শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয়গুলোয় অভিভাবক–শিক্ষক পরিষদ (পিটিএ) কার্যকর করা জরুরি
শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া কমাতে বিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক–শিক্ষক পরিষদ (পিটিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে পিটিএ কার্যকর, সেখানে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে। বিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম বহুলাংশে বেড়ে যায়।
শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয়, পরিবার ও কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০–এ শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় পিটিএ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর করতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন। পিটিএ কার্যকর হলে শিক্ষকদের মধ্যে জবাবদিহি তৈরি হবে এবং সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়বে।
আজ রোববার (২১ জুন ২০২৬) ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘পিটিএ শক্তিশালীকরণ এবং শিখন ঘাটতি পূরণে বুনিয়াদি উদ্যোগ: একসঙ্গে শেখা’ (নলেজ ডিসসেমিনেশন অন পিটিএ স্ট্রেনদেনিং অ্যান্ড এফএলএন ক্যাচ–আপ ইনিশিয়েটিভ ইনসেপশন: লার্নিং টুগেদার) শীর্ষক অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি। অনুষ্ঠানে সরকার–বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনেরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা বড় চিন্তার বিষয়, শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার আগেই ঝরে পড়া। এই ঝরে পড়ার একটা কারণ, ক্লাসে পড়া না বোঝা। এ জন্য শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে।
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে শুধু কেন্দ্রভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কমিউনিটির অংশগ্রহণ ছাড়া এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে একটি নতুন সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পিইডিপি–৪) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, ‘পিটিএ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত সম্পদ। এটিকে কার্যকর করা গেলে স্কুলে শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ও ফাউন্ডেশনাল লার্নিং অর্জন করা অনেক সহজ হবে।’
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির প্রোগ্রাম হেড (ডেভেলপমেন্ট) মো. মোয়াজ্জেম হোসেন প্রকল্পের মূল অর্জনগুলো উপস্থাপন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শিখন ঘাটতি পূরণের ক্যাচ–আপ লার্নিং প্রোগ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার যে জায়গাগুলো সরকারের এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে ব্র্যাক সরকারের সঙ্গে একত্রে কাজ করছে। পিটিএ সমাজের প্রতিচ্ছবি, সমাজের এই অংশকে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে শিক্ষা খাতে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
সুশাসন ও শিক্ষার্থী ধরে রাখায় পিটিএ
পিটিএর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতনতা তৈরি ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার হার বাড়াতে ব্র্যাক ‘পিটিএ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ পরিচালনা করছে। রংপুর জেলার সদর, বদরগঞ্জ ও পীরগঞ্জ উপজেলার ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে।
পিটিএ শক্তিশালীকরণের প্রভাব, সম্ভাবনা ও শিখন তুলে ধরতে একটি গবেষণা করেছে ব্র্যাক। ৬০টি বিদ্যালয় ও ৬০০ অভিভাবকের মধ্যে জরিপ এবং শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার ও পিটিএ কমিটি–অভিভাবকদের সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব বিদ্যালয়ে পিটিএ কার্যকর, সেখানে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে। বিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম বহুলাংশে বেড়ে যায়।
শিখন ঘাটতি পূরণে ক্যাচ–আপ লার্নিং
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে ‘ব্র্যাক একসিলারেটেড ক্যাচ–আপ লার্নিং প্রোগ্রাম’ চালু করেছে। সরকারের প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম–৫ (পিইডিপি–৫)–এর অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প ব্যয়ের ও গ্রহণযোগ্য মডেল হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামের চিলমারী ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও শেরপুরের নালিতাবাড়ি, সিলেট বিভাগের সিলেটের জৈন্তাপুর ও বরিশাল বিভাগের ভোলার লালমোহন—এ ছয়টি উপজেলায় এই প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হবে।
তিন বছর মেয়াদি এই প্রোগ্রাম ৭৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত হবে। এই প্রোগ্রামে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিকারমূলক (রিকভারি) এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিরোধমূলক (প্রিভেনশন) কার্যক্রম রাখা হয়েছে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়া, লেখা ও গণিতের সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি আনা সম্ভব হবে। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির সিনিয়র অ্যাডভাইজার প্রফুল্ল চন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকেরা যদি সন্তানের শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তা শিক্ষায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই লক্ষ্যেই পিটিএকে নতুন করে কার্যকর করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।