করোনাভাইরাস
করোনাভাইরাসছবি: রয়টার্স

আমরা লক্ষ করি, এখন দেশে অনেক বেশি মানুষ অফিস–আদালতে যাচ্ছেন, বাজার–সওদা করছেন, স্বাস্থ্যবিধি সবাই মানছেনও না। বাসে ভিড়ও কম নয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবাই যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নয়। কেউ কেউ সহজে আক্রান্ত হন না।

এই ঘটনা থেকে যেন আমরা মনে না করি যে সবাই যেহেতু আক্রান্ত হচ্ছেন না, তাহলে খুব বেশি সতর্কতার কী দরকার। এ রকম ভাবলে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। বরং ভেবে দেখতে হবে, কেন কারও কারও করোনা হয় না। এটা ঠিক, যিনি একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন, তিনি বেশ কিছুদিন নিরাপদ। কিন্তু এ রকম কজন আছেন? খুব বেশি তো নয়। আবার এটাও ঠিক যে অনেকের দেহে আগে থেকেই টি-সেল রয়েছে বা কারও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তাঁদের করোনায় ধরলেও উপসর্গ কম থাকে। সামান্য জ্বর-কাশির পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ব্যাপক সাধারণ মানুষের সংক্রমণের ভয় থাকবেই।

বিজ্ঞাপন

তাহলে কেন সবাই প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন না? এর কারণ হলো, যাঁরা বলতে গেলে অসময়ে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বেশি সময় ধরে অবস্থান করেন, তাঁদের সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি, অন্যদের কম। যেমন আপনি বাজারে গেছেন। সেখানে জনসমাগম বেশি। অনেকের মুখেই মাস্ক নেই। বেশ কিছুক্ষণ ধরে কেনাকাটা করছেন। আপনিও মাস্ক পরেননি। তাহলে আপনার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।

এটা ঠিক যে দেশে মোট সংক্রমণের তুলনায় মোট মৃত্যুহার এখন ১ দশমিক ৩২ শতাংশ, যেখানে সারা বিশ্বের হিসাব অনুযায়ী মোট সংক্রমণের তুলনায় মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ (১৪ আগস্ট ২০২০ তারিখের হিসাব)। এটা ঠিক যে আমাদের মৃত্যুহার বিশ্বের তুলনায় এখনো কম। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমাদের ঝুঁকি কম।

এ বিষয় নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগ আক্রান্ত ব্যক্তি ভাইরাসটি ছড়াতে পারেন না। হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সরাসরি সংক্রমণের ভয় কমে যায়। কিন্তু কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি যখন ভুল জায়গায়, ভুল সময়ে উপস্থিত হয়ে পড়েন, তখনই রোগটি ছড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই ভুল ‘সময়’ আর ভুল ‘জায়গা’ সম্পর্কে ওপরের অনুচ্ছেদেই বলেছি। তাহলে যাঁদের করোনার সামান্যতম লক্ষণ রয়েছে, তাঁদের কর্তব্য হবে এসব ভুল জায়গা ও ভুল সময় এড়িয়ে চলা। আর অন্যদেরও ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলে সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব। অবশ্য তারপরও সংক্রমণের কিছু আশঙ্কা থেকেই যাবে। কারণ, করোনায় আক্রান্ত উপসর্গবিহীন ব্যক্তিও আছেন। তাঁদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

এসব বিষয়ে গত ৭ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বিস্তৃত লেখা ছাপা হয়েছে। সেখানে গবেষক দলের অন্যতম প্রধান ড. জোশুয়া শিফার এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি একজন ডাক্তার ও গাণিতিক মডেলিং বিশেষজ্ঞ এবং সিয়াটলে ফ্রেড হাচিনসন ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারে সংক্রমণ ব্যাধি নিয়ে গবেষণা করেন।

সুপ্রশস্ত খোলা জায়গা বনাম কাচঘেরা কক্ষ

প্রচুর আলো-বাতাস আছে—এমন খোলামেলা জায়গায় ভাইরাস সংক্রমণের ভয় কম। তবে খোলামেলা জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বিপরীতে দরজা-জানালা বন্ধ, কাচে ঘেরা অফিস বা সুপারশপগুলোয় বরং ভাইরাস সহজে ছড়াতে পারে। বিষয়টি ১০০ বছর আগে নিউমোনিয়া মহামারির সময়েও দেখা গেছে। সেই সময় স্পেনে অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীদের বন্ধ ঘরে ক্লাস না নিয়ে বরং খোলা প্রশস্ত চত্বরে ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিষয়টি আমাদেরও ভেবে দেখতে হবে। আধুনিক যুগের স্থাপত্য অনুসরণ করে দেশের বড় বড় শহরে অফিস ও সুপারশপগুলো কাচে ঘেরা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এসি ব্যবস্থায় চলে। প্রতি ফ্লোরে শত শত মানুষ কাজ করেন। তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ ঘরে ঘুরে বেড়ায়। এখানে একজন কর্মীর ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই নতুনভাবে চিন্তা করা দরকার। প্রচণ্ড গরমে এসি ছাড়া চলে না, এটাও ঠিক। তাই দিনে কয়েকবার অন্তত আধা ঘণ্টা করে ঘরের ভেতরের বাতাস বের করে বাইরের বাতাস সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে ভালো। তাহলে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমতে পারে।

যদি মাস্ক ছাড়া দুজন ব্যক্তি সামনাসামনি কথাবার্তা বলেন, হাঁচি-কাশি দেন, তাহলে সংক্রমণের আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ। আর যদি দুজনের মুখেই মাস্ক থাকে এবং মোটামুটি ছয় ফুট দূরে থেকে চলি, তাহলে সংক্রমণের হার প্রায় শূন্য।

মাস্কের মাহাত্ম্য

কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত মোট সংক্রমণের তুলনায় মৃত্যুহার প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে। যদিও দৈনিক নমুনা পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণের হার ২০ থেকে ২৪ শতাংশ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২০ থেকে ৪০-এর কোঠায় ওঠানামা করছে। আবার ঈদের পর শেষ ধাক্কার যে আশঙ্কা, তার জের কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাও দেখার বিষয়। তবে এটা ঠিক যে দেশে মোট সংক্রমণের তুলনায় মোট মৃত্যুহার এখন ১ দশমিক ৩২ শতাংশ, যেখানে সারা বিশ্বের হিসাব অনুযায়ী মোট সংক্রমণের তুলনায় মৃত্যুহার ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ (১৪ আগস্ট ২০২০ তারিখের হিসাব)। এটা ঠিক যে আমাদের মৃত্যুহার বিশ্বের তুলনায় এখনো কম। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমাদের ঝুঁকি কম; বরং এই কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে মৃত্যুহার আরও কম ছিল। এখন বেড়েছে। তাই সতর্ক হওয়ার এখনই সময়।

কিন্তু আমরা দেখছি, দেশের মানুষ অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না। যেন ধরেই নিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। অথচ তিক্ত বাস্তবতা হলো, ঝুঁকি কমেনি, বরং বেড়েছে। আমরা যদি এটা বুঝে চলতে না পারি, তাহলে ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তখন সমস্ত দেশবাসী চরম সংকটে পড়বে।

default-image

সরকার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করলেও খুব কম মানুষই তা মেনে চলে। একধরনের উদাসীনতা বা সচেতনতার অভাব। কিন্তু এটা শুধু নিজের নয়, আরও দশজনের জন্য বিপদ ডেকে আনে। মাস্কের ব্যবহার সম্পর্কে আমরা অনেকেই উদাসীন। কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, যদি মাস্ক ছাড়া দুজন ব্যক্তি সামনাসামনি কথাবার্তা বলেন, হাঁচি-কাশি দেন, তাহলে সংক্রমণের আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ। আর যদি দুজনের মুখেই মাস্ক থাকে এবং মোটামুটি ছয় ফুট দূরে থেকে চলি, তাহলে সংক্রমণের হার প্রায় শূন্য! এই একটা ফর্মুলা মনে রাখলেই আমরা, আমাদের দেশ ও অর্থনীতি ভালো থাকবে।

আব্দুল কাইয়ুম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

[email protected]

বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন