ইনফিনিটির রহস্যভেদ: পল কোহেন এবং গণিতের ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী প্রমাণ
১৮৭৪ সালে জার্মান গণিতবিদ জর্জ ক্যান্টর যখন প্রমাণ করলেন সব ‘অনন্ত’ বা ইনফিনিটি সমান নয়, তখন পুরো গণিত বিশ্ব রীতিমতো কেঁপে উঠেছিল। তিনি দেখালেন, স্বাভাবিক সংখ্যার (1, 2, 3...) ইনফিনিটির চেয়ে বাস্তব সংখ্যা (√2, π, e) ইনফিনিটি অনেক বড়।
কিন্তু এরপরেই ক্যান্টর একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন রেখে যান—এই দুই আকারের ইনফিনিটির মাঝখানে কি অন্য কোনো সাইজের ইনফিনিটি থাকা সম্ভব? ক্যান্টরের ধারণা ছিল, নেই। এটিই গণিতের ইতিহাসে কন্টিনাম হাইপোথিসিস (Continuum Hypothesis) নামে পরিচিত। জর্জ ক্যান্টর নিজে এটি প্রমাণ করতে পারেননি, আর পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিশ্বসেরা গণিতবিদেরাও এই ধাঁধার কোনো সমাধান খুঁজে পাননি।
অবশেষে ১৯৬৩ সালে, ২৯ বছর বয়সী তরুণ গণিতবিদ পল কোহেন (Paul Cohen) এমন এক সমাধান নিয়ে এলেন, যা লজিকের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয় এবং ১৯৬৬ সালে (৩২ বছর বয়সে) তাঁকে এনে দেয় গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেল।
কোহেনের আবিষ্কার কেন যুগান্তকারী?
জ্যামিতি বা বীজগণিতের মতো সেট থিওরিও কিছু মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ বা স্বীকার্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বলা হয় ZFC (Zermelo-Fraenkel Set Theory with the Axiom of Choice)। এত দিন গণিতবিদেরা ভাবতেন, জেএফসির (ZFC) নিয়মগুলো ব্যবহার করে কন্টিনাম হাইপোথিসিসকে অবশ্যই ‘সত্য’ অথবা ‘মিথ্যা’ প্রমাণ করা যাবে।
কার্ট গোডেলের কাজ (১৯৪০): গোডেল প্রমাণ করেন যে প্রচলিত জেএফসি নিয়ম দিয়ে কন্টিনাম হাইপোথিসিসকে ভুল প্রমাণ করা অসম্ভব।
পল কোহেনের পাল্টা আঘাত (১৯৬৩): কোহেন প্রমাণ করলেন এর ঠিক উল্টো দিকটি—প্রচলিত নিয়ম দিয়ে একে সঠিক প্রমাণ করাও অসম্ভব!
অর্থাৎ কন্টিনাম হাইপোথিসিস হলো গণিতের ইতিহাসের প্রথম প্রাকৃতিক সমস্যা, যা সম্পূর্ণ স্বাধীন (Independent)। আপনি একে সত্য ধরে নিলেও গণিতের কাঠামো ভাঙবে না, আবার মিথ্যা ধরে নিলেও কোনো বৈপরীত্য তৈরি হবে না!
পল কোহেনের এই প্রমাণ আমাদের শেখায় যে গণিত কোনো স্থবির বা পরম সত্যের খাঁচায় বন্দী বিষয় নয়। মানুষ যেভাবে তার চিন্তার পরিধি বাড়ায়, গণিতের সীমানাও সেভাবে প্রসারিত হয়। ইনফিনিটিকে স্পর্শ করা না গেলেও, তাকে বোঝার অনন্য ক্ষমতা যে মানুষের মস্তিষ্কের আছে—পল কোহেন সেটিই প্রমাণ করে গেছেন।
কোহেনের তাসের টেক্কা: ‘ফোর্সিং’ (Forcing) পদ্ধতি
এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে কোহেন সেট থিওরিতে আবিষ্কার করেন সম্পূর্ণ নতুন এক গাণিতিক হাতিয়ার—ফোর্সিং।
১. গোডেলের মডেল থেকে শুরু: ১৯৪০ সালে কার্ট গোডেল ‘কনস্ট্রাক্টিবল ইউনিভার্স’ (L) নামে সেট থিওরির এমন একটি মডেল তৈরি করেছিলেন, যেখানে কন্টিনাম হাইপোথিসিস সত্যি। কোহেন এই ভিত্তি থেকেই তাঁর কাজ শুরু করেন।
২. নতুন উপাদান যুক্ত করা: এরপর ‘ফোর্সিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাইরের কিছু নতুন উপাদান বা সেট (Generic Filters) কৌশলগতভাবে ওই মডেলের ভেতর প্রবেশ করান।
৩. ভারসাম্য পরিবর্তন: নতুন এই উপাদানগুলো যুক্ত হওয়ার ফলে মূল মডেলটি প্রসারিত হয়। কোহেন এমনভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে বাস্তব সংখ্যার ইনফিনিটি অনেক বেশি বড় হয়ে যায় এবং মাঝখানে নতুন সাইজের ইনফিনিটি তৈরি হয়। এর মাধ্যমে তিনি দেখালেন, কন্টিনাম হাইপোথিসিসকে মিথ্যা ধরে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নিখুঁত গাণিতিক মহাবিশ্ব দাঁড় করানো সম্ভব, যা ZFC-এর কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করে না।
ফিল্ডস মেডেল অর্জনের পেছনে মূল কারণ
১৯৬৬ সালে মস্কো ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেসে পল কোহেনকে ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয়। তার মূল সাফল্যগুলো:
●হিলবার্টের ১ নম্বর সমস্যার সমাধান: ১৯০০ সালে ডেভিড হিলবার্টের দেওয়া শতাব্দীর সেরা ২৩টি গাণিতিক সমস্যার তালিকার শীর্ষে ছিল এই কন্টিনাম হাইপোথিসিস। কোহেন সেটির চূড়ান্ত সমাধান করেন।
●যুক্তিবিদ্যার নতুন দিগন্ত: ‘ফোর্সিং’ পদ্ধতি আবিষ্কারের পর গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রে বিপ্লব ঘটে। পরবর্তী সময়ে এই কৌশল ব্যবহার করে আরও শত শত অমীমাংসিত সমস্যার স্বাধীনতা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।
●বিশ্লেষণ থেকে লজিকে চমক: কোহেন মূলত সেট থিওরির গবেষক ছিলেন না; তাঁর মূল ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক বিশ্লেষণ। বাইরের একজন হয়েও মাত্র কয়েক মাসের চেষ্টায় লজিকের এই চিরন্তন রহস্যভেদ করা এক অবিশ্বাস্য কীর্তি।
পল কোহেনের এই প্রমাণ আমাদের শেখায় যে গণিত কোনো স্থবির বা পরম সত্যের খাঁচায় বন্দী বিষয় নয়। মানুষ যেভাবে তার চিন্তার পরিধি বাড়ায়, গণিতের সীমানাও সেভাবে প্রসারিত হয়। ইনফিনিটিকে স্পর্শ করা না গেলেও, তাকে বোঝার অনন্য ক্ষমতা যে মানুষের মস্তিষ্কের আছে—পল কোহেন সেটিই প্রমাণ করে গেছেন।