মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেমিনার
এ মুহূর্তে অনলাইনে ক্লাস চান না শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে অনলাইনে ক্লাস চান না শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। তাঁরা বলছেন, এ মুহূর্তে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলে তাতে পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হবে। এর আগে করোনাকালে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলেও তা তেমন কার্যকর হয়নি।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের উপস্থিতিতে এক সেমিনারে অংশ নিয়ে এই অভিমত দেন ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। কয়েকজন শিক্ষাবিদও তাঁদের বক্তব্যে এসবের পক্ষে কথা বলেন।
আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শ্রেণি কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনায় পরবর্তী করণীয় বিষয়ক এ সেমিনারের আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতরসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রায় ৪০ দিনের ছুটির পর গত ২৯ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানিসংকটে পড়েছে অনেক দেশ, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন পাঠদান চালুর বিষয়টি সামনে আসে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনায় সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে জোড়-বিজোড় ভিত্তিতে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর পাঠদানের কথা বিবেচনায় ছিল। অর্থাৎ এক দিন অনলাইন হলে পরদিন সশরীর ক্লাস—এভাবে পর্যায়ক্রমে পাঠদান চালানোর ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এ পরিকল্পনা ছিল মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য।
এখন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপটে আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তারই লক্ষ্যে আজ অংশীজনদের মতামত নিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নিশাত তিথি বলল, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি এবং তাদের পড়ালেখা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করলে সে অনলাইন ক্লাসের পক্ষ নয়। অনলাইন ক্লাস বিভিন্ন রকমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এতে পড়াশোনায় ঘাটতি পড়বে বলে সে মনে করে।
অনলাইন ক্লাসের যে চিন্তা তা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা হবে বলে মনে করেন মাদ্রাসাছাত্র কামাল হোসেন। এ সময় তিনি কোভিড-১৯–এর সময় অনলাইন ক্লাসের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।
হজরত শাহ আলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর অভিভাবক শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি অনলাইন ক্লাস না করে যেখানে পাঁচ ঘণ্টার ক্লাস হবে, সেখানে তিন ঘণ্টা ধরে দিল। যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। সেটা করা হলে ভালো হয়।’
পুরান ঢাকার একটি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দিনের আলোয় শ্রেণি কার্যক্রম চালানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা, শীতাতপ যন্ত্র বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর ওপর জোর দেন।
আরেকজন শিক্ষক ‘সেভ এনার্জি ক্যাম্পেইন’ করার পরামর্শ দেন।
শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহের অন্য দিন ছুটি দেওয়ার পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুস সালাম।
বক্তব্য দেওয়া অংশীজনদের প্রায় সবাই এ মুহূর্তেই অনলাইনে ক্লাসের বিপক্ষ মতামত দেন। তাঁরা সশরীর ক্লাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
যা বললেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
তবে সারা দেশ নয়, মহানগরেরও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যানজট ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় পরীক্ষামূলকভাবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিলে অবস্থিত আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো নির্ধারিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে সশরীর ও অনলাইনে ক্লাসের সমন্বিত (হাইব্রিড বা ব্লেন্ডেড) পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্মের নতুন শিক্ষাধারা তাঁরা আস্তে আস্তে প্রবর্তন করতে চান। এ বিষয়ে ‘ইয়েস অর নো’ জবাব দিতে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বললে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ‘ইয়েস’ বলে চিৎকার করেন।
অংশীজনদের উদ্দেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আপনারা সলিউশন (সমাধান) দেবেন, সেই সলিউশন থেকে ফিল্টার (বাছাই) করে সবচেয়ে বেস্ট (ভালো) কী করা যায়, সেই পথে যাওয়ার কাজ আমরা করব সরকারের পক্ষ থেকে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান প্রমুখ।