া যায়। এ ছাড়া একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন দরকার।