default-image

দিন কয়েক হলো হলিউড তারকা টম ক্রুজকে দেখা যাচ্ছে টিকটকে। কখনো গলফ খেলছেন, কখনো পয়সা দিয়ে জাদু দেখাচ্ছেন, কখনোবা কৌতুক বলে হাসানোর চেষ্টা করছেন। আবার নিজের চিরচেনা রূপে কখনো নিজেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছেন। প্রথম দেখায় সব স্বাভাবিক মনে হলেও তিনি আসল টম ক্রুজ নন। অভিজ্ঞ চোখ ছাড়া তা বোঝা বেশ কঠিন।

বোঝার অবশ্য বেশ কিছু উপায় আছে। প্রথমত টিকটকে @deeptomcruise অ্যাকাউন্টটি ভেরিফায়েড নয়। তা ছাড়া টম ক্রুজের বয়স এখন ৫৮। ভিডিওগুলোতে তাঁকে বেশ তরুণ দেখাচ্ছে, কিছুটা লম্বাও। আসল টম ক্রুজের উচ্চতা সাড়ে ৫ ফুট। কণ্ঠেও খানিকটা পরিবর্তন আছে, তবে খুব মনোযোগ দিয়ে না শুনলে সেটা বোঝা মুশকিল। তবু টিকটকের টম ক্রুজকে অনেককেই আসল টম ক্রুজ ভেবে নিয়েছেন। এরই মধ্যে টিকটকে তিন লাখ অনুসারী হয়ে গেছে।

যেভাবে তৈরি হলো নকল টম ক্রুজ

টিকটকের @deeptomcruise অ্যাকাউন্টে যে টম ক্রুজের দেখা মিলছে, সেটি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তৈরি। বানানো হয়েছে ‘ডিপফেক’ নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ডিপ লার্নিং’ প্রযুক্তি এবং ‘ফেক’ শব্দ দুটি এক করে বলা হয় ডিপফেক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের বর্ণনায় ডিপফেক হলো, ‘বিশেষ ধরনের কৃত্রিম মিডিয়া, যেখানে ছবি বা ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে অন্য কোনো ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়।’

কেন ভয়ংকর

অর্থাৎ, চাইলে ভিডিওতে একজনের মুখ থেকে অন্যজনের কথা বলিয়ে নেওয়া যায়। এখন নকল টম ক্রুজ যেভাবে টিকটকে দুম করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন, তাতে তার মুখ থেকে যদি বিরূপ কোনো কথা বলিয়ে নেওয়া হয়, তবে অনেকেই তা একবাক্যে বিশ্বাস করবেন। আরও বেশি আশঙ্কার কথা হলো, ডিপফেকের সাহায্যে আরও ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে যদি কিছু বলিয়ে নেওয়া হয়, তবে কে জানে, যুদ্ধও লেগে যেতে পারে। এর আগে আমরা দেখেছি, বারাক ওবামা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছেন ‘কমপ্লিট ডিপশিট’।

ডিপফেক কেন

ভিডিওতে ডিপফেক প্রযুক্তি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে। ডিপট্রেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিয়ে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে অনলাইনে তারা ১৫ হাজার ডিপফেক ভিডিও খুঁজে পায়। ওই ভিডিওগুলোর ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভিডিওতে কোনো নারী চলচ্চিত্র তারকার চেহারা যোগ করা হয়েছে। রিপ্রেজেন্ট আস নামের এক মার্কিন সংগঠন গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উনকে নিয়ে ডিপফেক প্রযুক্তির ভিডিও বানায়। সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল জনসচেতনতা। সেখানে দেখানো হয়, ডিপফেক কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

কীভাবে তৈরি হয় ডিপফেক

এমআইটি স্লোনে ডিপফেক তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে: ডিপফেক ভিডিও তৈরির জন্য নির্মাতা এক মানুষের চেহারা বদলে আরেকজনের চেহারা যোগ করে দেন। এ জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন অ্যালগোরিদম এবং ‘ভ্যারিয়েশনাল অটো-এনকোডার (ভিএই)’ নামের ডিপ লার্নিং কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়।

আপনি যদি যেকোনো ভিডিও বদলে ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে অস্কারজয়ী তারকা নিকোলাস কেজের চেহারা যুক্ত করতে চান, তবে আপনার দুটি অটো এনকোডার লাগবে। একটি এনকোডার নিকোলাস কেজের চেহারা থেকে প্রশিক্ষণ নেবে। আরেকটি এনকোডার যত বেশি সম্ভব তত ধরনের চেহারা থেকে প্রশিক্ষণ নেবে।

দুটি ক্ষেত্রেই যে ছবিগুলো প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে, সেগুলো নির্বাচনে ফেসিয়াল রিকগনিশন অ্যালগোরিদম ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে দুটি এনকোডারের ডেটা এক করে ফেলতে হয়। এতে নিকোলাস কেজের চেহারা অন্য কারও চেহারার ওপর বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

কেবল ভিডিও?

না, ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে কাল্পনিক ছবিও তৈরি করা যায়। লিংকডইনে এবং টুইটারে এমন বেশ কিছু প্রোফাইল আছে, যেখানে নিয়মিত ছবি পোস্ট করা হলেও সেগুলো ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ডিপফেকের সাহায্যে বিখ্যাতদের কণ্ঠও নকল করা যায়।

default-image

ডিপফেক ভিডিও বুঝবেন যেভাবে

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ডিপফেক শনাক্ত তত কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে মার্কিন গবেষকেরা দেখলেন, ডিপফেক ভিডিওতে সাধারণত মানুষের চোখের পলক পড়ে না। কারণ, পরিষ্কার। ডিপফেক ভিডিও তৈরিতে যে ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলোতে সচরাচর মানুষের চোখ খোলাই থাকে। এতে চোখের পলক পড়ার ব্যাপারটিই অ্যালগোরিদম শেখে না। তবে সে গবেষণাপত্র প্রকাশ হতে না হতেই ডিপফেক ভিডিওগুলোতে মানুষের চোখের পলক পড়া শুরু হয়। সেটাই সমস্যা। দুর্বলতা বের হওয়া মাত্র সেটা সংশোধনের প্রযুক্তিও বের হয়ে যাচ্ছে।

নিম্নমানের ডিপফেক শনাক্ত করা সহজ। হয়তো কথার সঙ্গে ঠোঁট মেলানোয় গরমিল থাকে কিংবা ত্বক অস্বাভাবিক মনে হয়। আবার আলোতেও ঝামেলা মনে হয়। অর্থাৎ, নিখুঁত হয় না। দক্ষ হাতে ডিপফেক ভিডিও তৈরি করলে শনাক্ত বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। অবশ্য ডিপফেক শনাক্তে গবেষণার জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সরবরাহ করে থাকে। তা ছাড়া মাইক্রোসফট, ফেসবুক এবং আমাজনের আয়োজনে ডিপফেক শনাক্তে প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নরটনের ওয়েবসাইট ডিপফেক শনাক্তের বেশ কিছু লক্ষণের উল্লেখ পাওয়া যায়। চোখের নাড়াচাড়া, মুখাবয়বের অভিব্যক্তি কিংবা চেহারার বিন্যাসে অস্বাভাবিকতা, চেহারা ভাবলেশহীন কিংবা চুল বা দাঁত দেখতে নকল মনে হওয়া তেমন লক্ষণের মধ্যে পড়ে। আবার গুগলের ইমেজ সার্চে ছবি খোঁজার কথাও বলা হয়। এতে হয়তো মূল ছবি বের হয়ে আসবে।

ডিপফেক রোধে সমাধান কী?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সম্ভাব্য সমাধান। অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো। অনলাইনে ভুয়া ভিডিও শনাক্তে এরই মধ্যে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো কেবল তারকাদের বেলায় ভালো কাজ করে। কারণ, তাঁদের পর্যাপ্ত ছবি ও ভিডিও অনলাইনে পাওয়া যায়।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। অনলাইনে ভুয়া ভিডিও শনাক্ত হওয়ামাত্র সেগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। আবার মূল ছবি বা ভিডিওর স্থায়ী খতিয়ান নিরাপদ কোনো ডেটাবেসে লিপিবদ্ধ করে রাখাও সম্ভাব্য সমাধান বলে মনে করেন অনেকে।

ডিপফেক কি সব সময় ক্ষতিকর?

না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। আবার বিনোদনের জন্যও এমন ভিডিও বানানো হয়। রোগের কারণে মানুষ কণ্ঠ হারিয়ে ফেললে কণ্ঠ নকল করার ডিপফেকের সাহায্যে তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

জাদুঘরে ডিপফেক প্রযুক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দালি মিউজিয়ামে প্রয়াত শিল্পী সালভাদর দালি নিজেই তাঁর শিল্পকর্ম সম্পর্কে দর্শনার্থীদের বর্ণনা করেন, সেলফিও তোলেন। চলচ্চিত্রে প্রয়াত অভিনেতাকেও জীবন্ত দেখানো সম্ভব। যেমন নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘ফাইন্ডিং জ্যাক’-এ প্রয়াত মার্কিন অভিনেতা জেমস ডিনকে দেখা যাওয়ার কথা আছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিজনেস ইনসাইডার, সিএনবিসি

প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন