default-image

ছোটবেলায় পৃথিবী বলতে যখন বিদেশ আর বাংলাদেশকে বুঝতাম, তখন দক্ষিণ কোরিয়াপ্রবাসী ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারলাম, পৃথিবীতে অনেক দেশই আছে। তখন আমার বিদ্যালয়ে যাওয়া–আসা শুরু হয়নি। স্কুলজীবনের শুরু থেকেই আমার এলাকায় কোনো বিদেশি এলে দূর থেকে তাদের দেখতাম, তাদের চলাফেরা থেকে শুরু করে সবকিছুই নকল করার চেষ্টা করতাম। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। আমার প্রবাসী ভাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ দর্শনে হাজির হলো তার বিদেশি বন্ধুমহল। আমি তখন টুকটাক ইংরেজি বলতে পারি। আর একজন বিদেশির সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা যেন মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের চেয়ে বেশি কিছু। যাহোক, ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসের মাধ্যমে জানতে পারলাম, দেশটিতে বাংলাদেশিদের জন্য বিনা মূল্য (ফুল ফান্ডেড) স্কলারশিপ আছে। দেরি না করেই দূতাবাসে যোগাযোগ শুরু করলাম। দূতাবাসে সহজেই পেয়ে গেলাম সিরাজ স্যারকে। স্যারের ব্যবহার আর ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে বর্ণনা আমার মন ইন্দোনেশিয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেল। তাই স্কলারশিপের আবেদন শেষ করে অপেক্ষা। এ অপেক্ষা কবে আসবে দূতাবাসের জন্য। আর ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাসের প্রত্যেক কর্মকর্তা–কর্মচারীর ব্যবহার অমায়িক, যা দেখে আমি আরও অনুপ্রাণিত।
ইবু (মা/শিক্ষিকা) মুর্নি, ইবু আন্নি এর ব্যবহার ছিল প্রশংসনীয়। যাহোক, অবশেষে আবেদন সম্পন্ন করার তিন মাস পর দূতাবাস থেকে ইন্টারভিউর ফোন এল।

স্বপ্নপূরণের দ্বারপ্রান্তে। ইবু মুর্নি আমার ভাষা ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষক হওয়ায় ইন্টারভিউতে জড়তা একটু কম কাজ করছিল। আগে থেকে ভাষা জানার কারণে আমার ভাইভা ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় হলো। যাহোক, সাহস হারালাম না। ভাইভার দুই মাস পর যখন রেজাল্ট হলো, বাংলাদেশিদের মধ্যে আমার নাম প্রথম সারিতেই দেখলাম। নানা প্রকার আইনি আর ভিসা জটিলতার মাধ্যম্যে অবশেষে দুজন বাঙালি পেলাম ইন্দোনেশিয়ান সরকারের দার্মাশিশওয়া স্কলারশিপ। স্বপ্ন পূরণ হলো আমার।

বিজ্ঞাপন

¯œস্নাতকের পাট চুকিয়ে ইন্দোনেশিয়ান সরকারের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পৌঁছলাম মধ্য জাভার জোগজাকার্তা শহরের আহমেদ দালান বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই ঋতুর এই দেশের প্রতি আমার টান জন্মলগ্ন থেকে।

প্রতিবছরের ইন্দোনেশিয়ান সরকার তিন ধরনের শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। তিন মাসের কালচালারাল এক্সচেঞ্জ, দার্মাশিশওয়া ও কেএনবি। দার্মাশিশওয়া ও কেএনবি ইন্দোনেশিয়ান সরকারের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাবৃত্তি। দার্মাশিশওয়া শিক্ষাবৃত্তি এক বছরের, কেএনবি শিক্ষাবৃত্তি তিন বছরের। উভয় শিক্ষাবৃত্তিতে ইন্দোনেশিয়ান ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। দার্মাশিশওয়া শিক্ষাবৃত্তি সাধারণত ইন্দোনেশিয়ান ভাষা, সংস্কৃতি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও চারুকলার ওপর দেওয়া হয়ে থাকে। কেএনবি ইন্দোনেশিয়ান সরকারের তিন বছরের শিক্ষাবৃত্তি, যা মোটামুটি প্রচলিত সব বিষয়ের ওপরই দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে চারজন এই শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে থাকে। বৃত্তির কভারেজ হিসাবে প্রতি মাসের হাতখরচ বাবদ ২০০-৩০০ ইউএস ডলার মিলবে। এ অর্থে আয়েশেই ইন্দোনেশিয়ার যেকোনো শহরের জীবন যাপন করা যায়।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার প্রায় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিজস্ব শিক্ষাবৃত্তি রয়েছে। যেখানে সুবিধা ও বৃত্তির অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী আলাদা।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

* সাধারণত স্নাতক পাস হতে হবে। জিপিএ–৩ থাকলে ভালো হয়
* সব একাডেমিক সার্টিফিকেট
* বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের রিকমেন্ডেশন
* পাসপোর্ট
* মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স
* রিসার্চ প্রপোজাল।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তির ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব চাহিদা।
প্রতিবছর সাধারণত ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে দার্মাশিশওয়া শিক্ষাবৃত্তির আবেদন ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাস, বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। কেএনবি শিক্ষাবৃত্তির আবেদন সাধারণত মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে একইভাবে দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সেমিস্টার শুরুর আগে শিক্ষাবৃত্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

default-image

স্কলারশিপ কাভারেজ

* প্রতি মাসের শিক্ষাবৃত্তির অর্থ
* সব ধরনের বই ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী (স্কলারশিপ ভেদে)
* বিমান টিকিট (স্কলারশিপ ভেদে)
* ডরমিটরি (স্কলারশিপ ভেদে)

ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আনন্দের সঙ্গে পাঠদান। এ ছাড়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ ও ইন্দোনেশিয়ান খাবার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার একটা বিশাল সুযোগ আছে এ দেশে। সাগর পাহাড়বেষ্টিত এ দেশে বিদেশিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশংশনীয়। এখানে জীবনযাপনের খরচ বাংলাদেশের মতোই। ইন্দোনেশিয়ার মানুষ সাধারণত অতিথিপরায়ণ। তাই রাস্তা ভুলে গেলে সহজেই জাভার মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যায়। জাভানিজ সংস্কৃতি, বালি নাচ অথবা চাইলেই হারিয়ে যাওয়া যায় জাভার প্রকৃতির মাঝে। আর মানুষের সাদামাটা জীবনযাপন দেখে অনুপ্রাণিত হওয়ার অনেক কিছুই আছে সাড়ে ১৭ হাজার দ্বীপের দেশ ইন্দোনেশিয়ায়।

বিজ্ঞাপন
বৃত্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন