কবিতায় খুঁজি ভালোবাসা
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কবিরা লিখেছেন বিস্তর কবিতা। সেসব কবিতা নিয়ে হয়েছে গান। কেউ কেউ ভালোবাসার মানে খুঁজেছেন কবিতাতেই। এমন তিনজন দম্পতি তিনটি প্রেমের কবিতা পড়ে জানিয়েছেন তাঁদের ভালোবাসার অনুভূতির কথা। একে অপরকে আঁকড়ে ধরে জীবন পার করার গল্প। লিখেছেন হাবিবুল্লাহ সিদ্দিক

সৈয়দ হাসান ইমান ও লায়লা হাসান
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের অভিনয়শিল্পী জনপ্রিয় এই দম্পতি বিবাহিত জীবনের অর্ধশত বছর পার করেছেন। একসঙ্গে এত দিন কাটানোর একটা গল্প দুজনই নানাভাবে প্রকাশ করেছেন। কবিতা পছন্দ করতে বলায় বরাবরের মতো এই দম্পতি ঠাঁই নিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। সঞ্চয়িতার ‘স্মৃতি’ নামের কবিতাটি মিলিয়ে নিলেন নিজেদের জীবনের সঙ্গে। লায়লা হাসান বললেন, ‘আমাদের কথাগুলোই যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গেছেন। “ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি।’ আমরা একসঙ্গে এত বছর পার করেছি সেটা হাসান ইমামকে দেখলেই মনে পড়ে।’ দাম্পত্য জীবনের এসবই মনে হয়।
কবিতার শেষের লাইনটার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমরা তো নানা ধরনের চড়াই-উতরাই পার করে চলেছি। সামনে হয়তো বিলীনও হয়ে যাব।’
স্মৃতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে
যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি।
সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে,
জন্ম জন্মান্তের যেন বসন্তের গীতি।
যেন গো আমারি তুমি আত্মবিস্মরণ,
অনন্ত কালের মোর সুখ দুঃখ শোক,
কত নব জগতের কুসুমকানন,
কত নব আকাশের চাঁদের আলোক।
কত দিবসের তুমি বিরহের ব্যথা,
কত রজনীর তুমি প্রণয়ের লাজ—
সেই হাসি সেই অশ্রু সেই-সব কথা
মধুর মুরতি ধরি দেখা দিল আজ।
তোমার মুখেতে চেয়ে তাই নিশিদিন
জীবন সুদূরে যেন হতেছে বিলীন।

এস আই টুটুল ও তানিয়া আহমেদ
একজন সংগীতশিল্পী আরেকজন অভিনেত্রী ও নির্মাতা। দুজনের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘদিনের। তবুও দুজনের মধ্যে ভালোবাসার কমতি নেই। এস আই টুটুল বললেন, ‘ভালোবাসার জায়গায় আমরা এখনো অটুট। দুজনের প্রতি আগের মতোই কেয়ারিং। দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় আমরা বাসাতেই থাকি। বাকি সময় কেউ বাইরে গেলে আরেকজন ঘরে থাকি। কপোত-কপোতীর মতো ব্যাপারটা। একজন ঘরে থাকলে আরেকজন বাইরে যাই খাবারের সন্ধানে। হা হা হা।’
সবশেষে এস আই টুটুল শোনালেন কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া ও তানিয়া আহমেদ পরিচালিত ভালোবাসা এমনই হয় চলচ্চিত্রের একটি গানের কথা। ‘আমি নদীর জল, তুমি পূজার ফুল, ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুজন ভাসব এ কুল-ও কুল। ভালোবাসা বুঝ এমনই হয়, এমনই হয়।’
‘আমাদের ভালোবাসা এমনই।’ যোগ করেন তানিয়া আহমেদ।
এ কেমন ভ্রান্তি আমার
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
এ কেমন ভ্রান্তি আমার!
এলে মনে হয় দূরে স’রে আছো, বহুদূরে,
দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে আকাশ।
এলে মনে হয় অন্যরকম জল হাওয়া, প্রকৃতি,
অন্য ভূগোল, বিষুবরেখারা সব অন্য অর্থবহ—
তুমি এলে মনে হয় আকাশে জলের ঘ্রাণ।
হাত রাখলেই মনে হয় স্পর্শহীন করতল রেখেছো চুলে,
স্নেহ-পলাতক দারুণ রুক্ষ আঙুল।
তাকালেই মনে হয় বিপরীত চোখে চেয়ে আছো,
সমর্পণ ফিরে যাচ্ছে নগ্ন পায়ে একাকী বিষাদ-ক্লান্ত
করুণ ছায়ার মতো ছায়া থেকে প্রতিচ্ছায়ে।
এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি...
কুশল শুধালে মনে হয় তুমি আসোনি
পাশে বসলেও মনে হয় তুমি আসোনি।
করাঘাত শুনে মনে হয় তুমি এসেছো,
দুয়ার খুল্লেই মনে হয় তুমি আসোনি।
আসবে বললে মনে হয় অগ্রিম বিপদবার্তা,
আবহাওয়া সংকেত, আট, নয়, নিম্নচাপ, উত্তর, পশ্চিম—
এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি।
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে,
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবনে আছো।

আশফাক নিপুন ও এলিটা
কবিতা পছন্দ করার পর নির্মাতা আশফাক নিপুন নিজের মতো লিখলেন কিছু কথা। হতে পারে এটা তাঁর স্ত্রী সংগীতশিল্পী এলিটার জন্য সারপ্রাইজ—
গল্প, উপন্যাসে পড়তে পড়তে বড় হয়েছি প্রথম প্রেমই মহৎ প্রেম, প্রথম প্রেমের অনুভূতিই মহত্তম। বিশ্বাসও করতাম তাই। প্রথম প্রেম করেছি, যখন আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। দুর্নিবার প্রেম, আবেগের আতিশয্যে ভেসে যাওয়া প্রেম। শুনেছি প্রেমের মরা জলে ডুবে না। তবে আমি ডুবে গেছি তার অল্প কয়দিন পরেই। মানে ব্রেকআপ হয়ে গেছে।
এরপরে প্রেম করেছি, ডুবেছি, আবার করেছি, আবার ডুবেছি, বারবার করেছি, বারবার ডুবেছি। শেষবার প্রায় বছর আটেক আগে ডুবতে গিয়ে ঠিক করেছিলাম প্রেমে ভাসাভাসির মধ্যে আমি আর নাই, আমি ডুবে যাওয়াতেই পারদর্শী!
ভুলটা ভাঙল পরের বছর এলিটাকে দেখার পরে। দেখতাম ওনাকে আগে থেকেই, পত্রিকার পাতায়, টিভির পর্দায়, কনসার্টের স্টেজে। কিন্তু যেদিন প্রথম আলাপ হলো মুখোমুখি, সেদিন পানির নিচে ছটফট শুরু করলাম ভেসে ওঠার জন্য। বুঝতে পারলাম আমাকে ভাসতে হবে, এলিটাকে নিয়েই ভাসতে হবে।
ভেসে উঠলাম। বলা ভালো এলিটাই টেনে ওঠাল। তখন থেকে ভাসছি আর উড়ছি! সবাই বলে প্রথম প্রেমের তুলনা হয় না। আমি বলি শেষ প্রেমের কোনো তুলনা হয় না। সব ভালো তার শেষ ভালো যার। আমরা দুই শালিক বেশ ভালো আছি।
এবারই প্রথম তুমি
নির্মলেন্দু গুেণ
ভুলে যাও তুমি পূর্বেও ছিলে
মনে করো এই বিশ্ব নিখিলে
এবারই প্রথম তুমি।
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না
ছিলে না আকাশে, নদী জলে ঘাসে
ছিলে না পাথরে ঝর্ণার পাশে।
এবারই প্রথম তুমি।
এর আগে তুমি কিছুতে ছিলে না।
ফুলেও ছিলে না, ফলেও ছিলে না
নাকে মুখে চোখে চুলেও ছিলে না।
এবারই প্রথম তুমি।
এর আগে তুমি এখানে ছিলে না
এর আগে তুমি সেখানে ছিলে না
এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না।
এবারই প্রথম তুমি।
রাতের পুণ্য লগনে ছিলে না
নীল নবঘন গগনে ছিলে না।
এবারই প্রথম তুমি।
এর আগে তুমি তুমিও ছিলে না।
এবারই প্রথম তুমি।