default-image

ব্যক্তি আর অভিনেত্রী একাকার

মেয়ের অভিভাবকত্ব চেয়ে ২০১৭-এর আগস্টে আমি মামলা করি। ২০১৮-এর আগস্টে মামলার রায় হয়। রায়ে আমি জয়ী হই। আমার মেয়ের অভিভাবকত্ব পাই। আইনি লড়াইয়ে এমন বিজয়ের ঘটনা বাংলাদেশে বিরল। ২০১৮ সালে এসে আমি ঠিক করি, এত দিন যা কিছু করে এসেছি, তা আর করব না। বিয়ে, বিচ্ছেদ, আইনি লড়াই, তারকা জীবন—সব পার করে নিজের সব মনোবল জড়ো করে ঠিক করলাম, জীবনটা আবার গোড়া থেকে শুরু করব। ঠিক করলাম, কেবল টাকার জন্য আর কাজ করব না; যে কাজটা করব, ভালোবেসে করব।

তার আগেই জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত, রায়হান রাফির দহন ছবিতে আমাকে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, চরিত্রটা আমি আর করতে চাই না। হাতে কিন্তু তেমন কাজ ছিল না, তবু দহন ছেড়ে দিলাম। এমন সময় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল রেহানা মরিয়ম নূর-এর কাস্টিং ডিরেক্টর ইয়াসির আল হক। বনানীর একটা কফিশপে আমরা বসলাম। ইয়াসির ওর মোবাইলে আমাকে সিনেমাটার সারসংক্ষেপ পড়তে দিল। গল্প পড়ে আমি সবার আগে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রেহানা কে করছে?’

ইয়াসির বলল, ‘আমি তো রেহানাকে খুঁজতেই এই কফিশপে এসেছি।’

প্রধান চরিত্র! আমি রাজি।

সে বলল, অডিশন দিতে হবে। মেকআপ ছাড়াই নিকেতনে খেলনা ছবির অফিসে যেতে হবে।

আমি এমন একজন মানুষ, জিমেও যে মেকআপ করে উইগ পরে যায়। নিজেকে মেকআপ ছাড়া দেখে আমি অভ্যস্ত নই। এমনভাবে মেকআপ নিলাম, যাতে বোঝা না যায়। ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিকেতনে ওদের অফিসে গিয়ে হাজির হলাম।

ইয়াসির আমাকে দেখেই বলল, ‘আপু আপনার মুখটা ফেসওয়াশ দিয়ে ধুতে হবে।’

আমি সাফ জানিয়ে দিলাম, ‘আমার কাছে কোনো ফেসওয়াশ নেই।’

কোত্থেকে যেন একটা ‘একনি মেনজ’ এনে আমাকে ধরিয়ে দিল ওরা। এই ফেসওয়াশের একটা বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল ওরা। কোথায় জানি তারই একটা নমুনা রয়ে গিয়েছিল।

বললাম, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নাকি তুমি ভাবছ, আমার মাথা খারাপ! ছেলেদের ফেসওয়াশ দিয়ে আমি মুখ ধোব?’

শেষ পর্যন্ত কিন্তু ঠিকই ধুতে হয়েছিল। রেহানা মরিয়ম নূর–এর পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ ওর বোনের একটা স্কার্ফ এনেছিল। সেটা আর রেহানার সোয়েটারটা পরলাম। ঘরে, রাস্তায়, সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে অডিশন দিলাম।

২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি ওরা জানাল, আমি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছি। ওরা আমার সঙ্গে রিহার্সাল করতে চায়। শুনে তো আমি মনে মনে হাসলাম, ‘হাহ, আসছে, রিহার্সাল করবে খুব!’

ডিপ্রেশনে ডিপ্রেশন

রিহার্সালের প্রথম দুই মাস ইয়াসির আমার সঙ্গে খালি গল্প করত আর দূর থেকে তাকিয়ে দেখত সাদ। দেখত যে আমার কী কী পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন আমি কিন্তু অনেক হাত–পা নাড়িয়ে, চোখ ঘুরিয়ে কথা বলি। কিন্তু রেহানা চরিত্রটা খুবই শান্ত। এভাবেই চলছিল। ইয়াসিরের সঙ্গে নানা কিছু নিয়ে গল্প করি। আড্ডা দিই। আর দূর থেকে দেখে সাদ। ২০১৯-এর এপ্রিলে লাইভ ফ্রম ঢাকা মুক্তি পাবে।

সাদ বলল, ‘সময় থাকলে ছবিটা দেখতে পারো।’

আমি খুব একটা পাত্তা না দিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, দেখি।’

প্রথম দিন প্রথম শো দেখলাম। সিনেমা শেষ। টাইটেল কার্ড উঠছে। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তালি দিচ্ছে। বের হয়ে চলে যাচ্ছে। আর ভয়ে আমি নড়তে পারছি না। আমার খালি মনে হচ্ছিল যে এই ছেলে আমাকে ওর পরের ছবিতে লিড ক্যারেক্টারে কাস্ট করেছে! ওরা এই সিনেমার জার্নিতে কোথাও একটা পৌঁছাতে চায়, আর আমি সেই নৌকার মাঝি। সাদের সিনেমা দেখে ওর ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের যে ভার, দায়িত্বের সঙ্গে সেটা নিতে ভয় করছিল। আমি তো তখন এতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। মনে হলো, এই চরিত্র আমি করতে পারব না। ওদের আমি ডোবাতে পারি না। অত ভালো অভিনেত্রী আমি নই।

অক্টোবর থেকে শুটিং শুরু, জুলাইতে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাবার কাছে থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘুরতে নিয়ে যাবে, ওয়ার্ল্ড দেখাতে নিয়ে যাবে—এগুলো বলে মেয়েকে ওর কাছে থাকতে প্রলুব্ধ করেছিল আমার সাবেক স্বামী। এটা তাই আমার জীবনের একটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে আমিই আমার মেয়েকে ওই জায়গাগুলোতে নিয়ে যাব। বছরখানেক আগেই প্লেনের টিকিট করে রেখেছিলাম। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ফিরে এসে ডিপ্রেশনে পড়ে গেলাম। অ্যাংজাইটি ইটিংয়ে ১০ কেজি ওজন বেড়ে গেল। তত দিনে রেহানা চরিত্রটা থেকে শারীরিক ও মানসিক, দুই দিক থেকেই আমি অনেক দূরে সরে গেছি।

সাদরা সবাই মিলে বোঝাল, আত্মবিশ্বাস জোগাল, বিশ্বাস করাল যে আমি পারব। তখন আমি রাজি হলাম। এরপর রিহার্সাল শুরু করলাম, টানা এক মাস। ওই সময় বাড়তি ওজনও ঝরিয়ে ফেললাম। পুরো শুটিং ইউনিট কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে চলে গেলাম। শুরু হলো জীবনের প্রথম হোস্টেলজীবন।

default-image

পার্স সব সময় ব্যাগে

শুটিংয়ের দিনগুলোতে আমার মেয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ফোন করে চিৎকার করে কাঁদত। এদিকে সাদ বলত, ‘কিছুই হচ্ছে না।’ দেড়টা বছর একটা ছবিকে দেওয়ার পর শুনতে হচ্ছে যে আমার কিছুই হচ্ছে না। সব সময় ওরা আমাকে বিরক্ত করত। এখন বুঝি, ওটা ওরা পরিকল্পনা করেই করত। সব সময় আমাকে তিতিবিরক্ত করে রাখত, চরিত্রের জন্য। জীবনে কোনোদিন থিয়েটার করিনি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিনয় শিখিনি। জাত অভিনেত্রীও আমি নই। ফলে আমার মন ভালো থাকলে সেটা আমার শরীরে, চামড়ায় চলে আসে, স্কিন রিলাক্সড হয়ে যায়। সে জন্য আমাকে ওরা ইচ্ছা করে ডিস্টার্বড রাখত। আমি এত বিরক্ত থাকতাম যে, আমার পার্সটা সব সময় ব্যাগে রাখতাম, যেকোনো সময় যাতে শুটিং ছেড়ে ঢাকা চলে যেতে পারি।

সেটে আমাকে কেউ কখনো হাসতে দেখেনি। বারবার আমার মনে হয়েছে, আমি আর পারছি না। হোস্টেলের সাততলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে এবার মরে যাব। প্রশিক্ষিত অভিনেত্রী আমি নই। ছবিতে আমাকে কয়েকবার জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে হবে। এমনি যদি জোরে জোরে শ্বাস নিই, কৃত্রিম দেখাবে। তাই মেডিকেলের চারপাশে কয়েকবার দৌড়ে চক্কর দিতাম। লাইট, ক্যামেরা রেডি করে রাখত ওরা। হাঁপিয়ে উঠলে দৌড়ে সেটে চলে যেতাম। আর দৃশ্য ধারণ শুরু হতো।

default-image

সাদকে এত খুশি দেখিনি

এই সিনেমায় রেহানার পর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইমু। চরিত্রটির জন্য ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু অডিশন দিয়েছিল। কাউকে পছন্দ হয়নি। এর মধ্যে আমাদের প্রযোজক এহসানুল হক বাবু ওর ছেলেকে নিয়ে একদিন পার্কে গেছে। ন্যানির সঙ্গে ইমুও সেদিন ওই পার্কে গিয়েছিল। বাবুর ছেলের সঙ্গে ও খেলছিল। একবার দেখেই ইমুকে বাবুর পছন্দ হয়ে যায়। বাবু তখনই ওই ন্যানিকে ওর ফোন নম্বর ধরিয়ে দেয়। ইমুর বাবাকে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। ওই দিন ওই ন্যানি যদি ইমুর বাবাকে ফোন নম্বরটা না দিত, আর ওর বাবা যদি বাবুকে ফোন না করত, আমরা ইমুকে পেতাম না। আর ছবিটাও এ রকম হতো না।

ইমু যেদিন অডিশন দিতে আসে, ওই দিনই সাদ ফোনে মেসেজ পাঠাল, ‘আমরা ইমুকে পেয়ে গেছিইইই...।’ জীবনে কোনো দিন সাদকে এত খুশি হতে দেখিনি।

যেদিন আমার আর ইমুর প্রথম দেখা হবে, সাদ ইয়াসিরকে বলল, ‘যাও তো ইমুর জন্য কিছু নিয়ে আসো, যাতে মনে হয়, বাঁধন ওর জন্য এনেছে।’

আমি ব্যাগ থেকে ইমুর জন্য যা যা নিয়ে গিয়েছিলাম, সেগুলো বের করতে করতে বললাম, ‘সাদ, আমি এগুলো এনেছি। আমার ঘরে ইমুর বয়সী একটা মেয়ে আছে। আমি জানি, ওরা কিসে খুশি হয়।’

ইমু কিন্তু ওর মা–বাবাকে ছাড়া সেটে ছিল। ওর সঙ্গে ছিল নানি আর ন্যানি। ওর মা তখন অন্তঃসত্ত্বা।

default-image

শুটিংয়ের পুরোটা সময় ইমুর সামনের দুটো দাঁত নড়বড়ে ছিল। দুটি মাস দাঁত দুটি না ফেলে রাখতে পেরেছে এই মেয়ে। শেষের দিন অবস্থা এমন হলো যে যেকোনো সময় দাঁতটা পড়ে যাবে। খুবই অ্যাগ্রেসিভ, ফিজিক্যাল একটা শট। ও আমাকে কামড় দেবে। আমি ওকে ছুড়ে ফেলব। আমি ওকে বললাম, ‘দাঁত যদি পড়েও যায়, তুমি শট ছাড়বে না। রাগ, জিদ ধরে রেখে দাঁত হাতে নিয়ে ফেলে ডায়ালগ দিবে।’

একটা দৃশ্য আছে, আমি ওকে ঘোরাতে গিয়ে হাত ছিটকে ফেলে দিয়েছি। এমন জোরে ফেলেছি যে ও ছিটকে ফ্রেমের বাইরে চলে গেছে। আমি ভাবছি যে অ্যাকশন ছেড়ে দেব। সবাই টেনশন করছে। পরমুহূর্তেই ও উঠে আরও আগ্রাসী ভঙ্গিতে কোমরে হাত রেখে ঠিকঠাক সংলাপ বলল, ‘আমি যাবই।’

ও হলো সেই পর্যায়ের অভিনয়শিল্পী!

default-image

সাদ কিন্তু কখনো সরাসরি ইমুকে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। আমার মাধ্যমে দিয়েছে। ইমুকে কী করতে হবে, আমাকে বুঝিয়ে দিত সাদ। আমি সেটা ইমুকে বুঝিয়ে দিতাম। ওকে যদি বলতাম, ‘মা, তুমি এই কথাটা এভাবে বলবে, তারপর মনে মনে এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ গুনে গুনে পাঁচবার জোরে থেকে আস্তে নিশ্বাস নেবে। তারপর আবার এই কথাটা বলবে।’ ও একদম ওভাবেই করত। আমরা ভাগ্যবান যে ইমুকে পেয়েছিলাম।

ওয়েলডান, বাঁধন

মুখে পানি দেওয়ার দৃশ্যটায় আমার মনে হয়েছে, আমার জীবনের সব ঘৃণা, হতাশা, উপেক্ষা আমার মুখে লেগে আছে, সেগুলো আমি পানি দিয়ে ধুচ্ছি কিন্তু কিছুতেই যাচ্ছে না। আমি যে থুতুটা ফেললাম, এটা কিন্তু সাদ আমাকে বলেনি। আমার ভেতর থেকে অনুভব হয়েছে যে আমি এখন থুতুটা ফেলব। সারা জীবনে যত মানুষ আমাকে ঘৃণা, উপেক্ষা আর অবহেলা করেছে, আমার জীবনকে ক্রমশ কঠিন করে দিয়েছে, তাদের সবার মুখের ওপর আমার সেই থুতু।

এই শটের পর সেটের কেউ অনেকক্ষণ কথা বলতে পারেনি। সাদ নীরবতা ভেঙে আস্তে করে বলেছে, ‘ওয়েলডান।’

আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে, এগুলোর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, এগুলো না হলে আমি রেহানা হতে পারতাম না। আর শেষ দৃশ্যের একদম আগে, সাদ আমাকে বলল, ‘তুমি ইমুর দিকে তাকিয়ে বলবা, যে তুমি যাবা না। ইমু যেতে পারবে না। আর এই দৃশ্যে কাঁদতে পারবা না। লং শট। কেঁদে দৃশ্য নষ্ট করতে পারবা না।’

শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি। এটা একটা মায়ের পক্ষে কীভাবে সম্ভব! একটা মা কীভাবে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! আমি বারবার সাদকে বলেছি, ‘আমি একটা মা। আমি এটা করতে পারব না।’ সিনেমায় দেখা যায় যে বারবার আমি মেয়ের দিকে তাকাচ্ছি কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। ওটা কোনো অভিনয় ছিল না। আমি আসলেই বারবার বলতে গিয়েও গিলে ফেলেছি। অনেক চেষ্টা করে সব শক্তি জড়ো করে যখন বললাম, মনে হলো, আমি শূন্য হয়ে গেলাম। আমার ভেতরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। হাতের ওপর দরজা লাগিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটা তো আমি কোনো অবস্থায় করতে চাইনি।

default-image

২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুটিং শেষ হলো। ছবির বেশির ভাগইছিল লাইভ সাউন্ড, অল্প কিছু ডাবিং। জানুয়ারিতে সেটা করলাম। কিছুদিন পরেই শুরু হলো মহামারি। মার্চ মাসে শুরু হলো লকডাউন। তত দিনে ছবির সম্পাদনার কাজ শেষ। এর মধ্যে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি করলাম।

আমার ইনস্টাগ্রামের ছবি দেখে সৃজিত আমাকে মেসেজ করেছিল। আমি ভেবেছি সত্য নয়। এই জন্য জবাব দিইনি। পরে সৃজিত আমাদের একজন প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিলের মাধ্যমে কনফারেন্স কলের আয়োজন করে। আমি দুপুরে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ কলে যোগ দিয়ে দেখি সত্যি সত্যিই সৃজিত।

বদলে যাওয়া সন্ধ্যা

সেদিন ২৭ মে। দুপুর থেকে ঘুমিয়ে আছি। সন্ধ্যায় মোবাইলে কল। দেখি সাদ। চোখ ডলতে ডলতে ভাবছি, কোনো বিপদ হলো না তো। কেননা, পারতপক্ষে সাদ ফোন করে না। ওর মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপও নেই। দরকারে সে মেসেজ করে। মূলত টেক্সটেই আলাপ হয়। ভয়ে ভয়ে ফোন ধরে বললাম, ‘কী হয়েছে?’

সাদ বলল, ‘তোমার সময় আছে পাঁচ মিনিট? কথা বলা যাবে?’

বিড়বিড় করে বললাম, ‘হ্যাঁ বলো।’

‘একটা কথা ছিল।’

‘কী কথা?’

ও খুবই স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘আমাদের সিনেমা কান চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে।’

শুনে আমি চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুম দৌড়াচ্ছি, লাফাচ্ছি আর চিৎকার করে কাঁদছি! আব্বু–আম্মু পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। তাঁদের ফোন করে জানিয়েছি। তাঁরা প্রথমে ভেবেছেন, আমার কোনো একটা বিপদ হয়েছে।

আমার ভাই কানাডা থাকে। ওখানে তখন ভোর। ও ঘুমিয়ে ছিল। ওকে ফোন করেও চিৎকার করে কান্না। এক সপ্তাহ এই খবর চেপে বসে থাকতে হবে, ৩ জুনের ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত, সেটাও একটা চাপ।

কানে প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে

কিছুদিন আগে কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রেহানা মরিয়ম নূর-এর প্রদর্শনী শেষে একজন প্রশ্ন করেছিল, আমি বিশাল ভরদ্বাজের ছবি খুফিয়া করতে গিয়েও এতটা ইমোশনাল হইনি। কিন্তু রেহানা কেন আমাকে এত আবেগতাড়িত করল।

উত্তরে সত্যি কথাটাই বলেছি, রেহানার সব কষ্ট আমি আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেছি। আমি আর রেহানা পর্দায় লীন হয়ে গেছি। অন্যদিকে খুফিয়ায় আমি চরিত্রটার সংকট বুঝে, অনুভব করে অভিনয় করেছি। রেহানা যখন কানে নির্বাচিত হলো, তখন কীভাবে আমি রেহানা চরিত্রটায় অভিনয় করেছি, সেগুলো আবার আমার ওপর ভর করল। ভীষণ ডিপ্রেশনে পড়ে গেলাম। আমি তো জানি কীভাবে ছবিটা আমি করেছি। সাদ আমাকে বলেছিল যে তুমি যদি এই চরিত্রটা করতে না পারো, বাংলাদেশে আর কেউ পারবে না। কেননা, আর কোনো অভিনেত্রী তাঁর জীবন দিয়ে রেহানার ভেতরটা এত গভীরভাবে অনুভব করতে পারবে না।

ডিপ্রেশন কাটাতে থেরাপিস্টের সঙ্গে কাউন্সেলিং শুরু করলাম। অ্যান্টিডিপ্রেশন পিল শুরু করলাম। থেরাপিস্ট আমাকে বলল, আমার জীবনের ট্রমাগুলোকে কাজে লাগিয়ে চরিত্রটা করেছি। কিন্তু ট্রমাগুলো তো আমাকে ছেড়ে যায়নি। যারা আমাকে বুলি করেছে, দিনের পর দিন অসম্মান করেছে, হেয় করেছে, টর্চার করেছে, হঠাৎ করে তারাই আমাকে ‘খুব ভালো, খুব ভালো’ বলে মাথায় তুলতে লাগল। যেন হঠাৎ করে আমি রসগোল্লা হয়ে আকাশ থেকে পড়লাম। এসব দেখে রাগে, দুঃখে আমার কান্না পেতে লাগল। আর হতাশা বাড়তে লাগল।

কানের পুরো সময়টা আমি ভীষণ ডিপ্রেশনে ছিলাম। দলের প্রত্যেক সদস্য সেটা জানেন। কান চলচ্চিত্র উৎসবে আমি যে পরিমাণ সম্মানিত হয়েছি, আমার মনে হয়েছে, সারা জীবনে আমি যত অসম্মানিত হয়েছি, সেটা সুদে আসলে সৃষ্টিকর্তা উশুল করে দিয়েছেন।

default-image

কোথায় যাচ্ছে, কেন!

আমি যে কাউকে বলব কাপড় বানাতে, তা–ও পারছি না। আমরা ভিসা পেয়ে ঠিকঠাক যেতে পারব কি না, তারই তো ঠিক নেই। তবু যাকে যাকেই বললাম, সবাই পোশাক বানিয়ে দিতে রাজি। আড়ংকে বললাম। জামদানিটা বানানো ছিল। ব্লাউস আর গয়না বানাতে সময় লেগেছে পাঁচ দিন। ভিসা পেলাম আমাদের যেদিন ফ্লাইট, তার আগের দিন বেলা তিনটায়। ২৪ জুন ভিসা পাওয়ার পর বিকেল পাঁচটায় আমরা টিকিট করলাম। ২৫ তারিখ ফ্লাইট। ওই দিন না গেলে আর যাওয়া হবে না। কারণ, আমাদের গিয়ে দশ দিন আবার কোয়ারেন্টিন করতে হবে।

ভোর চারটায় ফ্লাইট। আগের দিন রাত নয়টায় পেলাম আড়ংয়ের শাড়ি। ব্যাগ গোছাতে গিয়ে পুরো বাসা লন্ডভন্ড করে ফেলেছি। এয়ারপোর্টে কাতার এয়ারলাইনসে গেছি। ওদের ফ্রান্স থেকে কনফার্ম করতে হবে যে আমরা কেন যাব, আর যাওয়ার পর ওরা ঢুকতে দেবে কি না। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পুলিশ তো বুঝতেই পারছে না, সাতটা ছেলে আর একটা মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে! আমরা কোনো পোস্টও দিতে পারছি না, ফ্রান্সের ইমিগ্রেশন যদি ফেরত পাঠিয়ে দেয়!

default-image

ফ্রান্সে গিয়ে তো দেখি হুলুস্থল অবস্থা। খুব সম্মান দিয়ে ওরা আমাদের বের করে নিয়ে গেল। নিরিবিলি থাকা যাবে, বাগান আছে, মূল শহর থেকে দূরে, এমন একটা বাসা আগে থেকেই ভাড়া করে রেখেছিল সাদ। ওই বাসায় উঠে ব্যাকইয়ার্ডে একটা ছবি তুলে আমরা পোস্ট দিলাম। যথারীতি ওই ছবিতেও সাদকে রাখা গেল না। জানাল, ও ফ্রেমে থাকবে না।

বললাম, ছবিটা অন্তত তুলে দাও। কোনো একটা কাজে অন্তত লাগো।

কোয়ারেন্টিনের ওই দশটা দিন ছিল খুব সুন্দর। বেশির ভাগ সময় প্রোডাকশন ডিজাইনার আলী আফজাল উজ্জ্বল রান্না করেছে। আমিও রান্না করেছি। ওই বাসায় উঠেই সাদের জ্বর চলে এল। ওখানে তো র‍্যানডম চেকিং হয়। করোনা টেস্টে নেগেটিভ এল। কিন্তু এদিকে কাঁপুনি দিয়ে ভয়াবহ জ্বর আসছে। প্রতিদিন আমি জগিংয়ে যেতাম। আমাকে মরাল সাপোর্ট দিতে আমার সঙ্গে ওরাও দৌড়াত।

থেকে থেকেই ডিপ্রেশন আমাকে জড়িয়ে ধরত। পেছনের বাগানে গিয়ে বসে বসে তখন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতাম। সবার মধ্যে থেকেও হুটহাট আমার ভীষণ একা লাগত। মন খারাপ লাগত। মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি নামত। তখন মনে হতো, প্রকৃতির মনের অবস্থাও বুঝি আমারই মতো। একেক দিন একেক দিকে হাঁটতাম, দৌড়াতাম। আর নিজের সঙ্গে কথা বলতাম। ওখানে তো কেউ আমাকে চেনে না। ভাষাও অজানা। তাই দিব্যি নিজের সঙ্গে কথা বলা যেত।

default-image

একদিন বাইরে বারবিকিউ করলাম আমরা। এর মধ্যেই জ্বর সাদকে ছেড়ে গেল। ১০ দিন পর সবার করোনা টেস্ট। টেনশনে ছিলাম। আমাদের যেকোনো একজনের পজিটিভ এলেও কেউ উৎসবে অংশ নিতে পারব না। আমরা সবাই যে একই বাসায় থাকি। নেগেটিভ রেজাল্ট পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ট্রেনে করে কানে গিয়ে পৌঁছালাম। আমি আর সাদ ছিলাম ম্যারিয়টে, বাকি সবাই অন্য হোটেলে।

জীবনে একমাত্র সুযোগও হারালাম

৬ জুলাই ৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী, রেড কার্পেট। আমি, সাদ, বাবু আর রেহানার প্রযোজক জেরেমি চুয়া দাওয়াত পেয়েছি। মানে ৯ জনের দলের ৪ জন যেতে পারব। এদিকে সাদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে গেলে সবাই যাব। নইলে কেউ যাব না। এখন সবাই যাওয়া তো সম্ভব না। তাই ঠিক হলো, কেউ–ই যাব না।

এই সিদ্ধান্তে আমি ভীষণ মনঃক্ষুণ্ন হলাম, বিদ্রোহ ঘোষণা করলাম। কারণ, সাদ আর সাদের টিম তো অস্কারেও যেতে পারবে। কিন্তু আমার মতো একজন বাঁধনের জন্য এমন সুযোগ ‘ওয়ানস ইন আ লাইফটাইম’। আসলে আমার খারাপ লাগল যে এ রকম একটি সিদ্ধান্ত সাদ আমার সঙ্গে একবারও আলাপ না করেই নিয়েছে। বুঝি, সাদ আর বাকিরা সবাই মিলে একটা সত্তা। সবাইকে না নিয়ে যাওয়া মানে সাদের অর্ধেকটা রেখে যাওয়া। কিন্তু আমি তো শিল্পী। ওদের সিনেমা বানানোর দলের একজন নই। আমার ব্যাপারটা তো আলাদা।

বাধ্য হয়ে সাদ বলল, ‘তুমি যাও।’ আমি তো আর একা একা যাব না। গেলে আমার পরিচালক আর প্রযোজকদের নিয়েই যাব। তাই মিস হয়ে গেল যে সুযোগ জীবনে একবারই আসে। সবাই সুন্দর জামাকাপড় পরে রেড কার্পেটে হাঁটল। আমি সেই সুযোগ হারালাম।

বিকেলে আমাদের সিঙ্গাপুরের প্রযোজক জেরেমি চুয়ার সঙ্গে দেখা হলো। সেই আমাদের প্রথম দেখা। ছোটখাটো, সুন্দর একটা ছেলে। হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। ওকে দেখে আমার বিষণ্নতায় ভারী মনটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। জেরেমির সঙ্গে আমার এর আগে জীবনে হাই–হ্যালোও হয়নি। কেননা সে কাস্টিং বা অভিনয়ের ভেতর ছিলই না। অল্প সময়েই ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

default-image

এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

৭ জুলাই কানে আমাদের ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। সাদ তো ভীষণ টেনশনে। সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করতে লাইট বিশেষজ্ঞ, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে গেল সাদ। এদিকে আমিও ভোরে উঠেই তৈরি হচ্ছি। কারণ, কিছুতেই আমার দেরি করা চলবে না। আগে আগেই সব আনুষ্ঠানিকতা সারতে হবে।

আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, জামাকাপড় বা সাজগোজ নিয়ে এদিন কোনো পরীক্ষা–নিরীক্ষা করব না। যে সাজে মানুষ আমাকে দেখে অভ্যস্ত, আমি নিজেকে বহন করে অভ্যস্ত, সেভাবেই হাজির হব। হালকা জলপাই রঙের জামদানিটা পরলাম। চোখভরে কাজল নিলাম। চুলটা খোঁপা করলাম। বাঙালি মেয়ের সবচেয়ে চেনা লুক। অল্প সময়ে সাজগোজ শেষ করে নিজেকে আয়নায় দেখলাম। আমার সঙ্গে যারা ছিল, কেউ কিছু বলল না। কারণ, ওরা সবাই একটা মেয়েকে এভাবেই সবচেয়ে বেশি দেখেছে। একজন বলল, ‘শেষ? ওকে চলো এগোই।’

করিডর ধরে এগোনোর সময়, দু–একজন বিদেশি যারা ছিল, বারবার ওরা তাকাচ্ছিল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে যখন এগোচ্ছি, আমাদের দলে আরও কয়েকজন যোগ দিল। জেরেমি আর ফিল্ম বুটিকের ওরা দেখি আমার ছবি তুলছে। আর বলল, ‘ওয়াও, বিউটিফুল। তুমি যেটা পরেছ, এটা কী? এর নাম কী? তোমাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। কানে এ রকম লুক দেখাই যায় না।’

শুনে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। পরে আমার দলের ওদের অভিমান ভরে বললাম, ‘তোমরা তো আমাকে কিছুই বললে না। সুন্দর লাগছে আপু। বা এ রকম কিছু।’ ওরা ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, ‘কী বলব, আমরা তো তোমাকে, অন্য মেয়েদেরকে সব সময় এভাবেই দেখি।’

উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। কুশল বিনিময় হলো।

default-image

সিনেমা শুরু হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসছে, খুশি মিলিয়ে সেখানে ভর করতে থাকল ভয়। আমাদের তো হাত–পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেল। একফাঁকে আমরা সবাই মিলে লালগালিচায় ছবি তুললাম। একা যে একটা ছবি তুলব, সেটাও তখন মাথায় নেই। এরপর এল আমাদের জীবনের সেই মুহূর্ত। সন্তান হওয়ার পর সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। ১ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের ভিডিওতে বাংলাদেশ দেখল, আমি কাঁদছি। আর আশপাশে সবাই দাঁড়িয়ে তালি দিচ্ছে। সাদ আমাকে ধরে রেখেছে। কেবল আমি নই, ওই সময় আমার সঙ্গে অনেকেই কেঁদেছে। পর্দায় রেহানার কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের জীবন মেলাতে পেরেছে। অনেক বয়স্ক এক ফরাসি নারী অনেক দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এলেন। আমরা তখন বেরিয়ে যাব। সেই মুহূর্তে তিনি আমাকে ধরে ফেললেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না। আমি, রেহানা আর ওই নারী ওই মুহূর্তে একসঙ্গে সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি। আসলে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই নারীর বাস্তবতা অনেকটাই এক। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম—যেগুলো স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শিখিয়েছে, সেগুলো যে অন্যায়, রেহানা দেখার পর তা স্পষ্ট হয়ে যায়। নিজের জীবনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই অন্যায়গুলো তীব্র যন্ত্রণা হয়ে ভেতর থেকে হাহাকার করে কেঁদে ওঠে।

প্রিমিয়ারের পর ফিল্ম বুটিকের পক্ষ থেকে ডিনার ছিল। ওখানেও অনেকে এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি তো দেখেছি ছবিটা। তোমাদের হলে ছিলাম। তুমি তো দারুণ অভিনয় করেছ। তুমি তো খুব সুন্দর।’

ডিনার শেষে হোটেলে ফিরে আমাদের সে কী আনন্দ!

default-image

ফটোকলে গিয়ে বোকা

৮ জুলাই আমরা বিশ্রাম নিয়েছি। ৯ তারিখ ছিল ফটোকল। সাদকে কয়েকটা পোশাকের ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা পরব? ওয়াইন কালারের ভেলভেটের পোশাকটা পরতে বলল ও। আমি পরলাম।

ফটোকল নিয়ে আমার তেমন ধারণা ছিল না। ওখানে গিয়ে তো আমি বোকা বনে গেলাম। গাড়ি থেকে নামছি। দূর থেকে ফটোগ্রাফাররা ওদের উচ্চারণে আমার নাম ধরে ডাকছে, ‘আজমেরী!’ আজমেরী!’ আমার নাম যে আজমেরী, এটাই তো আমার মাথায় নেই।

সাদ ইশারা করে দেখাল, ‘ওই দেখো, তোমাকে ডাকছে। তুমি তো সুপারস্টার!’

গিয়ে দেখি এলাহি কারবার। আমার সঙ্গে শুট ওরা খুবই এনজয় করছে। জেরেমি তো অবাক। ও সাদকে বলে, ‘ওয়াও, আজমেরী তো খুবই ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি। ক্যামেরার সঙ্গে তো ওর প্রেম আছে। আর সেটা একপক্ষীয় না! নতুন একটা জায়গায় কাউকে চেনে না, অথচ ফটোশুট দেখে মনে হচ্ছে একটা ফ্যামিলি রি–ইউনিয়ন।’

সাদ কেবল বলেছিল, ‘ও কত বছর ধরে মডেলিং করে তুমি জানো?’

১০ তারিখ একটা ছবির প্রিমিয়ার ছিল। যেহেতু পুরো দল ছাড়া আমরা ৬ তারিখ রেড কার্পেটে যাইনি, তাই আমাদের ৯ জনের টিমের জন্য ওরা একটা বিশেষ রেড কার্পেটের ব্যবস্থা করে। থিয়েরি ফ্রেমো অনুমোদন দিয়েছিল। ওই দিন আমি সুমি নাসরিনের ডিজাইন করা হালকা বেগুনি অফ শোল্ডার মসলিনের ড্রেসটা পরি।

পরের দিনগুলোতে আমরা কিছু সিনেমা দেখেছি।

default-image

একটা আফসোস

১৩ জুলাই আমরা মজা করেছি। পাশেই যে সমুদ্রসৈকত, বাবু ওই দিন সেখানে লুঙ্গি নিয়ে গিয়েছিল। পেতে বসার জন্য। কিংবা গোসল দিলে চেঞ্জ করে নেবে, তাই। বললাম, এনেছই যখন, পরে ফেলো। আমরা একটা ছবি তুলি। ওই দিন আমরা রাত পর্যন্ত সাগরপাড়ে সময় কাটিয়েছি। ওই দিন রাতেই জেরেমি জানাল, ও ভারতীয় পরিচালক অনুরাগ কশ্যপের সঙ্গে একটা মিটিংয়ের ব্যবস্থা করে দেবে।

পরদিন অনুরাগের সঙ্গে দেখা। দূর থেকেই আমাকে দেখে হাই দিয়ে বললেন, ‘রেহানা দেখেছি। খুব ভালো করেছ।’

অনেক কথা বললেন। খুবই ফ্রেন্ডলি। তারপর আমরা সবাই পাশের একটা রেস্তোরাঁয় বসলাম। আরও অনেকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন। ভ্যারাইটির সাংবাদিক। সেখানেই বলিউডের পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের খুফিয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক আলাপ করেন অনুরাগ।

default-image

১৫ জুলাই সকালে হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা কবরস্থানে চলে যাই। যত দূর চোখ যায়, শুধু কবর আর কবর। জগিং করতে গিয়ে, একটা পাহাড়ের ওপর থেকে ওই কবরস্থানটা আমি আগের দিন দেখেছিলাম। তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম যে পরদিন ওখানে যাব। মুসলমান নারী হিসেবে এমনিতে তো আমাদের গোরস্তানে যাওয়ার সুযোগ হয় না। মনে হলো, ওখানে গিয়ে নিজের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ পাব। ওই সময় গোরস্তানে প্রায় কেউ ছিল না। আমি একাই ছিলাম। সমস্ত গোরস্তানটা ঘুরে ঘুরে দেখেছি। প্রতিটা কবরে শুয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। নিজের সঙ্গে কথা বলেছি।

পরে আমরা আসগর ফারহাদির আ হিরো দেখতে গেলাম। চাইলে আমরা ওনার খুব কাছেই বসতে পারতাম। কিন্তু সাদ নাকি তাঁর পাশে বসলে সিনেমাটা ঠিকমতো দেখতে পারবে না। ও দোতলায় উঠে গেল। আমরাও ওর পিছু পিছু দোতলায় উঠে গেলাম। আমার ভীষণ আফসোস হলো। কেন আমি আসগর ফারহাদির পাশে বসলাম না। তাঁর সঙ্গে দুটো কথা বললাম না, একটা ছবি তুললাম না।

default-image

ফেস্টিভ্যাল লাঞ্চ, গালা ডিনার

১৬ তারিখ আমাদের ফেস্টিভ্যাল লাঞ্চ। যাকে দেখি, তার সঙ্গেই কথা বলতে, ছবি তুলতে ইচ্ছা করে। আমাকে এ রকম ছটফট করতে দেখে সাদ একবার সাবধান করে দিল, ‘দেখো, হুট করে কাউকে গিয়ে বলে বসো না, আমি আপনার সঙ্গে ছবি তুলতে পারি? এদের প্রটোকলে ঝামেলা হতে পারে। পরে তোমাকে ডেকে সুন্দর করে হাসতে হাসতে নিয়ম–কানুন নিয়ে লেকচার দেবে। তুমি কাঁদতে শুরু করবে।’

আমি উল্টো জেদ ধরে বললাম, ‘মনে করো তোমরা আমাকে চেনো না। আমার জীবনে এ রকম সময় আর আসবে না। সবাইকে হাই বলে সবার সঙ্গেই আমি ছবি তুলব।’

কথাটা বলে যে–ই না পাশে তাকিয়েছি, দেখি মার্কিন অভিনেতা বিল মারে। তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। না হয়ে উপায়ই বা কী! আমি তো হাঁ করে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছি। অন্যরা যাতে বুঝতে না পারে, এমনভাবে ফিসফিস করে সাদ আমাকে নিষেধ করল, ‘না, বাঁধন না।’ কিন্তু বিল মারে একবার তাকিয়েই আমার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। উনি নিজেই আমার দিয়ে এগিয়ে এলেন। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘হাই আ’ম বিল মারে।’

default-image

আমি তো আইসক্রিমের মতো গলে গেছি। সাদকে একটা ধাক্কা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘ছবি তোলো।’ ওকে তখন আমি চিনিই না। ও আমার ডিরেক্টর না কী, কিচ্ছু মাথায় নেই। কোনোরকমে কেবল বিল মারেকে বললাম, ‘মে আই হ্যাভ আ ফটো উইথ ইউ?’

তাঁর দিকে কীভাবে তাকিয়েছি, কী অনুভব করেছি, ছবিতে তা ধরা আছে।

১৭ জুলাই গালা ডিনার। শেষ দিনেও আমি সুমি নাসরিনের ডিজাইন করা লাল রঙের মসলিনের গাউন পরি। এর আগে সন্ধ্যায় পুরস্কার ঘোষণা। ওই অনুষ্ঠানে যাব কি যাব না, ভাবছিলাম। সাদ বলল, ‘আমরা যদি পুরস্কার না পাই, অন্যরা যারা পাবে, ওদের জন্য হাততালি দিতে যাব।’

ওই দিন সবার দাওয়াত। আমাদের সব জুরিরাও ছিলেন। একজন জুরি, মার্কিন প্রযোজক ও অভিনেতা মাইকেল অ্যাঞ্জেলো কোভিনো নিজে এগিয়ে এসে সাদকে জানিয়ে গেছে যে ছবিটা ওদের কত ভালো লেগেছে।

এরপর আমার দেখা হলো সেমিহ কাপলানোগ্লু আর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। চোখাচোখি হতেই বললাম, ‘হাই, আমি বাঁধন। রেহানার রেহানা।’ ওরা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে কথা বলল। আগে জানতাম না, পরে জেরেমি আমাকে জানিয়েছিল, তিনি অনেক বড় তুর্কি পরিচালক। তাঁদের পাশে বসেই আমি ডিনার করেছি। তাঁদের সঙ্গে আমার জীবনের সব দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়েছি। ফেস্টিভ্যাল লাঞ্চ আর গালা ডিনার—দুই দিনই জেরেমি ভিডিও করে দিয়েছিল। আমি আপলোড করেছিলাম।

ওই দিনও বিচারকদের সঙ্গে কথা হলো। লাইভেই আলজেরিয়ান পরিচালক মুনিয়া মেদুর বললেন, ‘পুরস্কার না পাওয়ার জন্য মন খারাপ করো না। তোমাদের ছবিটা খুব ভালো হয়েছে। তোমার অভিনয় আমাদের সবাইকে স্পর্শ করেছে।’ আমি বললাম, ‘আমি খুবই খুশি। পুরস্কার না পাওয়ায় একটুও মন খারাপ করিনি। এই কি যথেষ্ট নয়!’

এভাবেই শেষ হলো আমাদের কানযাত্রা।

দেশে ফিরে আসার পর আমার মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে লাফাতে লাফাতে বলল, ‘মা, তুমি তো ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি হয়ে গেলে। মা, ইউ রকড।’

আমার জীবনের সব অর্জন একপাশে, আর আমার মেয়ের খুশি আরেক পাশে। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি আমার মাকে কোনো দিন জিততে দেখিনি, কিন্তু আমার সন্তান তার মাকে জিততে দেখেছে।

রেহানা, আমি তোমাকে বলতে চাই, ওপরের সব ঘটনা ঘটেছে তোমার কারণে। তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমি তাই বাকি জীবন তোমাকে সঙ্গী করে পাড়ি দিতে চাই, আনন্দ আর দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে চাই। তোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে চাই, ‘থ্যাংক ইউ।’

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন