রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠানই নয়। এটি আমাদের নেতৃত্বের প্রতীক ও পথপ্রদর্শক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক নেতাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় আলোকিত হয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নিউক্লিয়াস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সম্মানিত উপাচার্য ও শিক্ষকমণ্ডলী, আপনারা সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম এবং এর অনেক পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের দেখলে বা তাঁদের কথা শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসত। কিন্তু ইদানীংকালে কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আপনাদের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, কিছুসংখ্যক অসাধু লোকের কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা শিক্ষকসমাজের মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একজন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান, পরিচালনা, মূল্যায়ন ও উন্নয়নকে ঘিরে। কিন্তু ইদানীং পত্রিকা খুললে মনে হয়, পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেওয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াই যেন কিছু উপাচার্যের মূল দায়িত্ব। অনেক শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঐচ্ছিক মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়াকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন৷ ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে এটি খুবই বেমানান।’

এ সময় সমাবর্তনের কস্টিউম (কালো রঙের গাউন-টুপি-টাই) পরে চেয়ারে বসে থাকা স্নাতকেরা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে সমর্থন করে হাততালি ও হর্ষধ্বনি দিতে থাকেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘শিক্ষকেরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ও সেরা ছাত্র ছিলেন। আমার বিশ্বাস, আপনারা যেকোনো ক্ষেত্রেই সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হতেন। কিন্তু জীবনের মহান ব্রত হিসেবে শিক্ষকতাকেই আপনারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে আপনারা নিজ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, উপাচার্যের নেতৃত্বে ও ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র তথা সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে গড়ে উঠুক, শিক্ষকেরা হয়ে উঠুন সমাজে মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকসহ যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।’

গবেষণা কম হওয়া নিয়েও আক্ষেপ রাষ্ট্রপতির

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কম হওয়া নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো একেকটি গবেষণাগার। মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে মানসম্পন্ন গবেষণা ও গবেষণালব্ধ কাজের প্রয়োগ অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুগের সঙ্গে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাত্রা গতিশীল হলেও দুঃখের বিষয় হচ্ছে গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হতো। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই যেন সেই ঐতিহ্য সংকুচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত না হলেও কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষার গুণগত মান ও গবেষণার পরিমাণ ও মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে, সেটাও মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয়, তা দেখলে বা শুনলে অনেক সময় আচার্য হিসেবে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়।’ এই বক্তব্যেও হাততালি ও হর্ষধ্বনি দিয়ে সমর্থন জানান স্নাতকেরা।

কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ইউনিট চালুর আহ্বান রাষ্ট্রপতির

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এ ডিজিটাল যুগেও প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায় যে ভর্তিপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সনদ উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থীরা অবহেলা আর হয়রানির মুখোমুখি হয়। শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে আমি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার, কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ইউনিট ইত্যাদি চালু করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি আমার আহ্বান, শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলুন, যাতে এ জন্য তাদের বিদেশে পাড়ি দিতে না হয়৷ তরুণ গবেষকদের মেধা ও উদ্ভাবন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসুন।’

স্নাতকদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ বলেন, ‘তোমাদের শিক্ষা অর্জন যেন সমাবর্তন আর সনদেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে আজকের এই অর্জনের পেছনে তোমাদের বাবা-মা, শিক্ষক ও রাষ্ট্রের যে অবদান ও ত্যাগ রয়েছে, তা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে এটাই সবার প্রত্যাশা৷ আসুন, আমরা সবাই প্রগতি, আধুনিকতা ও সহনশীলতার দিকে আরও বেশি এগিয়ে যাই৷ সব ধরনের সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতা থেকে নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের মুক্ত রাখি৷ সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অধিকতর কার্যকর অবদান রাখবে, এটাই আমার প্রত্যাশা৷’

অসুস্থ থাকায় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসেই বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি৷ এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বসে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমি দুঃখিত৷ আমি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ৷ বিদেশে চিকিৎসা শেষে তিন দিন আগে দেশে ফিরেছি৷ চিকিৎসা করলেও তেমন ভালো হয়ে যে আসতে পেরেছি, তা নয়৷ শারীরিক কারণে সমাবর্তনে আসার মতো অবস্থা না থাকলেও মনের জোরে আমি এখানে এসেছি৷ রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শেষ হয়ে যাবে৷ করোনার জন্য মাঝখানে তিন বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে আসা হয়নি৷ বলতে গেলে আমার জন্য এটা শেষ সমাবর্তন৷ ভাবলাম, মোটামুটি নাকের আগায় দম থাকা পর্যন্ত আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করব। এ ধরনের একটা মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাটা যে কত গৌরব আর সৌভাগ্যের, তা বলে শেষ করা যাবে না। আমার বংশধারা অনুযায়ী, কেউ ৭০-৮০ বছরের বেশি বাঁচেনি৷ আমার বয়স আগামী বছরের জানুয়ারিতে ৮০ বছর শুরু হবে আল্লাহ জানেন, কী হবে।

নিজেদের ওপর বিশ্বাস থাকতে হবে, শিক্ষার্থীদের নোবেল বিজয়ী তিরোল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন নোবেল বিজয়ী ফরাসি অর্থনীতিবিদ জিন তিরোল। স্নাতকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা ভাবতে পারেন, নোবেল বিজয়ীরা সুপারম্যানের মতো কোনো অসাধারণ মানুষ। নোবেল বিজয়ীসহ পেশাগতভাবে সফল যেকোনো মানুষের গল্পটা কঠোর নীতিনিষ্ঠতার। স্নাতকেরা, আপনাদের কঠোর পরিশ্রমী ও নিজের ক্ষেত্র নিয়ে প্রগাঢ় উৎসাহী হতে হবে এবং একই সঙ্গে তা সম্পর্কে সমালোচনাপ্রবণ (ক্রিটিক্যাল) হতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে আপনাদের শিখতে হবে, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় যাওয়ার স্পৃহা থাকতে হবে সর্বোপরি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে আপনাদের। নিজেদের মেধার ওপর বিশ্বাস থাকতে হবে। থেমে যাবেন না, এগিয়ে চলুন। আমার পরামর্শ থাকবে, স্নাতক হওয়ার এই যাত্রায় যাঁরা আপনাদের সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। নতুন ডিগ্রি আপনাদের সামনে অনেক সুযোগের পাশাপাশি অনেক দায়িত্বও হাজির করবে। ডিজিটাল বিপ্লবের মাধ্যমে কীভাবে সমাজকে উপকৃত করা যায়, পৃথিবী ও এর মানুষকে রক্ষায় কীভাবে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করতে পারি, জনতোষণবাদ ও জাতীয়তাবাদের বিপরীতে কীভাবে আমরা যুক্তিকে দাঁড় করাব ইত্যাদি আপনাদের ভাবতে হবে বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন নিয়ে আপনাদের গর্বিত হওয়া উচিত৷ এর সঙ্গে শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণে আরও কাজ করতে হবে।’

সমাবর্তনে দেওয়া বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান স্নাতকদের উদ্দেশে বলেন, আজকে তোমাদের যে অর্জন, তা এই বিদ্যাপীঠের অর্জনও বটে৷ আজকের এই আনন্দের দিনে তোমাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি৷

অনুষ্ঠানমালা

বেলা ১১টা ৫২ মিনিটের দিকে শোভাযাত্রাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নির্মিত সমাবর্তনের মঞ্চে ওঠেন রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদুল ১২টার দিকে বেজে ওঠে জাতীয় সংগীত৷ ১২টা ১ মিনিটে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি৷ এরপর পবিত্র কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে পাঠ করেন ৪ জন শিক্ষক৷ স্বাগত সংগীতের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যকলা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী৷

সোয়া ১২টার দিকে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সমাবর্তন বক্তা জিন তিরোলকে ডক্টর অব লজ ডিগ্রি দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে হওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়টি আচার্য মো. আবদুল হামিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান৷ এরপর সমাবর্তন বক্তার সাইটেশন (বিস্তারিত পরিচয়) পড়ে শোনান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল৷ এর পরপরই জিন তিরোলকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি দিতে আচার্যকে অনুরোধ করেন উপাচার্য৷ আচার্য তা অনুমোদন করে জিন তিরোলকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি হস্তান্তর করেন। এরপর জিন তিরোলের স্বাক্ষর গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ৷ পরে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য জিন তিরোলের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন৷ এরপর আচার্যকে ক্রেস্ট দেন উপাচার্য৷

এরপর যথাক্রমে বিভিন্ন অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের ১৩১ জন কৃতী শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীকে ১৫৩টি স্বর্ণপদক, ৯৭ জনকে পিএইচডি, ২ জনকে ডিবিএ ও ৩৫ জনকে এমফিল ডিগ্রি দেওয়া হয়৷ নাম ঘোষণার পর ডিগ্রি অনুমোদন করে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের উষ্ণ অভিনন্দন জানান আচার্য৷ পরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্তদের একে একে মঞ্চে ডেকে স্বর্ণপদক পরিয়ে দেন তিনি৷ অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মুহাম্মদ সামাদ৷