default-image

অ্যানিমেশন মুভিতে হঠাৎ হঠাৎ খুব সহজ কাজটা কেন যেন খুব জটিল হয়ে যায়। ‘শ্রেক’ ছবির ডিরেক্টরদের যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাদের ফিল্মে সবচেয়ে কঠিন শট কী ছিল? তারা বলল, বোতলের দুধ খাওয়ার দৃশ্যটি! কারণ, কোনোভাবেই তা দেখতে বাস্তব মনে হচ্ছিল না। ভাবা যায়? কত রকম কাল্পনিক রূপকথার জন্তু–জানোয়ার তারা করে ফেলল, অথচ তরল দুধ বানাতে গিয়ে এই অবস্থা! পরে আমি অবশ্য নিজের চোখেই এমন উদাহরণ দেখি। ‘হোটেল ট্র্যানসেলভেনিয়া’ ছবির তৃতীয় পর্ব, সামার ভ্যাকেশনে কাজ করার সময় দেখেছি, সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে কাউন্ট ড্রাকুলার মুখে শ্যাম্পেইন ছুড়ে মারার দৃশ্যটি করতে। একপর্যায়ে অ্যানিমেশন সুপারভাইজারকে দাঁড় করিয়ে রেখে তার মুখে শ্যাম্পেইন ছুড়ে মারা হয় গ্লাসের পর গ্লাস। সেটা আবার ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। সেই দৃশ্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে পরে শট ফাইনাল হয়। আমি মনে মনে বলেছিলাম, বিশাল অক্টোপাস থেকে শুরু করে পানির নিচের আটলান্টিক শহর বানিয়ে ফেলল, অথচ শ্যাম্পেইনে এসে কাত, এটা কোনো কথা! অথচ এ রকমই হয়। একটা প্রচলিত কথাও আছে, সহজ শট বলে কিছু নেই। যদি কোনো কিছু দেখে মনে হয় সমস্যা হতে পারে, জেনে রাখা ভালো, সমস্যা হবেই!

তাই ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে যখন আমি মুক্তিযুদ্ধের অ্যানিমেশন ছবি বানাব বলে ঘোষণা দিই, ১৫ মিনিটের শর্টফিল্মের জন্য স্ক্রিপ্ট লিখে শেষ করলাম, আমার মাথায় প্রথম যে কথাটা আসে তা হচ্ছে, দেখি এখন কী কী সমস্যা হয়। প্রথম সমস্যা হচ্ছে, আমি নিজে তো আঁকতে পারি না। আমার টিম তৈরি করতে হবে। প্রথমে তৈরি করতে হবে কনসেপ্ট। চরিত্র, প্রপস থেকে শুরু করে নানা ডিজাইন। তারপর স্টোরি বোর্ড। অ্যানিমেশনের ফিল্ম বানানোর এই ধাপকে বলে প্রি-প্রোডাকশন। একটা বেশ ভালো টিম দাঁড় করানো হলো। কিন্তু যেহেতু এ রকম একটা প্রজেক্টে বেশ সময় দিতে হয় এবং অনেকের অনেক রকম কমিটমেন্ট থাকে, টিম থেকে সরে গেল বেশ কয়েকজন। থেকে গেল প্রোডাকশন ডিজাইনার শরিফুল ইসলাম তামিম আর কনসেপ্ট আর্টিস্ট নাভিদ এফ রাহমান। আমরা তিনজন মিলেই কাজ শুরু করলাম প্রাথমিক ডিজাইনের। প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে কী রকম হবে অ্যানিমেশনের স্টাইল। রঙের প্যালেট কী রকম হবে, ব্যাকগ্রাউন্ড কী রকম হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি খুব ডিটেইলভাবে শেয়ার করলাম তামিমের সঙ্গে। আমাদের লক্ষ্য, প্রথমে দেড় মিনিটের একটা ফার্স্ট লুক টিজার বানাব। যা দেখে দর্শক সিনেমার ধরন, অ্যানিমেশনের ধরন ইত্যাদি বুঝতে পারবে। সেটা দেখিয়ে আমরা ১৫ মিনিটের জন্য ফান্ডিং চাইতে পারব।

default-image

সে হিসাবেই কাজ শুরু করা। ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য রেফারেন্স হিসেবে দেখলাম বাংলাদেশের ল্যান্ডস্কেপের ছবি, যা থেকে রঙের প্যালেটেরও একটা ভালো ধারণা হয়ে গেল। চরিত্রের ডিজাইন করতে গিয়ে পড়লাম মুশকিলে। কেন যেন কিছুতেই হচ্ছিল না। চুল, চোখ, পোশাকের ধরন, মিল ছিল না একদম। তখন আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দেখা শুরু করলাম। অ্যানিমেশন মুভিতে কনসেপ্ট কিন্তু আঁকা হয় বাস্তব মডেলের ওপর ভিত্তি করে। ঠিক করলাম আমরাও সেটাই করব। এতে একটা ট্রিবিউটও জানানো যাবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই টিজারের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ডিজাইনটা সহজ হয়ে যায়। বন্দুক, গুলি, যানবাহন ইত্যাদি রেফারেন্সও টানলাম মুক্তিযুদ্ধের ছবি থেকে। আর পাকিস্তান আর্মিদের জন্য সম্পূর্ণ অন্য রকমভাবে চিন্তা করলাম, যা কিনা আপনারা টিজারে দেখবেন। ডিজাইনের পুরো কাজটা একাই করলেন তামিম। টরন্টো বসে লোগো আর থিমেটিক পোস্টার করল নাভিদ। এরপর কাজ শুরু হলো স্টোরি বোর্ডের। আমি দৃশ্য ধরে ধরে শট লিস্ট করে দিই। সেটা অনুযায়ী প্রথমে রাফ স্কেচ এবং পরে ফাইনাল স্কেচ করলেন তামিম। একই সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অ্যানিমেটিকের কাজ করে ফেললেন। সেই সঙ্গে শেষ হলো প্রি–প্রোডাকশনের ধাপ।

এরপর প্রোডাকশন! সাউন্ড ও মিউজিকে প্রথমে কিছু রাফ ট্র্যাক করে সাহায্য করল তনয়। পরে সাউন্ড ডিজাইনার হিসেবে দলে যোগ দিল রাজেশ সাহা এবং রিপন নাথ ভাইয়ের স্টুডিও সাউন্ডবক্স। অনেক কষ্ট করে, ক্ষেত্রবিশেষে ভয়েস আর্টিস্টদের বাসায় বা অফিসে গিয়েও রেকর্ড করে এল রাজেশ। খুব চমৎকার সাউন্ড ডিজাইনের কাজ করেছে সে। এদিকে পাশাপাশি মিউজিকে সাহায্যের হাত বাড়াল, মেঘ দলের গিটারিস্ট এবং স্টুডিও কাউবেলের কর্ণধার শোয়েব। চমৎকার একটা মিউজিক বা আবহসংগীতও দেখতে দেখতে তৈরি হলো। এদিকে ততক্ষণে অ্যানিমেশন টেস্ট শুরু হয়ে গেছে। কাজটি করছে মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন আরিফ। অনেক পরিশ্রম করলেন তিনি আর তাঁর দল। সাইকোর স্টুডিওতে নিজের থ্রিডি দল নিয়ে একটা ট্রেনের মডেল তৈরি করলেন আমাদের জন্য। করলেন টুডি টেস্ট। কিন্তু কয়েক মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যেটা বোঝা গেল, যে রকম অ্যানিমেশন চাইছে, তা বাংলাদেশে করতে গেলে অনেক অনেক সময় দিতে হবে। এদিকে তত দিনে এক বছরের বেশি সময় চলে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যে টিজার শেষ করার কথা! যখন বুঝতে পারলাম, বাংলাদেশে অ্যানিমেশনের অংশটুকু করতে পারছি না, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছোট ছোট অ্যানিমেশন স্টুডিওদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। অবশেষে কানাডার হ্যালিফ্যাক্সের একটি অ্যানিমেশন স্টুডিও, স্টেলার বোর নাম, আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয় অ্যানিমেশন করতে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হলো পুরোদস্তুর অ্যানিমেশন প্রোডাকশন।

default-image

‘সারভাইভিং ৭১’ নামে আমাদের এই শর্ট ফিল্মে মূল চরিত্রে থাকছেন জয়া আহসান, মেহের আফরোজ শাওন, তানযীর তুহিন, গাউসুল আলম শাওন, সামির আহসান, অনিক খান আর ওয়াহিদ ইবনে রেজা, মানে আমি নিজে। এ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ শর্ট ফিল্মের জন্য মেহের আফরোজ শাওনের ভয়েসটি রেকর্ড করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগস্ট মাসের মধ্যে বাকি সবার ভয়েস নেওয়া হবে। এ ছাড়া টিজারে অতিথি ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে থাকছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আরিফ আর হোসেন, সাদাত হোসাইন এবং কাজী পিয়াল। পূর্ণাঙ্গ শর্ট ফিল্মে অতিথি ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে থাকবেন আরও অনেকেই, যা পরে যথাসময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। সবকিছু ঠিকঠাক মতো হলে আশা করা যায়, আগামী ২৬ মার্চে ইউটিউবে আমরা দেড় মিনিট লম্বা টিজারটি দেখতে পাব। আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছি দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখতে। আশা করছি, আপনাদের সহযোগিতায় এবং সমর্থনে আমরা ইউটিউবে আমাদের ভিডিওটি ট্রেন্ডিং করাতে পারব। তার মাধ্যমে শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও আমরা চাইতে পারব ফান্ডিং। তাহলে দেখা হচ্ছে ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0