এআই যুগে আশির দশকে ফেরা
কদিন ধরে ফেসবুকে ঢুকলেই শুধু ছবি আর ছবি। সবার প্রোফাইল পিকচার বদলে গেছে। কেউ ১৯৮০ সালের বড় কোনো বিল্ডিংয়ের নিচে মোটা প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে, কেউ আবার কানে ক্যাসেট প্লেয়ার গুঁজে ভিনটেজ লুকে পোজ দিয়েছেন। সবাই এআই দিয়ে নিজেকে আশির দশকের মানুষ বানিয়ে ফেসবুকে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে দিয়েছেন।
৭০ বছর বয়সী রহিম সাহেব এত কিছু বোঝেন না। তিনি ফেসবুক ফিড স্ক্রল করতে করতে হুট করে ভড়কে গেলেন। ব্যাপার কী! চোখের পলকে দেশের অর্ধেক মানুষ দেখি আগের যুগে চলে গেলেন!
তিনি দ্রুত স্ত্রী আলেয়াকে ডাকলেন।
‘ওগো, তাড়াতাড়ি আসো! এ তো বড় বিপদের কথা! ফেসবুকে সবাই দেখি আগের দিনে চলে গেছে। আমাদের পাড়ার মকবুল ভাইকেও দেখলাম ক্যাসেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ পরশুও তার সঙ্গে দেখা হলো। কিছু বলল না তো!’
আলেয়া পান চিবাতে চিবাতে বললেন, ‘যাক গে, মন্দ কী! তখন তো মানুষ এত যান্ত্রিক ছিল না। শান্তিমতো রবীন্দ্রসংগীত শোনা যেত।’
রহিম সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আরে, এ জন্যই তো বলি, তোমার বাবা আমাকে ঠকাইছেন! তোমার মাথায় ঘিলু বলে কিসসু নাই। আরে মুর্খ মহিলা, শান্তিমতো গান শোনা যেত, ঠিক আছে। কিন্তু একটু ব্রেন খাটাও!’
আলেয়া অবাক হয়ে তাকালেন।
রহিম সাহেব বললেন, ‘সবাই যদি আশির দশকে চলে যায়, তাহলে বর্তমান যুগে রইলটা কে? এই ফাঁকে শহরের সব চোর-বাটপার ঘরবাড়ি, ফ্রিজ, টিভি থেকে শুরু করে যা আছে সব নিয়ে চম্পট দেবে। চোরেরা তো ঈদে গ্রামের বাড়ি গেলেই সব সাবাড় করে দেয়। ওরা তো এসব সুযোগই খোঁজে!’
আলেয়া এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন।
‘তাই তো! আমার নাকফুলটা!’
একটু থেমে আবার বললেন, ‘আচ্ছা, আশির দশকে কি সবার থাকার জায়গা হবে? তখন তো ঢাকায় এত ফ্ল্যাট বাড়ি ছিল না। মানুষ থাকত টিনশেড বাড়ি কিংবা খিলগাঁওয়ের কলোনিতে। এত কোটি কোটি মানুষ ওই সময়ে গিয়ে গাদাগাদি করে থাকবে কোথায়?’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
রহিম সাহেবের কপালের চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো।
‘সেটাই তো! আগের সময়ে ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক লাখ। এখনকার আড়াই–তিন কোটি মানুষ যদি টাইম মেশিনে করে আশির দশকে চলে যায়, তাহলে কী অবস্থা হবে ভেবেছ?’
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, ‘মিরপুর রোড তো দূরের কথা, মতিঝিলের শাপলা চত্বরেও পা ফেলার জায়গা থাকবে না। সব বাস আর রিকশার জ্যামে আশির দশকের ঢাকার বাতাস পর্যন্ত থমকে যাবে। চা-ওয়ালা এক কাপ চা বানাতে গিয়ে ১০ কোটি মানুষের অর্ডার সামলাতে সামলাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে!’
হঠাৎ রহিম সাহেবের চোখ চকচক করে উঠল।
‘তবে যদি আমি যেতে পারি, এবার আর আগের মতো ভুল করব না। তোমার মতো মুর্খ মহিলাকে বিয়ে আমি করব না, এই আমি বলে দিলাম!’
পাশেই ছিল তাঁদের ১১ বছরের নাতি সানি। সে এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। এবার খিকখিক করে হেসে বলল, ‘দাদা, তোমরা এত চিন্তা করছ কেন? এগুলো সব এআইয়ের কারসাজি। জাস্ট প্রম্পটের কামাল। কেউ কোথাও যাচ্ছে না। সবাই বর্তমানে সবাই শুধু আশির দশকের মতো সেজে বসে আছে!’
রহিম সাহেব আর আলেয়া—দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যেন বুকের ওপর থেকে পাথর সরে গেছে।
রহিম সাহেব নাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দাদুভাই, ওই সব বানাতে পারবি?’
সানি হেসে বলল, ‘আলবত পারব!’
রহিম সাহেব মোবাইলটা পকেট থেকে বের করতে করতে বললেন, ‘যাক, বেঁচে গেলাম! চোরেরা বাসাবাড়ি খালি না পেলেই হলো। আচ্ছা, আমাকেও একটা ছবি আশির দশকের স্টাইলে বানিয়ে দে তো। নেটে ছাড়ব। সুন্দর করে দিস, নয়তো লাইক পাব না!’
*লেখক: আবীর আল নাহিয়ান, শিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেট