জন্মদিনের প্যারাডক্স: গণিত ভাইয়ার জাদু

মনে করো, গণিত ভাইয়া একদিন তোমাদের ক্লাসে গেল তোমাদের জাদু দেখাতে। সাধারণ কোনো জাদু নয়, গণিতের জাদু!

গণিত ভাইয়া প্রথমেই প্রশ্ন করল: ‘তোমরা আজ কতজন উপস্থিত আছ?’ সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ভাইয়া, ৬১ জন’। এ কথা শুনে গণিত ভাইয়া বলল, ‘আমি প্রায় নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, তোমাদের মধ্যে এমন অন্তত দুজন আছ, যাদের জন্মদিন একই দিনে।’

এ কথা শুনে সবার তো চোখ ছানাবড়া। এ–ও কি সম্ভব? ক্লাসের ফার্স্টবয় বলেই উঠল, ‘না ভাইয়া, তা তো সম্ভব নয়। যদি লিপ ইয়ারের (অধিবর্ষ) কথা হিসাবে না আনি, তাহলে বছরে ৩৬৫ দিন। এখানে অন্তত ৩৬৬ জন থাকলে, আপনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারতেন এ কথা। কিন্তু আমরা তো মাত্র ৬১ জন, অর্থাৎ ৬ ভাগের ১ ভাগ।’

গণিত ভাইয়া মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার যুক্তি একদম ঠিক আছে। ৩৬৬ জন না হলে আমি ১০০% নিশ্চিত হতে পারব না, এটা ঠিক। কিন্তু আমি বলেছি “প্রায় নিশ্চিত”, মানে খুব বেশি সম্ভাবনার কথা। আর সে সম্ভাবনা কত, জানো? প্রায় ৯৯.৫%! অর্থাৎ এমন ১০০০টা ক্লাসের মধ্যে ৯৯৫টাতেই কারও না কারও জন্মদিন মিলে যাবে। চলো, আজ তোমাদের দেখাই কীভাবে এ সংখ্যা বের হয়। এটাকেই বলে জন্মদিনের প্যারাডক্স (Birthday Paradox)।’

কেন একে ‘প্যারাডক্স’ বলা হয়?

গণিত ভাইয়া বোর্ডে লিখতে লিখতে বলল, ‘আসলে এটা যুক্তির দিক থেকে কোনো ভুল বা স্ববিরোধিতা নয়। একে প্যারাডক্স বলা হয়। কারণ, উত্তরটা আমাদের স্বজ্ঞা (intuition) বা সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে মেলে না। তোমরা যখন প্রশ্নটা শুনলে, তখন হয়তো ভাবলে যে কোনো একজনের ‘নির্দিষ্ট’ জন্মদিনের সঙ্গে তোমার জন্মদিন মিলবে কি না, আর সে সম্ভাবনা সত্যিই কম। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, ক্লাসের যেকোনো দুজনের মধ্যে জন্মদিন মিলবে কি না। আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য।’

গণিতটা বুঝে নেওয়া যাক

গণিত ভাইয়া বলল, ‘চলো, ধাপে ধাপে বুঝি। সরাসরি “দুজনের জন্মদিন মিলবে”–এ সম্ভাবনা বের করা কঠিন, তাই আমরা উল্টো পথে হাঁটব। প্রথমে বের করব কারও জন্মদিন না মেলার সম্ভাবনা, তারপর সেটাকে ১ থেকে বিয়োগ করব।

মনে করো, তোমাদের ক্লাসে এক–এক করে শিক্ষার্থী ঢুকছে।

∎ প্রথমজনের জন্মদিন যেকোনো দিন হতে পারে—কোনো বাধা নেই। সম্ভাবনা = ৩৬৫/৩৬৫।

∎ দ্বিতীয়জনের জন্মদিন প্রথমজনের সঙ্গে না মেলার সম্ভাবনা = ৩৬৪/৩৬৫।

∎ তৃতীয়জনের জন্মদিন আগের দুজনের সঙ্গে না মেলার সম্ভাবনা = ৩৬৩/৩৬৫।

এভাবে চলতে থাকবে... এবং ৬১তম জনের জন্মদিন আগের ৬০ জনের কারও সঙ্গে না মেলার সম্ভাবনা = ৩০৫/৩৬৫।

গণিত ভাইয়া বলল, এখন এই সব কটি সম্ভাবনাকে গুণ করলে পাই কারও জন্মদিন না মেলার সম্ভাবনা:

P (কেউ মিলবে না) ​= ​365 /365​ × ​ 364 /365​ × ​ 363/ 365​ × ⋯ × ​305/ 365 ​ ≈ 0.00​5

গণিত ভাইয়া বোর্ডের দিকে ইশারা করে বলল, ‘তাহলে, অন্তত দুজনের জন্মদিন মেলার সম্ভাবনা এ রকম দাঁড়াবে:’

P (মিলবে) ​= 1 − 0.005 = 0.995​

অর্থাৎ ৯৯.৫%।

পুরো ক্লাস তখন একেবারে চুপ। ফার্স্টবয়ও মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘তাই তো! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, এখানে তো একজনের সঙ্গে আরেকজনের তুলনা হচ্ছে না; বরং সবার সঙ্গে সবার তুলনা হচ্ছে!’

গণিত ভাইয়া হেসে বলল, ‘ঠিক ধরেছ! এখানে যেটা তোমার মাথায় রাখা দরকার, তা হলো, তুমি একজনের সঙ্গে আরেকজনের জন্মদিন মেলাচ্ছ না; বরং প্রতিটা জোড়ার (pair) সম্ভাবনা হিসাব করছ। তোমাদের ৬১ জনের মধ্যে মোট জোড়া সংখ্যা হলো এ রকম:’

গণিত ভাইয়া বলল, ‘অর্থাৎ তুমি একবারে ৬১টা তুলনা করছ না, তুমি করছ ১৮৩০টা তুলনা! প্রতিটা জোড়ার আলাদা আলাদা সুযোগ আছে জন্মদিন মেলার। আর এত বেশি সুযোগ থাকলে, অন্তত একটা জোড়া মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। এটাই মূল রহস্য—তুমি একজনকে নয়; বরং পুরো একটা নেটওয়ার্ককে তুলনা করছ।’

ক্লাসের একটা মেয়ে হাত তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাইয়া, আমরা যদি মাত্র ২০-২৫ জন থাকতাম, তাহলে কী হতো?’ গণিত ভাইয়া খুশি হয়ে বলল, ‘চমৎকার প্রশ্ন! চলো, একটা টেবিলে দেখি সংখ্যাটা কীভাবে বাড়ে।’

‘দেখলে,’ গণিত ভাইয়া বলল, ‘মাত্র ২৩ জন হলেই সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, আর ৭০ জন হলে সেটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়! তাই পরেরবার কোনো বড় অনুষ্ঠানে গেলে, আশপাশের মানুষের জন্মদিন জিজ্ঞাসা করে দেখো, চমকে যাবে।’

ফার্স্টবয় তখনো ভাবছিল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাইয়া, এই হিসাব কি শুধু ক্লাসরুমের মজার জন্যই, নাকি এর কোনো আসল ব্যবহারও আছে?’

গণিত ভাইয়া বলল, ‘খুব ভালো প্রশ্ন। জন্মদিনের প্যারাডক্স শুধু একটা মজার হিসাব নয়, এর পেছনের নীতিটা কম্পিউটার সায়েন্স আর সাইবার সিকিউরিটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন “হ্যাশ কলিশন (hash collision)” নামের একটা সমস্যা আছে, যেখানে দুটি ভিন্ন উপাত্ত থেকে একই হ্যাশ কোড তৈরি হয়ে যেতে পারে। এ সম্ভাবনা হিসাব করতেও ঠিক এই একই নীতি ব্যবহার করা হয়। তাই এই প্যারাডক্স শুধু ক্লাসরুমের মজার প্রশ্ন নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও বটে।’

ক্লাস শেষে গণিত ভাইয়া বোর্ড মুছতে মুছতে বলল, ‘তোমরা এবার বুঝতে পারছ, কেন আমাদের সজ্ঞা মাঝেমধ্যে গণিতের সঙ্গে মেলে না! জন্মদিনের প্যারাডক্স আমাদের শেখায়, সম্ভাবনার জগতে “মনে হওয়া” আর “সত্যি হওয়া” এক জিনিস নয়। তাই পরেরবার যখন কেউ তোমাকে অদ্ভুত কোনো সম্ভাবনার কথা বলবে, একটু থেমে অঙ্ক কষে দেখো, উত্তরটা হয়তো তোমাকে অবাক করে দেবে!’

∎    নতুন রূপে নতুন উদ্দীপনায় ফিরছে আমাদের প্রিয় গণিত ইশকুল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে আপনার সব গাণিতিক চিন্তাভাবনা, লেখা বা সৃষ্টি পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে।

       email: [email protected]

       facebook: Gonit Ishkul-গণিত ইশকুল

সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি