গণিত ইশকুল | ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতি : বিশ্বের বিস্ময় (পর্ব–২)

ছবিঃ ফ্র্যাক্টাল জামিতিক ভিজ্যুয়ালাইজেশন

গত পর্বে আমরা ছোট্ট করে ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতির একটু ইতিহাস আর চেহারাটা দেখেছিলাম। আগেই বলেছি, ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতিকে একটা সংজ্ঞার ভেতর আনা কিন্তু সম্ভব নয়তাই ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতিকে আমাদের চিনতে হয় উদাহরণে উদাহরণে। অনেকগুলো উদাহরণ যখন দেখবে, তখন খেয়াল করবে (বা খেয়াল করিয়ে দেব!) উদাহরণগুলোর মধ্যে একটা প্যাটার্ন খুঁজে পাবে। তখন মনে মনে বিশ্বাস করতে হবে, ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতির জগৎটা ধীরে ধীরে আসলে বোঝা শুরু হয়ে গেছে! কিন্তু শুধু একটা ত্রিভুজ কিংবা বৃত্তকে দেখলেই যেমন পুরো ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিকে দেখা হয়ে যায় না, ঠিক তেমনি আমরা কিন্তু ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতিকে এখনো ভালোভাবে চিনতে পারিনি। চিন্তা নেই, সামনের পর্বগুলোয় অনেক অনেক উদাহরণ দেখে আমরা ধীরে ধীরে চিনে নেব!

আজ আরেকটা গল্প বলি। সুদূর অতীতে গণিতের জগতে এটা বিশ্বাস করা হতো, সব সেট ও ফাংশনেই বুঝি ক্ল্যাসিক্যাল ক্যালকুলাস ব্যবহার করা যায়। সেট ও ফাংশনের জগতে যেসব ফাংশন এর মধ্যে পড়ত না, সেগুলোকে ‘প্যাথলজিক্যাল’ বা ‘পড়াশোনার ঊর্ধ্বে’ বলে বিবেচনা করে নেওয়া হতো। আর সবাই তো জানো, প্যাথলজিক্যাল জিনিসেই সব ম্যাথমেটিশিয়ানের আগ্রহ থাকে সবার আগে! আর তাই সবাই একটি সাধারণ তত্ত্ব বের করার পেছনে লেগে গেল।

সম্প্রতি গণিতবিদদের এই চিন্তার ধারাটাই আসলে পাল্টে গেছে। এখন আমরা অনুধাবন করতে পারি, অমসৃণ বস্তুর গণিত প্যাটার্নভুক্তির যোগ্য নয়। আসলে এরা নিজেরাই একটা স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ জগৎ! এমনকি অনিয়মিত এই সেটের জগৎ আমাদের প্রাকৃতিক সত্যের সঙ্গে আরও বেশি করে পরিচিতি ঘটায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ল্যাসিক্যাল জগতের চেয়ে আরও সঠিকভাবে। ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতি আসলে এই অনিয়মিত সেটেরই এক সাধারণ কাঠামো, যাকে আমরা জ্যামিতির কাতারে ফেলেছি।

The middle third Cantor set হলো অন্যতম বিখ্যাত এবং খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা করা যায় এমন এক ফ্র্যাক্টাল। কিন্তু এটি ফ্র্যাক্টাল আচার–আচরণের অনেকগুলো দেখাতে সক্ষম। এটি আসলে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সংঘটিত বিয়োজন প্রক্রিয়া। ডায়াগ্রামটা আগে দেখে নিই।

ধরা যাক, ​​E​ 0​​​ সেটটির ইন্টারভ্যাল হচ্ছে [0, 1] ( বলে রাখা ভালো [a,b] বাস্তব সংখ্যার সেট, যেখানে ​a ≤ x ≤ b​) । ​​E​ 0​​​ কে তিন ভাগ করে মাঝখানের ভাগটাকে ফেলে দিই। এবার যে সেটটা পেলাম, ধরি সেটা হলো ​​E​ 1​​​। তাহলে ​​E​ 1​​​ এর দুটো ইন্টারভ্যাল হলো [0, ​​1 _ 3 ​​] বা [​​2 _ 3 ​​,1]. এভাবে তিন ভাগ করে মাঝখানের ভাগ ফেলে দিয়ে সেট বানাতে থাকলে দেখা যাবে, ​​E​ k​​​ এর ইন্টারভ্যালের সংখ্যা হবে ​​2​​ k​​ এবং প্রতিটির দৈর্ঘ্য ​​3​​ −k​​। The middle third Cantor set F এ আসলে সব k এর জন্য ​​E​ k​​​ গুলো বিদ্যমান কিংবা F হলো ​​∩​ k=0​ ∞ ​ ​ ​E​ k​​​.

প্রথম দেখায় কী মনে হয়? এখানে তো অনেক সংখ্যা বাদ পড়ে গেল, তাই না? কিন্তু আসলে F অগণিত সংখ্যার সেট! এই সেট এমন সব সংখ্যা ধরে বসে আছে, যাদের 3 ভিত্তিক বিস্তৃতিতে 1 নেই! যেমন:

​​a​ 1​​ ​3​​ −1​​+​​a​ 2​​ ​3​​ −2​ + ​a​ 3​​ ​3​​ −3​​+.... E এ ​​a​ i​​ = 0 বা 2​.

এখন এই সেটের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখার পালা:

১. F নিজেই নিজের সদৃশ। খেয়াল করো, [0, ​​1 _ 3 ​​] বা [​​2 _ 3 ​​, 1]. এরা প্রত্যেকেই কিন্তু F সেটের সদৃশ! (প্রত্যেকের মধ্যে F এর এক–তৃতীয়াংশ সদস্য বিদ্যমান)

২. F সেটটির একটি সুষম কাঠামো বিদ্যমান। এটি অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম স্কেলে বিভাজ্য। ছবি যত জুম করা হবে, এটা তত বোঝা যাবে।

৩. F যদিও অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্মভাবে বিভাজিত, তবু এর ডেফিনেশন খুবই স্পষ্ট!

৪. F সেটটি যেকোনো একটা ইন্টারভ্যাল থেকে উল্টো ক্যালকুলেশন করে আনা সম্ভব!

৫. একটা জিনিস দেখেছ? F এর ডায়াগ্রামকে কিন্তু তুমি ক্ল্যাসিক্যাল জ্যামিতি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে পারছ না!

৬. F সেটটি আকারে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও এর আকার-আকৃতিকে কোনো পরিমাপক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। যেমন ধরো, দৈর্ঘ্য। দৈর্ঘ্যের সংজ্ঞানুসারে F এর দৈর্ঘ্য কিন্তু দিনশেষে ০! ( বুঝতে পারছ, কেন ক্ল্যাসিক্যাল ক্যালকুলাস দিয়ে এটাকে বলা যাচ্ছে না?)

সবাই চিন্তা করতে থাকো, আজকের মতো যাই। আসছি সামনের পর্বে!!

ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতি : বিশ্বের বিস্ময় (পর্ব–১)