উৎপাদকের রাজ্যে: পর্ব–১
গণিতপ্রেমী ছোট্ট বন্ধুরা!
আশা করি, তোমরা সবাই ভালো আছ। গণিত ইশকুলের নতুন সিরিজে তোমাদের সবাইকে স্বাগত।
ছোটবেলায় আমরা তো সবাই উৎপাদক নিয়ে পড়েছি, তাই না? ছোট একটা সংখ্যার সব উৎপাদক নির্ণয় করতেও কমবেশি প্রায় সবাই আমরা হিমশিম খেয়েছি। আর বড় সংখ্যা হলে তো কথাই নেই! তার ওপর থাকত আরেক চিন্তা। সব কটি উৎপাদক বের করতে পারলাম তো? কোনো উৎপাদক বাদ পড়ল না তো! অঙ্ক করতে গিয়ে এসব দুশ্চিন্তা ছিল আমাদের জন্য খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। আর আমরা সবাই জানি, অঙ্ক করতে গিয়ে না জানার জন্য আমাদের যতটা ভুল হয়, দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ভুল হয় আরও বেশি! কিন্তু তোমরা কী জানো, যেকোনো সংখ্যার মোট উৎপাদক সংখ্যা কয়টা, তা জানার একটা মজার সূত্র আছে?
উপায়টা মজার। চলো, আমরা ধাপে ধাপে উপায়টা শিখি। আমরা 58800 সংখ্যাটিকে উদাহরণ হিসেবে নিই।
ধাপ 1: সংখ্যাটিকে মৌলিক উৎপাদকে ভেঙে ফেলো। নিয়মটা তো জানাই তোমাদের। 58800 = 2×2×2×2×3×5×5×7×7
ধাপ 2: এবার মৌলিক সংখ্যাগুলোকে ভিত্তি হিসেবে মৌলিক সংখ্যাগুলো যতবার আছে, তা উপরে সূচক আকারে লিখে পুরো লাইনটা আরেকটু সহজভাবে লিখি: 58800 = 2⁴×3¹×5²×7²
ধাপ 3: প্রতিটা সূচকের সাথে 1 যোগ করে পাশাপাশি গুণ করো। আমরা এখানে চারটা সূচক পেরেছি, 4, 1, 2 এবং 2। এগুলোর সাথে 1 যোগ করে গুণ করি: (4+1)×(1+1)×(2+1)×(2+1) = 90
ব্যস, এটাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। 90টা উৎপাদক আছে আমাদের এই 58800-এর।
সহজ ভাষায় বললে, সূত্রটা হলো, কোনো সংখ্যাকে যদি এইভাবে প্রকাশ করা যায়, যেখানে ভিত্তিসংখ্যাগুলো সব কটি মৌলিক, কোনো ভিত্তিসংখ্যা একাধিকবার নেই এবং সব সূচক ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা, তাহলে ওই সূচকগুলোর প্রতিটির সঙ্গে 1 যোগ করে প্রাপ্ত যোগফলগুলো গুণ করলে ওই সংখ্যার মোট ধনাত্মক উৎপাদক সংখ্যা পাওয়া যায়।
উপরোক্ত নিয়ম মেনে A=pˣqʸrᶻ রূপে প্রকাশ করা হলে, A–এর উৎপাদকসংখ্যা (x+1)(y+1)(z+1)টি।
আমি এই নিয়মটা গণিত ভাইয়াকে বলার পর গণিত ভাইয়া বললো, তুমি যে এই Formula আমাকে বললে, তার গাণিতিক ভিত্তি কী? আমি বললাম, এটা প্রমাণ করা যায় Combinatorics-এর সাহায্যে। গণিত ভাইয়া বললো, অত শত combinatorics আমি এখনই বুঝতে চাই না। আমাকে সহজ বাংলায় বোঝাও, কীভাবে এই সূত্রটা এল।
কী আর করার। পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে।
আমি বললাম, ধরেন গণিত ভাইয়া, এইগুলো সংখ্যা না, একেকটা ফল। 2⁴×3¹×5²×7² না ধরে ধরেন, আপনার সামনে 4টা আপেল, 1টা আঙুর, 2টা কমলা আর 2টা আম আছে, সেখান থেকে আপনি ইচ্ছেমতো ফল নিতে পারবেন। আপনি কয়ভাবে সেখান থেকে ফল নিতে পারবেন?
গণিত ভাইয়া বললো- আপেলের ক্ষেত্রে আমি হয় একটাও নেব না/না হয় একটা নেব/দুইটা নেব/তিনটা নেব/চারটাই নিয়ে নেব। মোট পাঁচটি বিকল্প আমার কাছে।
আঙুরের ক্ষেত্রে হয় আমি আঙুরটা নেব, না হয় নেব না, অতএব আঙুরের জন্য দু্টি বিকল্প আছে।
কমলার ক্ষেত্রে হয় আমি কিছুই নেব না, না হয় একটা নেব অথবা দুটোই নেব। আমার কাছে তিনটা বিকল্প আছে।
আমের ক্ষেত্রেও আমি কিছু নাও নিতে পারি, অথবা একটা নিতে পারি, বা দুটোই নিতে পারি। এ ক্ষেত্রেও আমার কাছে তিনটা বিকল্প আছে।
আমি বললাম, ভাই, আপনি একটু সহজভাবে চিন্তা করেন, শুধু আপেল আর আঙুরের জন্য। আপনি চাইলে কোন আপেল না নিয়ে দুইভাবে আঙুর নিতে পারেন, তাই না? একইভাবে একটি আপেল নিয়েও দুইভাবে আঙুর নিতে পারেন, দুটি আপেল নিয়েও দুইভাবে আঙুর নিতে পারেন, দুটি আপেল নিয়ে এ দুইবাবে আঙুর নিতে পারেন, আর চারটা আপেল নিতে ও দুইভাবে আঙুর নিতে পারেন। তা হলে আপনার মোট নেওয়ার ধরন = 2+2+2+2+2 = 10টি।
গণিত ভাইয়া বললো, আরে, দাঁড়াও, দাঁড়াও! প্রতিটি আপেলের জন্য যদি আমার দুটো ধরন থাকে, তাহলে তো আমি ধরনসংখ্যা গুণ করলেই পারি, আপেলের ধরন×আঙুরের ধরন = 5×2 = 10টি।
আমি বললাম Exactly! আপনি আপেলের ধরনকে আঙুরের ধরন দিয়ে গুণ করলেই মোট আপেল ও আঙুর নেওয়ার ধরনসংখ্যা বের করে ফেলতে পারছেন। তাহলে আপেল, আঙুর, কমলা ও আম নেওয়ার বেলার? গণিত ভাইয়া কথা শেষ করার আগেই বলে উঠলেন, আপেলের ধরন×আঙুরের ধরন×কমলার ধরন×আমের ধরন = 90টি, আরে, এটা তো আমার ওই সংখ্যার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!
হ্যাঁ, আপনার ওই সংখ্যার সঙ্গে মিলে যায়, আপনি এখন একইভাবে চিন্তা করেন, আপনার কাছে 4টা 2 আছে, 1টা 3, 2টা 5 ও 2টা 7 আছে। 5টা উপায়ে আপনি 2 নিতে পারেন, 2টা উপায়ে 3 নিতে পারেন, 3টা উপায়ে 5 নিতে পারেন আর 3টা উপায়ে 7 নিতে পারেন, তাই আপনার মোট নেবার ধরন- 5×2×3×3=90। আর প্রতিটি ধরন কিন্তু এক-একটা উৎপাদক। আপনি 2টা 2 নিলেন, কিন্তু 3 আর 5 কিছুই নিলেন না, 7 একটা নিলেন, হলো 2×2×7 = 28, সেটাও কিন্তু 58800-এর একটা উৎপাদক! অর্থাৎ আমরা যতভাবে 4টা 2, 1টা 3, 2টা 5 আর 2টা 7 এর থেকে সংখ্যা নিয়ে পারি (অর্থাৎ 90 উপায়ে) তার প্রতিটিই এক-একটা উৎপাদক! কাজেই আমরা 90 ভাবে 58800–এর উৎপাদক নিতে পারি। তাই বলা যায়, 58800–এর উৎপাদক সংখ্যা 90টি!
গণিত ভাইয়া বললেন, হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।
আমার ছোট্ট বন্ধুরা, এবার তোমাদের জন্য একটা প্রশ্ন রইল। চিন্তা কর তো, কখন একটা সংখ্যার উৎপাদক সংখ্যা বিজোড় হয়?
দেখা হবে গণিত ইশকুলের এই সিরিজের পরবর্তী পর্বে। তোমাদের সবার জীবনের গ্রাফের Second Derivative Negative হোক!