আট মাত্রার জাদু: ফিল্ডস মেডেলজয়ী দ্বিতীয় নারী মেরিনা ভিয়াজোভস্কা

গণিতের জগতে সর্বোচ্চ সম্মান ধরা হয় ফিল্ডস মেডেলকে। অনেকেই একে বলেন ‘গণিতের নোবেল’। এই পদকের দীর্ঘ ইতিহাসে নারীদের উপস্থিতি ছিল বিরল। ২০১৪ সালে ইরানের মরিয়ম মির্জাখানি প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তাঁর আট বছর পর, ২০২২ সালের ৫ জুলাই ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে বিশ্ব পেল দ্বিতীয় নারী ফিল্ডস মেডেলিস্ট—ইউক্রেনীয় গণিতবিদ মেরিনা ভিয়াজোভস্কা (Maryna Viazovska)।

ফলের দোকান থেকে বহুমাত্রিক জগতে—

মেরিনা ভিয়াজোভস্কার যুগান্তকারী কাজের ভিত্তি ছিল খুব পরিচিত একটি সমস্যা—গোলক সন্নিবেশ বা Sphere Packing Problem।

ফলের দোকানে কমলা কীভাবে সাজালে সবচেয়ে কম ফাঁকা থেকে সবচেয়ে বেশি কমলা ধরে? ১৬১১ সালে জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলার এক নতুন বছরের উপহার হিসেবে লেখা ছোট্ট এক প্রবন্ধে (বরফকুচির ষড়ভুজ আকৃতি নিয়ে) অনুমান করেছিলেন—পিরামিড আকারে সাজানোই সেরা, তাতে জায়গার প্রায় ৭৪ শতাংশ ভরে যায়।

দোকানদারের কাছে যা স্রেফ অভ্যাস, গণিতবিদদের কাছে তা-ই হয়ে দাঁড়াল প্রায় চার শ বছরের মাথাব্যথা! ১৯৯৮ সালে টমাস হেলস কম্পিউটারের বিপুল সাহায্য নিয়ে কেপলারের অনুমান প্রমাণ করেন। তবে প্রমাণটি এত বড় আর এত হিসাবনির্ভর ছিল যে যাচাই করতেই বছরের পর বছর লেগে যায়—পুরো প্রমাণটি কম্পিউটার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই শেষ হয় ২০১৪ সালে।

কিন্তু মেরিনা কাজ করেছেন এমন এক জগতে, যা আমরা চোখে দেখতে পাই না—৮-মাত্রিক ও ২৪-মাত্রিক স্পেসে।

একটু ভাবো তো; ১ মাত্রায় গোলক মানে রেখাংশ, ২ মাত্রায় বৃত্ত, ৩ মাত্রায় বল। ৮ মাত্রায় ‘বল’ দেখতে কেমন? আমরা কল্পনা করতে পারি না—কিন্তু গণিত দিয়ে হিসাব করতে পারি। এটাই গণিতের সবচেয়ে বড় জাদু।

E8 আর Leech: দুই অলৌকিক গঠন—

উচ্চমাত্রার গণিতে দুটি বিশেষ ল্যাটিস (Lattice) বা বিন্যাস খুব বিখ্যাত।

E8 Lattice—৮-মাত্রিক স্পেসের এক অসম্ভব সুষম গঠন, যেখানে প্রতিটি গোলক ঠিক ২৪০টি গোলককে স্পর্শ করে থাকে। (তুলনা করো: আমাদের ৩ মাত্রার জগতে একটি বল একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১২টি বলকে ছুঁতে পারে।)

Leech Lattice—২৪-মাত্রিক স্পেসের আরও জটিল ও রহস্যময় বিন্যাস, যেখানে প্রতিটি গোলক স্পর্শ করে ১,৯৬,৫৬০টি গোলককে!

দীর্ঘদিন ধরে গণিতবিদদের বিশ্বাস ছিল, ৮ মাত্রায় E8 আর ২৪ মাত্রায় Leech-ই সেরা সমাধান। ২০০৩ সালে হেনরি কোহন ও নোয়াম এলকিস এমন এক পদ্ধতি বের করেন, যা দিয়ে সংখ্যা কষে দেখানো যায়—সেরা সমাধান E8-এর ঘনত্বের চেয়ে দশমিকের বহু ঘর পর্যন্ত বেশি হতে পারে না। অর্থাৎ উত্তর প্রায় হাতের নাগালে!

কিন্তু ‘প্রায়’ আর ‘প্রমাণ’ এক জিনিস নয়। ওই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ ফাংশন বসাতে হতো, যাকে বলা হচ্ছিল ‘ম্যাজিক ফাংশন’। সেই ফাংশনটি কেউ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কম্পিউটার তার আনুমানিক চেহারা এঁকে দিতে পারছিল, কিন্তু নিখুঁত সূত্রটি অধরাই থেকে যাচ্ছিল।

২৩ পৃষ্ঠার জাদুকরি সমাধান

২০১৬ সালের ১৪ মার্চ—পাই দিবসে মাত্র ৩১ বছর বয়সী মেরিনা ভিয়াজোভস্কা গোটা গণিতবিশ্বকে চমকে দেন। তখন তিনি বার্লিনে পোস্টডক গবেষক। মাত্র ২৩ পৃষ্ঠার একটি গবেষণাপত্রে তিনি ৮-মাত্রিক স্পেসে গোলক সন্নিবেশের নিখুঁত প্রমাণ দিয়ে দেন—হেলসের প্রমাণের মতো হাজার হাজার কেস কম্পিউটারে যাচাই করার দরকারই পড়েনি।

কীভাবে? তিনি হাত বাড়ালেন সম্পূর্ণ অন্য এক শাখার দিকে—মডুলার ফর্ম (Modular Forms) আর ফুরিয়ার বিশ্লেষণের (Fourier Analysis) গভীর সম্পর্কের দিকে। বিশেষ ধরনের কোয়াজিমডুলার ফর্ম ব্যবহার করে তিনি নিজ হাতে গড়ে তোলেন সেই বহু প্রতীক্ষিত ম্যাজিক ফাংশন, আর মুহূর্তে খুলে যায় চার শ বছরের তালা।

মাত্র এক সপ্তাহ পরেই হেনরি কোহন, অভিনব কুমার, স্টিফেন মিলার ও দানিলো রাদচেঙ্কোর সঙ্গে মিলে একই পদ্ধতি খাটিয়ে তিনি ২৪-মাত্রিক স্পেসের (Leech Lattice) সমাধানও উন্মোচন করেন।

মজার তথ্য হলো, আজও গোলক সন্নিবেশ সমস্যার সমাধান জানা আছে কেবল ১, ২, ৩, ৮ ও ২৪ মাত্রায়। ৪ থেকে ৭ মাত্রায় উত্তরটা এখনো কেউ জানে না!

অবাক করা ব্যাপার হলো, ৩ মাত্রায় সেরা সাজানোয় জায়গার প্রায় ৭৪ শতাংশ ভরে। ৮ মাত্রায় সেই সংখ্যা নেমে আসে ২৫ শতাংশে, আর ২৪ মাত্রায় মাত্র ০.২ শতাংশ! মাত্রা যত বাড়ে, জগৎ তত বেশি ফাঁকা।

শুধু গোলক নয়, শক্তিও

মেরিনার গবেষণা গোলক সাজানোতেই থামেনি। পরে হেনরি কোহনসহ সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেন সর্বজনীন সর্বোত্তমত্ব বা Universal Optimality-এর ধারণা

সহজ কথায়, কণাগুলো যদি শক্ত বল না হয়ে পরস্পরকে বিকর্ষণকারী কণা হয়—যেমন ইলেকট্রন, তবু ৮ ও ২৪ মাত্রায় E8 ও Leech Lattice-ই সবচেয়ে স্থিতিশীল, সবচেয়ে কম শক্তির বিন্যাস তৈরি করে। বিকর্ষণের নিয়ম যা-ই হোক না কেন, উত্তর একই থাকে। এ কারণেই ফলাফলটিকে বলা হয় ‘সর্বজনীন’।

বিশুদ্ধ গণিতের অপ্রত্যাশিত ব্যবহার

কেউ ভাবতে পারে, ৮ মাত্রার গোলক নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? অথচ এই ল্যাটিসগুলো বহু আগে থেকেই প্রযুক্তিতে কাজে লাগছে:

কোডিং থিওরি ও এরর কারেকশন: দীর্ঘ দূরত্বে ডেটা পাঠালে সিগন্যালে গোলযোগ হয়। উচ্চমাত্রার ল্যাটিস দিয়ে সংকেত সাজালে ভুল ধরা পড়ে এবং আপনাআপনি শুধরে নেওয়া যায়। Leech Lattice এই কাজে বহু বছরের পরিচিত হাতিয়ার।

টেলিযোগাযোগ: মডেম, অপটিক্যাল ফাইবার ও স্যাটেলাইট যোগাযোগে সংকেত বিন্যাসের নকশায় একই ধারণা ব্যবহৃত হয়।

মেরিনার প্রমাণ নতুন যন্ত্র বানায়নি—কিন্তু নিশ্চিত করে দিয়েছে যে এই বিন্যাসগুলোর চেয়ে ভালো কিছু আর কখনোই পাওয়া যাবে না। প্রকৌশলীদের জন্য এ এক বিরাট স্বস্তি: আর খোঁজাখুঁজির দরকার নেই, এটাই শেষ কথা।

অনুপ্রেরণার নতুন আলো

১৯৮৪ সালে কিয়েভে জন্ম নেওয়া মেরিনা ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রেমে পড়েছিলেন। পড়াশোনা করেছেন কিয়েভের তারাস শেভচেঙ্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে, তারপর জার্মানির কাইজারস্লাউটার্ন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে তিনি সুইজারল্যান্ডের cole Polytechnique Fédérale de Lausanne—EPFL-এ সংখ্যাতত্ত্বের অধ্যাপক।

তাঁর অর্জন প্রমাণ করে—অদম্য নিষ্ঠা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আর কল্পনার গভীরতা থাকলে শত বছরের পুরোনো রহস্যও খুলে যায়। আরও বড় শিক্ষা হলো, উত্তরটা প্রায়ই লুকিয়ে থাকে একেবারে অন্য শাখায়। গোলক সাজানোর সমস্যার চাবি ছিল সংখ্যাতত্ত্বের মডুলার ফর্মে—যার সঙ্গে বাইরে থেকে দেখলে কোনো সম্পর্কই নেই!

প্রথম আলো গণিত ইশকুলের তরফ থেকে খুদে গণিতবিদদের জন্য বার্তা খুব স্পষ্ট—গণিত মানে কেবল পরীক্ষার খাতার হিসাব নয়, এটি সীমানা পেরিয়ে নতুন মাত্রায় ভাবার স্বাধীনতা। হয়তো আজকের এই খুদে পাঠকদের মধ্য থেকেই উঠে আসবে ভবিষ্যতের কোনো গণিতবিদ, যে উন্মোচন করবে ৪ কিংবা ৫ মাত্রার এখনো-না-জানা রহস্য!