default-image

জটিল ব্যাপার। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, করোনাভাইরাসের মিউটেশন হচ্ছে। ফলে ভাইরাসের রূপান্তর ঘটছে। তাহলে যে টিকা (ভ্যাকসিন) তৈরি করা হচ্ছে, সেই একই টিকা বা ভ্যাকসিন কি মিউটেশনের ফলে রূপান্তরিত ভাইরাস রোধ করতে পারবে?
সুখবর হলো, করোনাভাইরাসের মিউটেশন হলেও এর টিকা (ভ্যাকসিন) বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সুফল দেবে। ভ্যাকসিন শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে, তা মিউটেশনে রূপান্তরিত ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। সব ভাইরাসের ক্ষেত্রে এ রকম হয় না। যেমন, প্রতিনিয়ত নিউমোনিয়া ভাইরাসের মিউটেশন হয়। তাই প্রতিবছর নতুন ফ্লু শট নিতে হয়। আগের ভ্যাকসিনে কাজ হয় না। কিন্তু করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে সে রকম হচ্ছে না। কেন?

এ বিষয়ে বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিন (৯ অক্টোবর ২০২০) এবং নেচার ম্যাগাজিনের নিউজ ফিচারে (৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, সংশোধিত ১৬ সেপ্টেম্বর) বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন কিছু ক্ষেত্রে হয়তো স্পাইক প্রোটিনেও রূপান্তর ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে হয়তো নতুন ধরনের ভ্যাকসিন লাগবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন


মূল কথাটা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাইরাসের রিসেপ্টার–বাইনডিং ডোমেইনের স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশন হচ্ছে না। এই স্পাইক প্রোটিনই শ্বাসতন্ত্রের কোষের (সেল) রিসেপ্টার আঁকড়ে ধরে ভেতরে ঢুকে কোষের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এরপর শ্বাসতন্ত্রের কোষেরই নিজস্ব কর্মপদ্ধতি কাজে লাগিয়ে বংশবিস্তার করতে থাকে। আসল ব্যাপারটা এখানেই। কারণ, রূপান্তর সত্ত্বেও করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন অপরিবর্তিত থাকলে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে পারে। যেহেতু মিউটেশন হলেও করোনার স্পাইক প্রোটিন প্রায় অপরিবর্তিত থাকে, তাই বলা যায় করোনার ভ্যাকসিন প্রায় সব ধরনের রূপান্তরিত করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

বিজ্ঞাপন


অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলছেন কিছু ক্ষেত্রে হয়তো স্পাইক প্রোটিনেও রূপান্তর ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে হয়তো নতুন ধরনের ভ্যাকসিন লাগবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন।


মাস্ক কেন অপরিহার্য

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক—সবাই বলছেন বাসার বাইরে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এটা অপরিহার্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ মানছে না। দেখা যায়, হাটবাজারে, রাস্তাঘাটে চলাফেরায় খুব কম মানুষই মুখে মাস্ক ব্যবহার করে। ফলে সংক্রমণের হার কমতে থাকলেও হঠাৎ করে আবার বেড়েও যাচ্ছে। এই ওঠানামা বন্ধ করতে দরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এর প্রথম শর্ত হলো বাইরে চলাফেরায় সব সময় মাস্ক ব্যবহার। আর তা ছাড়া কিছুক্ষণ পরপর হাত ধোয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, শাকসবজি–ফলমূল, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রভৃতি তো আছেই। এর অনেক কিছুই বেশির ভাগ মানুষ মানে না। কারণ, এসবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেকে খুব বেশি সচেতন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাস্ক পরলে, কিছু সময় পরপর সাবান–পানিতে হাত ধুয়ে নিলে আর জনসমাগম যথাসম্ভব এড়িয়ে চললে করোনা সংক্রমণ ৯০–৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব


নিঃসন্দেহে বলা যায়, মাস্কের ব্যবহার করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় ভূমিকা পালন করে। সেটা আমরা বুঝতে পারি জাপানের উদাহরণ থেকে।
জাপানে করোনার সংক্রমণ তুলনামূলক কম, অথচ এশিয়া, ইউরোপ–আমেরিকার অনেক দেশে বেশি। কেন? একটি কারণ হতে পারে সার্সের সময় থেকে জাপানে মাস্ক ব্যবহারের প্রথা চালু হয়েছে। এরপর আর বাদ দেয়নি। ওরা জনসমাগমে খুব বেশি যায় না। দূরত্ব বজায় রেখে চলে। একটু দূর থেকে মাথা নিচু করে পরস্পরকে সম্ভাষণ জানায়। এগুলো ওদের সামাজিক প্রথার অন্তর্ভুক্ত।

সাধারণ সুতি কাপড় বা গেঞ্জির কাপড়ে দুই বা তিন পরতের তৈরি মাস্ক পরলে অনেক উপকার। মনে হতে পারে, কাপড়ের মাস্কে করোনার ড্রপলেট কীভাবে আটকাবে? ড্রপলেট তো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এটা ঠিক। কিন্তু মাস্ক না পরার প্রধান বিপদ হলো খোলা মুখে হাঁচি–কাশি দিলে ড্রপলেটগুলো তীব্র বেগে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে মাস্ক পরা অবস্থায় হাঁচি–কাশি দিলে সেটা আমাদের নাক–মুখের চারপাশে সামান্য কিছু দূরত্বের বেশি যেতে পারে না। তাই করোনা সংক্রমিত কোনো ব্যক্তির হয়তো রোগের লক্ষণ নেই (অ্যাসিম্পটোমেটিক)। তাই তিনি হয়তো ভাবছেন করোনা নেই, তাহলে মাস্কের দরকার কী? এটা ভুল ধারণা। তিনি মাস্কবিহীন অবস্থায় বাইরে অনেক মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। অথবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হয়ে থাকলে অন্য কারও হাঁচি–কাশি তাঁকে সংক্রমিত করতে পারে।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, মাস্কের ব্যবহার করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় ভূমিকা পালন করে। সেটা আমরা বুঝতে পারি জাপানের উদাহরণ থেকে।


সবাই মাস্ক পরলে সংক্রমণের সুযোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাস্ক পরলে, কিছু সময় পরপর সাবান–পানিতে হাত ধুয়ে নিলে আর জনসমাগম যথাসম্ভব এড়িয়ে চললে করোনা সংক্রমণ ৯০–৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্কুল খুলবে কি না
স্কুল এখন বন্ধ। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে এর মধ্যে সবাইকে পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের মেধার একটি পরিমাপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে এবং তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। তার মানে সবাই পাস করলেও মেধার বিচারও থাকবে। পরীক্ষা হবে না। এর ফলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা কমবে।
স্কুল খোলার মূল সমস্যা হলো, আমাদের স্কুল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরাও সন্তানদের নিয়ে স্কুলে যান এবং গেটের বাইরে বসে থাকেন। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে এবং তাঁদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার একটি আশঙ্কা থাকবে। তাই দেশে করোনা সংক্রমণ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার আগেই স্কুল খোলা ঠিক হবে কি না, তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

*আব্দুল কাইয়ুম: মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0