প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কারে একজন প্রভাষকের ১৮ সুপারিশ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর শিখনকেন্দ্রে ক্লাস শেষে ঘরে ফিরছে শিশুরা। কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কুতুবদিয়া পাড়ায়।প্রথম আলো ফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থার একটি। দেশে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি ও ৫৩ হাজার ৩৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬। মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬২ ও ছাত্রী ১ কোটি ৩ লাখ ২৯ হাজার ৮৬, যা প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া ৮১ হাজার ২৩০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ শিক্ষক কর্মরত আছেন, যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪। বর্তমান শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২৮। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা ও আর্থিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে সরকার শতভাগ উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, ফলে উপবৃত্তি প্রদানের হার বর্তমানে ১০০ শতাংশ।

শিক্ষা হলো অজ্ঞানতার গাঢ় অন্ধকারকে দূরীভূত করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। প্রাথমিক স্তরে গুণগত শিক্ষা অর্জন করলেই শিশুরা ভবিষ্যতের যাবতীয় বাধাবিপত্তি মোকাবিলার যোগ্যতা অর্জন করে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাই শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মূল ভিত্তি। স্থিতিশীল উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) চতুর্থ লক্ষ্য ‘সকলের জন্য সম্মতিপূর্ণ শিক্ষা’ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে সম্প্রতি কোভিড–১৯ মহামারি পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রকম্পিত করে তুলেছে। এই সংকটের ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তের দেশগুলো শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার জন্য চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

সময়ের চাকা বদলে গেছে। এখন শুধু শিক্ষার বিস্তার নয়, তার সঙ্গে গুণগত মানকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, উন্নত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা আজ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জাতির অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও একটি প্রাণবন্ত সমাজ গঠনে এই গুণগত শিক্ষাই মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। সেই মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়েই রচিত হতে হয়। শিশুর কোমল মনে সুন্দর ও প্রকৃত শিক্ষার বীজটি তখনই বপন করতে হবে, যখন তার মনন গড়ে ওঠার সময়। এই প্রারম্ভিক পর্যায়টিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রাথমিক শিক্ষাই পরবর্তী সব শিক্ষার মজবুত ভিত্তি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে রাষ্ট্র একটি অভিন্ন ও জনকল্যাণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত প্রত্যেক নারী–পুরুষ শিশুকে বিনা মূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা করবে। এই শিক্ষাব্যবস্থার শুরুর সিঁড়িটিই হলো প্রাথমিক শিক্ষা, যা শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাথমিক শিক্ষার রূপ, বয়সসীমা, মেয়াদ ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বিস্তর বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। কারণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ই একটি শিশুর জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের প্রথম ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে কেবল একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আজ বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের সংকট, প্রশাসনিক জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক দায়িত্ব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পিত ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কারের বিকল্প নেই।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রতি কিছু সুপারিশ—

১. প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ক্লার্ক নিয়োগ করুন, যাতে শিক্ষকেরা প্রশাসনিক কাজের পরিবর্তে পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন।

২. বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ প্রদান।

৩. স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একজন স্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ প্রদান।

৪. দাপ্তরিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন পিয়ন নিয়োগ প্রদান।

৫. বিদ্যালয়ের ভবন, আসবাব ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একজন নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রদান।

৬. প্রতিটি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, স্টোররুম, শিক্ষক কমনরুম, শিক্ষার্থী কমনরুম, মাল্টিমিডিয়া রুম ও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষসহ কমপক্ষে ১২টি কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণ।

৭. প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে অন্তত ১৪ যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রদান।

৮. শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের, নিয়মিত ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে তাঁরা আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন।

৯. দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অনিয়ম ও কর্তব্যে অবহেলার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান ও দক্ষ শিক্ষকদের যথাযথ স্বীকৃতি ও পুরস্কার প্রদান।

১০. শিক্ষকদের ভোটার তালিকা, জনশুমারি, নির্বাচন ও অন্যান্য অশিক্ষামূলক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁদের সম্পূর্ণ কর্মঘণ্টা শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা।

১১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করে ধাপে ধাপে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা প্রদানের বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ।

১২. প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক আইসিটি ল্যাব, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ ও একজন দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ প্রদান।

১৩. শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন খেলার শিক্ষক ও একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ প্রদান।

১৪. বিদ্যালয়ের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি ক্লাস্টারে একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক নিয়োগ প্রদান।

১৫. দুর্গম, পাহাড়ি, হাওর ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য সরকারি আবাসন, বিশেষ যাতায়াত ভাতা ও প্রণোদনা চালু করা।

১৬. যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দ্রুত পদোন্নতি ও উচ্চতর বেতন স্কেলের একটি স্বচ্ছ ও স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা।

১৭. প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ডে–কেয়ার সেন্টারের সুবিধা নিশ্চিতকরণ।

১৮. প্রাক্‌–প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য শতভাগ বিনা মূল্যে মানসম্মত ও পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি চালু করুন, যাতে অপুষ্টি কমে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ে ও শেখার পরিবেশ আরও উন্নত হয়।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উন্নয়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষাকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার। একটি আধুনিক বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত শিক্ষক, দক্ষ প্রশাসনিক জনবল, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্য ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষকসমাজ গড়ে তুলতে পারলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তৃণমূল পর্যায়ের এই মৌলিক চাহিদাগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো গেলে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে। এর সুফল শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, আগামী কয়েক দশক ধরে সমগ্র জাতি ভোগ করবে। কারণ, আজকের একটি সুশিক্ষিত শিশু আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক, সৎ নেতৃত্ব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান চালিকা শক্তি।

*লেখক: ফয়সাল হাবিব, প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া