default-image

করোনাকাল পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশ। তরুণেরা যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন উদ্যোগে। এর অধিকাংশই অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ। দেশে দ্রুতগতির ফোর-জি ইন্টারনেট সুবিধা স্টার্টআপগুলোকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। করোনাকাল তাঁদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। প্রচলিত চাকরির পরিবর্তে নিজের উদ্যোগে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করেছেন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা।

দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ চালু রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ১৩৫ স্টার্টআপকে তহবিল দেওয়া হয়েছে। সরকারের স্টুডেন্ট টু স্টার্টআপ কর্মসূচিসহ আইডিয়া প্রকল্পের আওতায় গত ছয় মাসে প্রায় সাত হাজার স্টার্টআপ দাঁড়িয়েছে।

এ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাকালে নতুন এসব স্টার্টআপ নতুন পথ দেখাচ্ছে। ফেসবুকভিত্তিক নানা ই-কমার্স ও সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো করছে। বিশেষ করে লাইফস্টাইল-ভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক মাসে জনপ্রিয় হয়েছে বেশি। অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা জিনিস। চালু হয়েছে বিভিন্ন অনলাইন প্রশিক্ষণ। সেখানে বর্তমানে কাজে লাগছে জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিমস, স্কাইপে, হ্যাংআউটস ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডিজিটাল মার্কেটিং, ভাষা শিক্ষার মতো বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে অনলাইনে।

ফেসবুকে ‘লাবণ্য’ নামে পেজ তৈরি করে ব্যবসা করছেন তাহমিনা তনু। ২০১৩ সাল থেকে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। তখন শুধু মেয়েদের পারলার ছিল তাঁর। তিনি হাতের কাজও জানতেন। এরপর মেয়েদের পোশাক তৈরি করা শুরু করেন। এর পাশাপাশি আরও নতুন কয়েকটি উদ্যোগ চালু করেন। কিন্তু এত দিন সবকিছুই করছিলেন অফলাইনে। অনলাইন উপস্থিতি থাকলেও তা খুব বেশি সক্রিয় ছিল না। গত মার্চ মাসে লকডাউন শুরু হলে তাঁর ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তখন তিনি অনলাইনে ব্যবসায় জোর দেন। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পোশাক বিক্রি শুরু করেন। মাত্র দুই মাসেই তাঁর বিক্রি পাঁচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

তনু জানান, তিনি বিনা মূল্যে অনেককে কাজ শিখিয়েছেন। প্রায় ৫০ জন কর্মী নিয়ে তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যবসা সচল রেখেছে ইন্টারনেট। মানুষ দ্রুতগতির ‘ফোর-জি ইন্টারনেট’ সুবিধা পাওয়ায় অনলাইনে কেনাকাটা বাড়িয়েছেন। ব্যবসাও এখন ইন্টারনেটনির্ভর হয়ে গেছে। তনু আরও বলেন, ‘আরও আগে অনলাইনে আসলে আরও ভালো করতে পারতাম। ভবিষ্যতে ব্যবসা আরও বাড়ানোর চিন্তা করছি। নিজেকে একজন গর্বিত অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’

বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে পরিচিত মুখ সেলাই ব্র্যান্ডের রুবাবা আকতার। করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে তাঁর আউটলেটে সরাসরি বিক্রি কমে এসেছে, তখন বেড়ে গেছে অনলাইনে বিক্রি। তিনি বলেন, আগে থেকেই ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতেন।

করোনাকালে কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষ অনলাইনে আস্থা রেখেছেন। অনলাইনে করোনাকালে তাঁর ‘ব্র্যান্ড’ ভালো বিক্রি করেছে। শোরুম বন্ধ হলেও ফোর-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানুষ ফেসবুক লাইভে পণ্য কিনছেন। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবার কারণেই এগিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি। যাঁরা ফেসবুকে বা অনলাইনে নেই, তাঁদের অবস্থা খুবই খারাপ।

রুবাবা প্রথম আলোকে বলেন, অনলাইনে যাঁরা আসতে পেরেছেন, তাঁরা ভালো করেছেন। আমি নিজেই দেখেছি। অনলাইনের থাকায় পণ্য বিক্রি কমেনি। অফলাইনের ব্যবসা পুষিয়ে দিয়েছে। এটা ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। আগে অফলাইনে যেসব কষ্ট করেছি, তা এখন লাগছে না। মানুষ দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। যে ব্যবসা প্রসারে ১২ বছর লেগেছে, তা ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন এক বছরে করা গেছে। মানুষ এখন ঘরের জিনিস, খাবার ও কাপড়চোপড় কিনছে। মানুষের মধ্যে অনলাইনে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। এখন যাঁরা নতুন শুরু করে অনলাইন ব্যবসা করতে চান, তাঁদের উচিত ব্যবসায় জোর দেওয়া। এখনই সঠিক সময়।

বিজ্ঞাপন
default-image

গত কয়েক মাসে স্টার্টআপ হিসেবে ভালো করেছে ক্লাউড ও এআইভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারস। এ ওয়েবসাইট থেকে সার্বক্ষণিক ই-লার্নিং, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আইনি সেবা পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা। এর উদ্যোক্তা রেয়ার আল সামির বলেন, ‘করোনাকালে ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারসের ই-লার্নিং, টেলিমেডিসিন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন অনেক মানুষ। এর বাইরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে অনলাইনে। ইন্টারনেট সুবিধার কারণে সহজে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পেরেছে মানুষ।’

করোনাকালে দেশীয় যেসব স্টার্টআপ ভালো করেছে, তার একটি হচ্ছে এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘শপআপ’। দেশে অসংখ্য উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাঁরা শুধু ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শপআপ ছোট ব্যবসায়ীদের বা স্টার্টআপদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে। এর উদ্যোক্তারা জানালেন, গত কয়েক মাসে তাঁদের ব্যবসা বেড়েছে। অনেক নতুন নতুন উদ্যোগ সামনে এসেছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে কাজ করেছে শপআপ।

করোনাকালে টেলিমেডিসিন সেবা নিয়ে হাজির হয়েছে মাইসফটের মাইহেলথ বিডি। এর উদ্যোক্তা মঞ্জুরুল হক বলেন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবার কারণে টেলিমেডিসিন সেবার ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি দেখার পরিবর্তে অনেকেই টেলিমেডিসিন সেবা নিচ্ছেন।

দেশে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে গ্রামীণফোনের ফোর-জি সেবা। দ্রুতগতির ফোর-জি ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে অনেক উদ্যোক্তা নতুন কিছু করার কথা ভাবছেন। তাঁদের এসব উদ্যোগ ই-কমার্স, এফ-কমার্সসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

দেশের স্টার্টআপ সেবাগুলোর জন্য ইকোসিস্টেম তৈরিতে কাজ করছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইক্যুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ভিসিপিয়াব)। সংগঠনটি বলছে, করোনাকালে স্টার্টআপ ব্যবসাগুলোকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে পারলে সাত লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে। ভিসিপিয়াব চেয়ারম্যান

শামীম আহসানের ভাষ্য, ‘কোভিড-১৯-এর ফলে আমাদের প্রযুক্তি গ্রহণের দিকে নজর দিতে হচ্ছে, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করছে। সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এসব স্টার্টআপকে সহায়তার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। আমরা উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা ও ব্যবসায় সহজ করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরিতে কাজ করব।’

সরকারের আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সৈয়দ মজিবুল হক বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশেও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে। ছোট ও মাঝারি অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও চ্যালেঞ্জিং সময় কাটাচ্ছে। দেশে স্টার্টআপগুলোকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীনে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্টার্টআপসংক্রান্ত নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রেখেছি। সারা বিশ্বে যখন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক সে সময় থেকেই দেশের স্টার্টআপদের নিয়ে তথ্য ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ফুড ফর নেশন নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয় এই প্রকল্প থেকে। দেশের কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয় এই প্ল্যাটফর্ম।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে এক হাজার স্টার্টআপ তৈরি করতে সরকার অর্থ সহায়তা প্রদান করবে। আমরা বিশ্বাস করি, একজন উদ্যোক্তা সফল হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে লাখো তরুণের স্বপ্ন পূরণ হবে। সরকার চায় তরুণেরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে সফল উদ্যোক্তা হবে। তারা হোমগ্রোন সলিউশনের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0