লসাগুর অজানা কথা: লঘিষ্ঠ আসলে কত?
ক্লাসে অঙ্ক করতে গিয়ে প্রায়ই একটা জিনিস চোখে পড়ে—আমরা যেসব সংজ্ঞা মুখস্থ করি, সেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা শব্দগুলো নিয়ে কখনো ভাবি না। যেমন ধরো, ‘লসাগু’ শব্দটাই। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি ল-সা-গু মানে ‘লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক’। কিন্তু ‘লঘিষ্ঠ’ শব্দটার আসল মানে কি আমরা কখনো খতিয়ে দেখেছি?
বলো তো ৪ ও ৬–এর লসাগু কত? খুবই সহজ, ১২। আচ্ছা, কীভাবে বললে? এটা তো আরও সহজ! দুটি সংখ্যার সাধারণ গুণিতকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট সংখ্যাটিই তো সংখ্যাদ্বয়ের লসাগু। দাঁড়াও। তুমি কি নিশ্চিত? যদি নিশ্চিত হয়ে থাকো, তবে এবার দেখো—
৪–এর গুণিতকসমূহ: ০, ৪, ৮, ১২, ১৬, ২০, ২৪, …
৬–এর গুণিতকসমূহ: ০, ৬, ১২, ১৮, ২৪, ৩০, ৩৬, …
কী, কিছু ভুল লিখলাম? সে কথা বলার জায়গা নেই। কারণ,
০ = ০ ৪
০ = ০ ৬
আবার,
-৪ = -১ ৪
-৬ = -১ ৬
কিন্তু ঝামেলা যে এর মধ্যেই তৈরি হয়েছে, তা কি টের পেয়েছ? যদি না পেয়ে থাকো, তবে একবার শিরোনামটির দিকে তাকাও। এবার দেখো—৪ ও ৬–এর সাধারণ গুণিতকগুলো হলো ১২, ২৪ ইত্যাদি। এই সাধারণ গুণিতকগুলো অবশ্যই অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট কোনটি? যদি ধনাত্মক সংখ্যাগুলো নিয়ে চিন্তা করি, তবে ১২ লঘিষ্ঠ সংখ্যা। কিন্তু যদি ঋণাত্মক সংখ্যা নিয়ে চিন্তা করি, তবে -১২ অপেক্ষা -২৪ ছোট। আবার -২৪ অপেক্ষা -৩৬ ছোট।
এখানে একটু থামা যাক। কেন এমন হচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। ধরো, তুমি একটা ঋণাত্মক সংখ্যা n পেলে, যা ৪ ও ৬ উভয়েরই গুণিতক। তাহলে n-১২ ও অবশ্যই ৪ এবং ৬–এর সাধারণ গুণিতক হবে, যেহেতু ১২ নিজেই ৪ ও ৬–এর গুণিতক এবং n-১২ অবশ্যই n অপেক্ষা ছোট। অর্থাৎ তুমি যে ঋণাত্মক সাধারণ গুণিতকই বেছে নাও না কেন, তার চেয়ে ছোট আরেকটি সাধারণ গুণিতক ঠিকই পাওয়া যাবে। এভাবে সাধারণ গুণিতকগুলো ঋণাত্মক অসীমের দিকে ধাবিত হবে, আর কখনোই একটা ‘সবচেয়ে ছোট’ সংখ্যায় গিয়ে থামবে না। অর্থাৎ লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক বলে আসলে এখানে কিছুই নেই। তবে কি সত্যিকার অর্থে লসাগুর অস্তিত্ব নেই? অবশ্যই তা সম্ভব নয়। অর্থাৎ আমাদের আপাতত ঋণাত্মক সংখ্যাগুলো বাদ দিয়েই বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এবার আসা যাক ০–এর কথায়। ০ কিন্তু সব সংখ্যার গুণিতক। অর্থাৎ যেকোনো দুটি সংখ্যার সাধারণ গুণিতক অবশ্যই ০ হবে। কিন্তু তাতেও সমস্যা আছে। কারণ, ঋণাত্মক সংখ্যাগুলো বাদ দিলে শূন্য ক্ষুদ্রতম পূর্ণসংখ্যা। সেই হিসাবে শূন্য (০) যেকোনো দুটি সংখ্যার লসাগু। কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়? অবশ্যই না। তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়?
আসলে সমস্যা হলো লসাগু সম্বন্ধে আমাদের ধারণায়। প্রকৃতপক্ষে দুটি সংখ্যার লসাগু হবে সংখ্যাদ্বয়ের সাধারণ গুণিতকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট ‘ধনাত্মক’ সংখ্যাটি, যা আমরা প্রায়ই বলি না। গণিতবিদেরা যখন লসাগুর সংজ্ঞা লেখেন, তখন খুব সতর্কভাবে বলেন যে এটি হলো উভয় সংখ্যার গুণিতক এমন ক্ষুদ্রতম ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা। অর্থাৎ ‘ধনাত্মক’ শব্দটি বাদ দেওয়া চলে না। অথচ স্কুলে আমরা প্রায় সব সময় শব্দটি বাদ দিয়েই সংজ্ঞাটি মুখস্থ করি। কারণ, ধনাত্মক সংখ্যা নিয়ে কাজ করাটাই তো ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় আমাদের কাছে।
এই একই রকম একটা সতর্কতা কিন্তু গসাগু অর্থাৎ গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও লুকিয়ে আছে, যদিও সেখানে সমস্যা উল্টো দিক থেকে আসে। আবার মৌলিক সংখ্যার সংজ্ঞায়ও আমরা কখনো ঋণাত্মক মৌলিক সংখ্যার কথা ভাবি না, যদিও গাণিতিকভাবে -৭–কেও ৭–এর মতোই আচরণ করতে দেখা যায় গুণনীয়ক হিসেবে। গণিতে এ রকম ছোট ছোট ‘নীরব শর্ত’ ছড়িয়ে আছে সবখানে, যেগুলো আমরা ব্যবহার করি ঠিকই, কিন্তু নাম ধরে চিনি না।
চলো, ব্যাপারটা আরেকটু যাচাই করে নেওয়া যাক অন্য একটা উদাহরণ দিয়ে। ধরো, ৩ ও ৫–এর লসাগু বের করতে হবে। এখানেও একই গল্প ঘটবে—
৩–এর গুণিতকসমূহ: ০, ৩, ৬, ৯, ১২, ১৫, ১৮, …
৫–এর গুণিতকসমূহ: ০, ৫, ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৩০, …
সাধারণ গুণিতকগুলো হলো ০, ১৫, ৩০ ইত্যাদি। এবারও যদি আমরা ঋণাত্মক দিকে তাকাই, তাহলে -১৫, -৩০, -৪৫—এভাবে সংখ্যাগুলো ক্রমেই ছোট হতে থাকবে, কখনো থামবে না। আর ০–কে ধরলে তো সমস্যা আরও গোড়ায়। কারণ, তাহলে যেকোনো দুই সংখ্যার লসাগুই হয়ে যাবে ০, যা সংজ্ঞাগতভাবেই অর্থহীন। তাই এখানেও উত্তর একটাই থাকে: ধনাত্মক সাধারণ গুণিতকগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্রতমটি, অর্থাৎ ১৫। লক্ষ করলে দেখবে, ৪-৬ কিংবা ৩-৫, যে জোড়াই নাও না কেন, ‘ধনাত্মক’ শর্তটা বাদ দিলে পুরো সংজ্ঞাটাই ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ এটা কোনো একটা বিশেষ উদাহরণের কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং লসাগুর সংজ্ঞার একটা মৌলিক ও অপরিহার্য অংশ।
সত্যি বলতে গেলে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এত ছোটখাটো কথার তেমন গুরুত্ব না থাকলেও গণিতের এই জগৎ এতটাই সূক্ষ্ম ও নিখুঁত যে এর প্রতিটি অক্ষর জন্ম দিতে পারে নতুন ইতিহাসের, সন্ধান দিতে পারে অজানা সত্যের। একটা ছাত্র যখন ক্লাসে ‘কেন?’ জিজ্ঞেস করে, আর শিক্ষক থমকে গিয়ে ভাবতে বাধ্য হন, সেই মুহূর্তেই আসলে গণিত শেখার আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে। তাই গণিতে কখনো ক্ষুদ্রকে তুচ্ছ মনে করার ভুল করা যাবে না!
নতুন রূপে নতুন উদ্দীপনায় ফিরছে আমাদের প্রিয় গণিত ইশকুল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে আপনার সব গাণিতিক চিন্তাভাবনা, লেখা বা সৃষ্টি পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে।
email: [email protected]
facebook: https://www.facebook.com/PA.GonitIshkul
সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি