সেমিকন্ডাক্টর সংকটে ভুগছে বিশ্ব। দিন দিন সে সংকট এমনই গুরুতর পর্যায়ে এগোচ্ছে যে হস্তক্ষেপ করেছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
default-image

সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা কেমন, সরবরাহ কোন পর্যায়ের, উৎপাদনে কেমন প্রযুক্তি দরকার—এসব পর্যালোচনা করে দেখতে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন জো বাইডেন। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টরের সরবরাহ নিশ্চিতের তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার তহবিলের অনুমোদন দিয়েছেন তিনি।

মাইক্রোচিপের মূল উপাদান হলো সেমিকন্ডাক্টর। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, কম্পিউটার ও স্মার্টফোন থেকে শুরু করে আধুনিক যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে সেমিকন্ডাক্টর কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গাড়ি উৎপাদনশিল্পে। আধুনিক গাড়িগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ এই সেমিকন্ডাক্টর। সেমিকন্ডাক্টরের অভাবে উৎপাদনে ২০ শতাংশ ঘাটতির অনুমান করছে ফোর্ড। আর মডেল–৩ গাড়ির উৎপাদন দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রেখেছে টেসলা। যুক্তরাজ্যেও কারখানা সাময়িক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে হোন্ডা।

default-image

এমনকি এনভিডিয়া ও মাইক্রোসফটের মতো ঘাগু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও গ্রাফিকস কার্ড ও গেম খেলার যন্ত্র এক্সবক্সের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। পরিস্থিতি যা, তাতে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠান বড় হোক কিংবা ছোট, প্রযুক্তিনির্ভর হোক কিংবা না হোক, সেমিকন্ডাক্টর-খরা থেকে রেহাই পায়নি।

সমস্যাটা কোথায়

এমন পরিস্থিতির জন্য করোনাকালকে চাইলে দায়ী করা যায়। তবে সত্য হলো, এটা এক দিনের (কিংবা বছরের) ব্যাপার নয়। এমনটা যে হবে, তা একরকম অনুমিতই ছিল। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত সেমিকন্ডাক্টরের ৭০ শতাংশ কেবল দুটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে। এর একটি তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর (টিএসএমসি), অন্যটি দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং।

সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনশিল্পে প্রবেশে বাধা কম উঁচু নয়। কারখানা স্থাপনের আগে এ ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান থাকতে হয়। সে জ্ঞান আহরণও একদম সহজ নয়। শুরুতেই ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ফাঁড়া রয়েছে। এরপর অন্তত তিন বছর লেগে যায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে।

default-image

সেখানেও বাধা আছে। তিন বছর পর সদ্য স্থাপিত কারখানায় উৎপাদিত চিপ নতুন চাহিদার সঙ্গে মিলবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, চিপ দ্রুত পুরোনো হয়ে যায়। তা ছাড়া প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ করতে গিয়ে লাভের মুখ দেখার অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

এমন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে গুটিকয় বড় প্রতিষ্ঠান যে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনশিল্পে টিকে থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। এরপর সেই খরচ ও ঝুঁকি শত শত গ্রাহকের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হচ্ছে। হয়তো সে কারণেই টিএসএমসি এবং স্যামসাংয়ের মাথায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মুকুট পরিয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল সবাই। এতে খারাপের দিকটাও তো ছিল: সরবরাহব্যবস্থা অনেকটা তাসের ঘরে পরিণত হয়েছে। সে ঘরের ভারসাম্য এই ভেঙে পড়ল বলে।

বিজ্ঞাপন

চাহিদা আকাশসম

করোনাকালে অনেকে ঘরে থেকে কাজ করা শুরু করে। আপাত গৃহবন্দী জীবনে বিনোদনের চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলাফল, ল্যাপটপ ও গেমিং কনসোলের মতো ঘরে ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা অনুমানের চেয়ে বেশি ছিল।

অন্যদিকে গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো ভেবেছিল, এ সময়ে গাড়ির চাহিদায় নিম্নগতি দেখা যাবে। কারণ, অর্থনৈতিক মন্দার সময় স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির বিক্রি কমে যায়। তবে অনুমানে ভুল ছিল। ২০২০ সালের শেষভাগে গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেমিকন্ডাক্টরের যে ফরমাশগুলো বাতিল করে দিয়েছিল, সেগুলো আবার বুক করার চেষ্টা করে। তবে দেখা গেল, হোম ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে।

default-image

এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে চীনের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ। সে যুদ্ধের ফলে করা নতুন নিয়মের প্রভাবে টিএসএমসি এবং স্যামসাংয়ের কাছ থেকে সেমিকন্ডাক্টর সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। তা ছাড়া চীনের নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি তুলনামূলক খারাপ। এতে হুয়াওয়ের মতো চীনা টেক জায়ান্টরা নতুন নিয়ম জারির আগেই সেমিকন্ডাক্টর মজুত করতে শুরু করে। যা-ও একটু সুযোগ ছিল, সেটুকুও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেয়।

২০২১ সালের শুরুতে বিটকয়েনের বিনিময়মূল্যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল মুদ্রা মাইনিংয়ে সচরাচর গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) ব্যবহার করা হয়। এতে জিপিইউয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। সেমিকন্ডাক্টর সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে সেটাও একটা বড় কারণ।

সবকিছু মিলিয়ে টিএসএমসি এবং স্যামসাং চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়, ফরমাশ মেটাতে সময় বেশি নেওয়া শুরু করে। আর তা থেকেই আজকের সেমিকন্ডাক্টর-খরার শুরু।

default-image

কার হার, কার জিত

গত ১২ মাসে টিএসএমসি এবং স্যামসাংয়ের শেয়ারমূল্য যথাক্রমে ১৯০ ও ৬১ শতাংশ বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের হস্তক্ষেপের পরও আগামী তিন বছরে সংকটাবস্থার খুব একটা উন্নতি হবে বলে মনে হচ্ছে না।

কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাবে। এর একটি কারণ, কালোবাজারিরা নির্দিষ্ট মূল্যে পণ্য কিনে ই-বের মতো ওয়েবসাইটে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করা শুরু করবে।

আর প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতার সুযোগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। শিগগিরই হয়তো বিদ্যমান ইলেকট্রনিক পণ্যের দামি সংস্করণ বাজারে ছাড়া শুরু করবে।

সত্যিকার দুর্ভিক্ষে যা হয়, এই পণ্যগুলোর ভোক্তারা পড়বে বিপাকে। সহসা সে পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার মতো সাহায্যও হাতের নাগালে হয়তো মিলবে না।

সূত্র: ফাস্ট কোম্পানি

প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন