প্রেডিক্টো-মেট্রিক্স: সুপারকম্পিউটার ও গণিতের জুটিতে যেভাবে নির্ধারিত হয় বিশ্বকাপের ভাগ্য!!
ফুটবলকে বলা হয় চরম অনিশ্চয়তার খেলা। মাঠের সবুজ ঘাসে ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে কখন কোনো বাঁকবদল ঘটবে, তা খালি চোখে অনুমান করা অসম্ভব। অথচ এই অনিশ্চয়তার খেলাতেই এখন রাজত্ব করছে প্রেডিক্টো–মেট্রিক্স (PredictoMetrics) অর্থাৎ গাণিতিক উপাত্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুপারকম্পিউটারের এক অভূতপূর্ব যুগলবন্দী। আধুনিক স্পোর্টস অ্যানালিটিকস বা ক্রীড়া বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তির প্রভাব এখন পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রক্ত-মাংসের মানুষের আবেগ ও পায়ের জাদু দিয়ে নিয়ন্ত্রিত একটি খেলাকে কীভাবে গাণিতিক সূত্রে বেঁধে ফেলছে একটি জড়যন্ত্র? এর পেছনে কোনো অলৌকিক জাদু নেই, রয়েছে কোটি কোটি তথ্যের নিখাদ গাণিতিক বিশ্লেষণ।
তথ্যের মহাসমুদ্র
প্রেডিক্টো–মেট্রিক্সের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ। একটি আধুনিক সুপারকম্পিউটার কোনো ম্যাচের ভবিষ্যদ্বাণী করার আগে কয়েক দশকের ফুটবল ইতিহাসের বিশাল ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে। এই ডেটা পয়েন্টগুলোকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়—
● দলগত পরিসংখ্যান: বিগত কয়েক বছরের ম্যাচের জয়-পরাজয়ের অনুপাত, ঘরের মাঠে ও বাইরের মাঠে খেলার পারফরম্যান্স এবং দলগুলোর বর্তমান ফিফা র্যাংকিং।
● ব্যক্তিগত খেলোয়াড়ের প্রোফাইল: প্রতিটি খেলোয়াড়ের গতি (Sprinting Speed), পাসিং অ্যাকুরেসি, ট্যাকল করার দক্ষতা, বল পজিশন ধরে রাখার ক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক ফর্ম।
● বাহ্যিক নিয়ামক (External Factors): ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের আবহাওয়া (তাপমাত্রা, আর্দ্রতা), সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্টেডিয়ামের উচ্চতা, খেলোয়াড়দের ভ্রমণের ক্লান্তি এবং স্টেডিয়ামের দর্শক সংখ্যা।
সুপারকম্পিউটার এই কোটি কোটি ডেটা পয়েন্টকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রসেস করে প্রতিটি দলের শক্তি ও দুর্বলতার একটি গাণিতিক মানচিত্র তৈরি করে।
পর্দার পেছনের গাণিতিক নায়ক
ফুটবল ম্যাচের ফলাফল অনুমান করতে সুপারকম্পিউটার মূলত তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত মডেলের ওপর নির্ভর করে–
পয়সন ডিস্ট্রিবিউশন (Poisson Distribution) -গোল সংখ্যার হিসাব
ফুটবলে সাধারণত ক্রিকেট বা বাস্কেটবলের মতো বিশাল রান বা স্কোর হয় না। এখানে গোল হয় খুবই কম (যেমন: ০, ১, ২ বা সর্বোচ্চ ৬-৭টি)। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা (Discrete Events) পরিমাপের জন্য ফরাসি গণিতবিদ সিমিওন ডেনিস পয়সনের আবিষ্কৃত সূত্রটি ব্যবহার করা হয়।
• P(x) হলো কোনো একটি দল ঠিক x সংখ্যক গোল (ধরি, ঠিক ২টি গোল) করার সম্ভাবনা।
•λ হলো ওই দলের গোল করার গড় ক্ষমতা। কম্পিউটার যদি হিসাব করে দেখে যে দল ‘A’ প্রতি ম্যাচে গড়ে ২টি গোল দেয়, তবে এখানে ল্যাম্বডার মান হবে ২।
• e - ইউলারের সংখ্যা (Euler's Number),একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক ধ্রুবক (মান প্রায় ২.৭১৮)।
এই সূত্রে দল ‘A’-এর মান বসিয়ে কম্পিউটার বের করে যে তাদের শূন্যটি গোল দেওয়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ, ১টি গোল দেওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ, ২টি গোল দেওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ ইত্যাদি।
এক্সপেক্টেড গোলস বা xG - শটের মান নির্ধারণ
একটি শট থেকে গোল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নির্ধারণ করতে সুপারকম্পিউটার ও ফুটবল অ্যানালিটিকস মডেলগুলো অতীতের হাজার হাজার শটের ডেটা বিশ্লেষণ করে। xG নির্ধারণে মূলত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়:
● গোলপোস্ট থেকে দূরত্ব: শটটি গোলপোস্টের যত কাছে হবে, xG-এর মান তত বাড়বে।
● শটের কোণ : গোলপোস্টের ঠিক সামনে থেকে শট নিলে xG বেশি হয়। একদম কোণাকুণি জায়গা থেকে শট নিলে xG কমে যায়।
● শটের ধরন: শটটি কি পা দিয়ে নেওয়া হয়েছে নাকি হেড করে? সাধারণত হেডের চেয়ে পা দিয়ে নেওয়া শটের xG বেশি হয়।
● অ্যাসিস্টের ধরন: শটের আগের পাসটি কেমন ছিল? থ্রু-বল, ক্রস, নাকি কর্নার কিক-তার ওপর xG নির্ভর করে।
● ডিফেন্ডার ও গোলকিপারের অবস্থান: শট নেওয়ার সময় গোলকিপার এবং ডিফেন্ডাররা গোল লাইনের কতটা সামনে বা পজিশনে আছেন, সেটিও গণনা করা হয়।
● ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি: আক্রমণভাগের খেলোয়াড় যদি গোলকিপারকে একা পান, তবে সেই শটের xG অনেক বেশি (প্রায় ০.৪০ - ০.৫০+) হয়।
xG-এর মান সবসময় ০ থেকে ১–এর মধ্যে থাকে। ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের অতীত ইতিহাসের সব শটের xG যোগ করে সুপারকম্পিউটার দেখে, কোন দলের আক্রমণভাগ কতটুকু নিখুঁতভাবে গোল করার জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
মন্ট কার্লো সিমুলেশন (Monte Carlo Simulation)-
১ লাখ বার ম্যাচ চালনা লুডু খেললে ছক্কা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা স্রেফ একবার চাল দিয়ে বোঝা যায় না। কিন্তু দানটি যদি ১ লাখ বার চালা হয়, তবে একটি নিখুঁত গড় সম্ভাবনা পাওয়া যায়। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে মন্ট কার্লো সিমুলেশন।
সুপারকম্পিউটার তার মেমোরিতে কৃত্রিম দুটি দল তৈরি করে। এরপর চোখের পলকে ১,০০,০০০ বার আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে ম্যাচটি খেলানো হয়। প্রতিবারের সিমুলেশনে ইনজুরি, অফসাইড, ফাউল, পেনাল্টি কিংবা লাল কার্ডের মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো এলোমেলোভাবে ইনপুট দেওয়া হয়। ১ লাখ ম্যাচের পর কম্পিউটার পুরো ডাটা যোগ করে দেখে। যদি দেখা যায় ৬৫,০০০ বারই দল ‘A’ জিতেছে, ২০,০০০ বার ড্র হয়েছে এবং ১৫,০০০ বার দল ‘B’ জিতেছে—তখনই টিভির পর্দায় দেখা যায়: দল ‘A’-এর জয়ের সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশ।
এল রেটিং সিস্টেম এবং লজিস্টিক রিগ্রেশন–
সুপারকম্পিউটার দলগুলোর শক্তির সামঞ্জস্য বুঝতে এল রেটিং সিস্টেম (Elo Rating System) ব্যবহার করে, যা মূলত দাবার খেলোয়াড়দের র্যাংকিং করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি প্রতিনিয়ত আপডেট হয়। যেমন একটি দুর্বল দল যদি শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দেয়, তবে দুর্বল দলের রেটিং এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
এরপর লজিস্টিক রিগ্রেশন (Logistic Regression) মডেলের মাধ্যমে এই রেটিং এবং খেলোয়াড়দের ক্লান্তি বা ইনজুরির মতো চলকগুলোকে (Variables) একটি সূত্রে ফেলা হয়:
● P হলো জয়ের প্রত্যাশিত সম্ভাবনা (Expected Probability)
● e - ইউলারের সংখ্যা
● z হলো দুই দলের রেটিংয়ের পার্থক্য (Rating Difference)
এই সমীকরণ সব জটিল উপাত্তকে প্রসেস করে ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফলকে তিনটি সহজ সংখ্যায় রূপান্তর করে: জয়ের সম্ভাবনা, ড্রয়ের সম্ভাবনা এবং পরাজয়ের সম্ভাবনা।
কেন এই প্রেডিক্টিভ মডেল ১০০ শতাংশ নিখুঁত হয় না?
প্রেডিক্টো–মেট্রিক্স বা সুপারকম্পিউটার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ফুটবলের একটি চিরন্তন সত্য হলো, একে কখনোই শতভাগ নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে ফুটবলের হিউম্যান ফ্যাক্টর-
● মানসিক চাপ ও আবেগ: টাইব্রেকারে শট নেওয়ার সময় একজন খেলোয়াড়ের ভেতরের মানসিক চাপ কোনো কম্পিউটার পরিমাপ করতে পারে না।
● রেফরির সিদ্ধান্ত: ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির যুগেও রেফরির একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বা লাল কার্ড পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
● ব্যক্তিগত জাদু: গাণিতিক মডেল হয়তো বলবে ৯০ মিনিটে গোল হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২%, কিন্তু বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা মুহূর্তের একক জাদুতে যেকোনো রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দিতে পারেন, যা কোনো গাণিতিক সূত্রে বাঁধা অসম্ভব।
প্রেডিক্টো-মেট্রিক্স বা গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী ফুটবলের ভেতরের রোমাঞ্চ বা আনন্দকে মোটেও কেড়ে নেয় না। বরং, এটি খেলা দেখার আগ্রহকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখন কোনো আন্ডারডগ বা দুর্বল দল সুপারকম্পিউটারের ১ শতাংশ জয়ের সম্ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে মাঠে জয় ছিনিয়ে নেয়, তখনই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। প্রেডিক্টো-মেট্রিক্স আমাদের দেখায় যে মাঠের ভেতরের মানবিক আবেগ এবং মাঠের বাইরের নিখাদ গণিত–এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আধুনিক ফুটবল দিন দিন আরও বৈজ্ঞানিক, আধুনিক এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।