বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মতিউর: ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতে কাজ করেছেন।

কবরী: সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা - এঁরা তো অসাধারণ। তবে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আমি সরাসরি কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই অপূর্ব। তাঁর কাছে কোনো কাগজপত্র থাকত না। সবই তাঁর মাথায় আর মুখে থাকত। অনেক উঁচু মাপের পরিচালক ছিলেন তিনি।

মতিউর: আপনার সময়ের ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাম বলতে বললে আপনি কাদের নাম বলবেন?

কবরী: অভিনেতা হিসেবে শ্রেষ্ঠ ছিলেন আতা ভাই। তাঁর মাপের অভিনেতা সে সময় খুব কমই ছিলেন। আর অভিনেত্রীদের মধ্যে সুমিতাদি (সুমিতা দেবী) ছিলেন দারুণ।

আমি খুব মিশুক। সবার সঙ্গে মিশতে পারি। কারও সঙ্গে মিশতে-চলতে কোনো অসুবিধা হয় না। একেবারে মাটির মানুষের মতোই একাত্মতা অনুভব করতে পারি। ভালোবাসা তো ধরা-ছোঁয়ার বাইরের বিষয়। সেটা শুধু অনুভব করা যায়।
সারাহ বেগম কবরী

মতিউর: আপনার সময়ের নায়ক ও নায়িকাদের মধ্যে কাকে ভালো বলবেন?

কবরী: নায়কদের মধ্যে রাজ্জাক ছিলেন অতুলনীয়। অভিনেতা হিসেবে ছিলেন সবার চেয়ে সেরা। আমাদের সম্পর্কটাও ছিল অনেক সুন্দর। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিল মধুর। বিশেষ বিশেষ চরিত্রে জাফর ইকবাল আর ফারুকও খুবই ভালো ছিলেন। আলমগীরও অনেক মেধাবী। চরিত্র ও অভিনয়টা বোঝার চেষ্টা করেন। শাবানার সঙ্গে ওর জুটি ছিল। আরেকজন খুব ভালো অভিনেতা ছিলেন গোলাম মুস্তাফা। আজিম ভাই ছিলেন ভালো মানুষ। অভিনেতা হিসেবে রহমানও ছিলেন দারুণ। বুলবুল ভালো অভিনয় করত। পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে অনেক কিছুই তো মনে পড়ে যায়। যেমন মনে পড়ছে শবনমের কথা। মালা, চান্দা, তালাশ ছবিতে কী চমৎকার অভিনয় করেছেন! সুলতানা জামান, সুচন্দা, সুজাতাসহ আরও অনেকেই ভালো অভিনয় করতেন।

জটিলতার তো শেষ নেই। আমাদের এই ছোট্ট দেশে প্রায় প্রতিনিয়ত ধর্ষণসহ বড় বড় অন্যায়-অবিচারের ঘটনা ঘটছে। অথচ আমরা সবাই যেন গর্তের মধ্যে ঢুকে আছি। কারও কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসছে না। শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি - সবই যেন গর্তের ভেতরে ঢুকে আছে। এ অবস্থায় আপনি কী করবেন? কী বলবেন? আমি মনে করি, আমরা যত বেশি কথা বলব, তত বেশি উত্তরণ ঘটবে আমাদের।

মতিউর: ১৯৫৬ সাল থেকে আমি ছবি দেখা শুরু করেছি। ইতালি, ফ্রান্স, মুম্বাই, কলকাতা, লাহোরসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা দেখতাম। হলিউডের ছবিও চলত। এরপর জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান - এঁদের ছবি দেখেছি। এই সময়ে আপনাদের উত্থান। সেসব ছবির পাশাপাশি কিন্তু আপনাদের ছবিও ভালো ব্যবসা করেছে। সবকিছু খোলা থাকলে শেখার সুযোগও বেশি থাকে। এখন যে বিদেশি সিনেমা বন্ধের কথা বলা হয়, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কবরী: স্বাধীনতার পরও যদি দেখেন, তখনো কিন্তু দেশে অনেক ভালো ছবি হয়েছে। রংবাজ, ওরা ১১ জন, আবার তোরা মানুষ হ - এগুলো ছবি হিসেবে, আবার ব্যবসাতেও সফল। আগের ভালো পরিচালকদের কোনো উত্তরসূরি তৈরি হয়নি। শুধু চলচ্চিত্র তো নয়, সবকিছুতেই একটা ধস নেমেছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ের মতো মানুষেরা তো পরবর্তী সময়ে তেমন আর আসেননি। ওই সময়কার কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের মতো গুণী মানুষ তো এখন আর আপনি পাবেন না। প্রায় সব ক্ষেত্রে একটা মেধাশূন্যতা চলছে। পরিচালকদের মধ্যে শেষ যে দুই নক্ষত্র ছিলেন - চাষী নজরুল ইসলাম ও আমজাদ হোসেন - তাঁরাও চলে গেলেন। কেন এই অবক্ষয়? আমার মনে হয়, রাজনীতি সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। দেশটা যেভাবে তৈরি হওয়ার কথা, সেভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। আমাদের সময়ে বিদেশি ছবির মধ্যেও আমাদের ছবি ব্যবসা করত। কেন? কারণ আমাদের নিজেদের জীবন ও সংস্কৃতির প্রবল উপস্থিতি সেখানে ছিল।

মতিউর: এই যে বললেন সর্বক্ষেত্রে ধস, সেখান থেকে ফিরে আসার উপায় কী?

কবরী: আমি নিজেও জানি না, কেমন করে ফিরে আসব। কে কাকে ধংস করবে, কে কার কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে - এই নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটা অস্থিরতা চলছে। জঙ্গিবাদ তৈরি করেছে আরেকটা অস্থিরতা। বাংলাদেশকে নিয়ে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কী ভাবছে? জটিলতার তো শেষ নেই। আমাদের এই ছোট্ট দেশে প্রায় প্রতিনিয়ত ধর্ষণসহ বড় বড় অন্যায়-অবিচারের ঘটনা ঘটছে। অথচ আমরা সবাই যেন গর্তের মধ্যে ঢুকে আছি। কারও কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসছে না। শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি - সবই যেন গর্তের ভেতরে ঢুকে আছে। এ অবস্থায় আপনি কী করবেন? কী বলবেন? আমি মনে করি, আমরা যত বেশি কথা বলব, তত বেশি উত্তরণ ঘটবে আমাদের। আর যত বেশি লুকিয়ে থাকব, তত বেশি গর্তের মধ্যে পড়ে যাব। যাঁরা যে ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেন বা করছেন, তাঁদের সামনে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের লড়াই করতে হবে। লড়াই ছাড়া মুক্তি নেই, এবং সেটা সর্বক্ষেত্রে।

আমি মনে করি, একটা সম্পর্কে দুজনেরই সমান অবদান থাকতে হয়। একতরফা কোনো কাজই ভালোমতো হয় না। আমার মতে, কোনো সম্পর্ক টিকে থাকা বা ভাঙার ব্যাপারে নারী-পুরুষ দুজনেরই সমান অবদান থাকে।
সারাহ বেগম কবরী

মতিউর: ভারতীয় নাটক-সিনেমা বাংলাদেশের জন্য কতটা দরকারি বা ক্ষতিকর বলে মনে হয় আপনার কাছে?

কবরী: ভারতের বর্তমান নাটক বা সিনেমার প্রশংসা তো আমি করতে পারব না। বাংলাদেশ থেকে এখন ভারতের যেসব টিভি-নাটক দেখা যায়, সেগুলো তো অসম্ভব ক্ষতিকর। এসব নাটক-সিরিয়ালে কেবল হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া, রেষারেষির ছড়াছড়ি। নান্দনিক কিছুই নেই। ভারতীয় সিনেমাগুলোও আগের সেই মান ধরে রাখতে পারেনি। এ ধরনের ভারতীয় সিনেমা আমি দেখতে চাই না।

মতিউর: আত্মস্মৃতিতে আপনি লিখেছেন, মেয়েরা পুরুষের প্রতি বেশি সিনসিয়ার হয়, কারণ সমাজে এখনো কর্তৃত্বের প্রথা রয়ে গেছে। নারীরা কি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষদের প্রাধান্য দেবে, নাকি নিজেই তার অধিকার আদায় করে নেবে?

কবরী: আমি মনে করি, একটা সম্পর্কে দুজনেরই সমান অবদান থাকতে হয়। একতরফা কোনো কাজই ভালোমতো হয় না। আমার মতে, কোনো সম্পর্ক টিকে থাকা বা ভাঙার ব্যাপারে নারী-পুরুষ দুজনেরই সমান অবদান থাকে।

মতিউর: আপনি আরও লিখেছেন, জীবন আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। আপনার জীবনের অভিজ্ঞতায় নিজের জীবনযুদ্ধকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কবরী: জীবনে যুদ্ধ করেই সামনের দিকে এগিয়েছি, সফল হয়েছি। এ জন্য অনেক ঘাত-প্রতিঘাতও অতিক্রম করতে হয়েছে আমাকে। আমার জীবনে দুঃখ আছে, বেদনা আছে, আবার আনন্দও আছে।

মতিউর: আপনার জীবনের একটি ঘটনা আমি পড়েছি। আপনি তখন খুব ছোট। আপনাদের সঙ্গে পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত একজন মানুষ আপনার মাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, 'মিনাকে আমি বিয়ে করতে চাই।' সে ঘটনাটি সম্পর্কে কিছু বলুন?

কবরী: (প্রশ্ন শুনে হাসি) ওহো, সে তো অনেক পুরোনো কথা। তাঁর নাম অসীম নন্দী। তাঁর এক মেয়ের জামাই প্রথম আলোতে কাজ করে। তার মাধ্যমেই অসীম নন্দীর সঙ্গে একবার ফোনে কথা হয়। আমি বললাম, দাদা, আপনি ঢাকায় আসেন না? তিনি বললেন, যাই তো। আমি বললাম, এলে তো দেখা হতো। ফোনে তিনি নানান খুনসুটি করলেন। বললেন, তুমি তো এখন বুড়ো হয়ে গেছ। আমিও কম যাইনি। বলেছি, আপনি বুঝি খুব যুবক আছেন? যা-ই হোক, পরে অবশ্য তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দেখা হওয়ার সেই ঘটনাটা এত নাটকীয় ছিল যে সেটা নিয়ে একটা সিনেমা বানানো যায়।

আমার কাছে একবার চট্টগ্রামের ফতেহাবাদের একটা স্কুল উদ্বোধনের আমন্ত্রণ এল। ফতেহাবাদ শুনেই চমকে উঠলাম। কারণ সেখানেই অসীম নন্দীর বাড়ি। কেন যেন মনে হলো, সেখানে গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। আমার কথা শুনলে তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। আমি রাজি হয়ে গেলাম।

অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি, তিনি আসেননি। তাঁর ছেলে এসে দেখা করে জানাল, বাবা অসুস্থ। তিনি আমাকে তাঁর বাড়িতে একবার যেতে অনুরোধ করেছেন। অনুষ্ঠান শেষ করে তাঁর বাড়ি গেলাম। কত বছর পর দেখা! দারুণ ছিল সেই দেখা হওয়ার মুহূর্তটা। তাঁর স্ত্রী-কন্যারা সবাই উপস্থিত। অসীম নন্দী যে আমাকে পছন্দ করতেন বা বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, পরিবারের সবাই সে কথা জানেন। আমরা এক খাটে বসলাম। অনেক কথা হলো, গল্প হলো। তাঁর এক মেয়ে ছোটবেলার সেই গল্পটা শুনতে চাইলে, বকুনি দিয়ে ওকে থামিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে ফিরে আসার সময় হয়ে এল। সেখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর থেকে আমার মোবাইলে অসীম নন্দীর নম্বর থেকে অনবরত ফোন আসতে লাগল। আমি আর ধরি না। তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, দেখা করেছি। এরপর আবার ফোনে কথা চালিয়ে যাওয়া - এসব ভালো লাগছিল না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই শেষে একবার ফোনটা ধরলাম। আমি কিছু বলার আগেই ওই পাশ থেকে একজন বলল, 'আন্টি, আপনি যাওয়ার পরে বাবা মারা গেছেন!' আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তার কথা শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। জানতে চাইলাম, কী হয়েছিল? বলল, 'জানি না। আপনার সঙ্গে দেখা হলো, হইচই করল, গল্প করল। ঠিক তার কয়েক দিন পর বাবা মারা গেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যই বোধ হয় বাবা অপেক্ষা করছিলেন।' কী আশ্চর্য! ঘটনাটা এখনো আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।

মতিউর: আপনি শিক্ষকতার মহান পেশা বেছে নিতে চেয়েছিলেন। ব্যাগ ঝুলিয়ে শাড়ি পরে বিদ্যালয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হয়ে গেলেন অভিনয়শিল্পী। অভিনয় করে খ্যাতি পেলেন, স্বীকৃতিও। সিনেমা প্রযোজনা ও পরিচালনা করছেন। সাংসদ হয়েছেন। সফলতার এই পর্যায়ে এসে জীবনটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

কবরী: মানুষ যখন প্রশংসা করে, তখন মনে হয় কিছু হয়তো করেছি। আবার কোনো কারণে কেউ ভুল বুঝলে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। তাদের বলতে চাই, হয়তো তারা আমাকে ভুল বুঝেছে। আসলে এক জীবনে তো আর সবকিছু পাওয়া যায় না। আমিও সবকিছু পাইনি। আবার সবকিছু দিতেও পারিনি, যদিও আমার দেওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল। জীবনের হিসাব-নিকাশ নিয়ে তেমন করে কখনো বসা হয়নি। যখন মানুষ প্রশংসা করে, সে সময় মনে হয় জীবনে কিছু হলেও তো করেছি।এখন মনে হয়, আমার বয়সটা যদি আরও কম হতো, তাহলে আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। নতুন করে জীবনটা শুরু করতে পারতাম। দেশকে আরও বড় কিছু হয়তো দিতে পারতাম।আমি খুব চাই, আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের দ্রুত উন্নতি হোক। হ্যাঁ, জানি, চাইলেই রাতারাতি সিনেমার অতীত ঐতিহ্যের মতো সুদিন ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু ধীরে ধীরেও কি সেটা সম্ভব নয়? ধীরে ধীরে হলেও সুদিন ফিরে আসুক না।নিজেকে নিয়ে এখন আমার আর কোনো দুর্ভাবনা নেই। আমি চাই, আমার সন্তানেরা যেন আমার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করে। আমার অপূর্ণতাগুলো যেন তারা পূরণ করতে পারে। আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না-পাওয়া - সবটা তো সিনেমাজুড়েই। আমি চাই প্রতিনিয়ত ভালো ভালো ছবির শুভমুক্তি ঘটুক। সোনালি অতীত আবারও ফিরে আসুক - নতুন আঙ্গিকে, নতুন করে।

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন