ইউজিসি বদলে হচ্ছে উচ্চশিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংসহ আর কী কী হবে

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)কোলাজ

দেশের উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে আছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), তার পরিবর্তে এখন গঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন। নতুন এই কমিশনের ক্ষমতা, মর্যাদা ও পরিধি এখনকার ইউজিসির তুলনায় অনেক বেশি হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করেছে। সেই অনুযায়ী কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা হবে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান। আর সদস্যদের মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ের। সদস্যসংখ্যাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, যাতে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

এই কমিশন গঠিত হলে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইউজিসির মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না; বরং কমিশন নিজেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭২। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি, বেসরকারি ১১৬টি। অধিভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসাসহ উচ্চশিক্ষা খাতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ৪৮ লাখের বেশি।

উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর খসড়া প্রস্তুত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা মতামতের জন্য বিভিন্ন অংশীজনের কাছে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও এটি প্রকাশ করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে এই খসড়া ইউজিসিই প্রণয়ন করে দিয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭২। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬টি, যার মধ্যে ৫১টির কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১৬টি, যার কয়েকটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অধিভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসাসহ উচ্চশিক্ষা খাতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ৪৮ লাখের বেশি।

দেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী করা ও তদারকির লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ইউজিসি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে এটি বিধিবদ্ধ হয়। মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসির যাত্রা শুরু হয়েছিল। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কমিশনটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থ বরাদ্দ ও বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে আসছে।

উচ্চশিক্ষার বিস্তার ব্যাপক হারে বাড়লেও ইউজিসির কার্যকর ক্ষমতা সীমিতই রয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুপারিশের বাইরে বাস্তব কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেই ইউজিসিকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ বলে আখ্যা দেন। দীর্ঘদিন ধরেই ইউজিসিকে আইনিভাবে শক্তিশালী করার আলোচনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একাধিকবার উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি।

এখন আবার নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই কমিশন আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইউজিসির কর্মকর্তারা অবশ্য আশাবাদী যে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হবে।

একজন চেয়ারম্যান, আটজন কমিশনার ও ১০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে উচ্চ শিক্ষা কমিশন। চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা হবে পূর্ণ মন্ত্রীর সমান। সদস্যদের মর্যাদা হবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ের। সদস্যসংখ্যাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, যাতে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

চেয়ারম্যান–কমিশনারদের মর্যাদা ও যোগ্যতা

অধ্যাদেশের খসড়া অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। প্রয়োজনে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সুযোগ থাকবে, যা বর্তমানে ইউজিসির ক্ষেত্রে নেই। কমিশন গঠিত হবে একজন চেয়ারম্যান, আটজন কমিশনার ও ১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য নিয়ে। বর্তমানে ইউজিসিতে একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন স্থায়ী সদস্য রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ভবন
ছবি: ইউজিসি ওয়েবসাইট

অনুসন্ধান কমিটির (সার্চ কমিটি) সুপারিশের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁদের মেয়াদ হবে চার বছর, তবে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগের সুযোগ থাকবে। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডিধারী শিক্ষাবিদ হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার কমপক্ষে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে অধ্যাপক পদে থাকতে হবে অন্তত ১৫ বছর। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য গবেষণা প্রকাশনা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন কেবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন, তবে তিনি কেবিনেট মন্ত্রী হবেন না। সেই অনুযায়ী বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কমিশনারদের মর্যাদা হবে আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ের। বর্তমানে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী ইউজিসি চেয়ারম্যানের অবস্থানক্রম ১৬ নম্বরে।

তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং

খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শিক্ষা ও গবেষণার চাহিদা নিরূপণ, উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ, নীতি ও নীতিমালা প্রণয়ন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি, দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রকল্পের নজরদারির দায়িত্ব থাকবে কমিশনের ওপর।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করবে কমিশন। পাশাপাশি মানদণ্ড নির্ধারণ করে প্রতি তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হবে। র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে অধ্যাদেশের খসড়ায়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রেডিট স্থানান্তর এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষক-গবেষক বিনিময় কর্মসূচিতেও কমিশন সহযোগিতা করবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে কোনো আইন বা সরকার কর্তৃক অর্পিত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পর্কিত যেকোনো ক্ষমতা প্রয়োগ, দায়িত্ব ও কার্য সম্পাদন করবে এই উচ্চশিক্ষা কমিশন।

কমিশন প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, হিসাব তলব ও মূল্যায়ন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে স্বপ্রণোদিত হয়ে বা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে কমিশনের। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের নির্দেশনা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে বরাদ্দ স্থগিত (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে), কোর্স বা প্রোগ্রামের অনুমোদন বাতিল, স্থগিত, এমনকি ভর্তি বন্ধের নির্দেশও দিতে পারবে কমিশন।

তবে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ৩০ দিনের মধ্যে কমিশনের কাছে রিভিউ আবেদন করতে পারবে। সেখানেও সন্তুষ্ট না হলে আচার্যের কাছে আবেদন করার সুযোগ থাকবে।

কমিশন প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগের অর্থবছরের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে, যা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

কমিশন প্রতি তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, হিসাব তলব ও মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ইতিবাচক, তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

প্রস্তাবিত বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগকে শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, গত পাঁচ দশকে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার বহুগুণ বেড়েছে; কিন্তু তদারকির কাঠামো সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি। ফলে ইউজিসির পরিবর্তে অধিক ক্ষমতা ও দায়িত্বসম্পন্ন একটি কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব হচ্ছিল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন কমিশন হলে উচ্চশিক্ষার মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা তদারকি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং, গবেষণা প্রকল্পের মূল্যায়ন এবং দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে গুণগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ইউজিসির লোকবলও কম, আবার কাজের স্বাধীনতাও খুব একটা নেই। এখন উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করে যোগ্য লোকবল বাড়িয়ে এবং কাজের স্বাধীনতা দেওয়া হলে সেটা উচ্চশিক্ষার জন্য ইতিবাচক হবে।

‘তবে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা খুব জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনেরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে’, যোগ করেন তিনি।