গানে-কবিতায়-নৃত্যে বিজয় উৎসব

রাজধানীজুড়ে গতকাল সোমবার ছিল লাল-সবুজের উপস্থিতি। সকাল থেকে সারা দিন বিরামহীন দেশাত্মবোধক গানের সুর শোনা গেছে। সবুজ জমিনে লাল পাড়ের শাড়ি জড়ানো নারী আর সবুজ পাঞ্জাবি গায়ে পুরুষেরা রাজপথে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ট্রাক কিংবা ভ্যানগাড়িতে চড়ে গলা ছেড়ে গেয়েছেন তরুণেরা। অনেকে ভিড় করেছেন নগরের সংস্কৃতিকেন্দ্রগুলোতে। সেখানে মুখরিত ছিল দেশের গান, কবিতা, আলোচনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও দেশের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনায়। গান, কবিতা, নাটক আর কথামালায় তাঁরা স্মরণ করেন আমাদের আলোকবর্তিকাদের। নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে বিজয়ের রঙে রঙিন হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেকেই একটাই দাবি তুললেন ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই, অসাম্প্রদায়িক দেশ চাই’।

বাংলা একাডেমির আয়োজন

সকালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের নেতৃত্বে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিকেলে একাডেমির রবীন্দ্রচত্বরে মহান বিজয় দিবস স্মারক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন শামসুজ্জামান খান। মুক্তিযুদ্ধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও ইতিহাসের অধিকার শীর্ষক বক্তৃতা দেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
আলোচনার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিজয় মঞ্চের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী কল্যাণী ঘোষ এবং মনোরঞ্জন ঘোষালের নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

জোটের বিজয় উৎসব চলছে

শুরুটা ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে। ওই বছর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট প্রথম বিজয় উৎসবের আয়োজন করে। এর পর থেকে প্রতিবছর হয়ে আসছে। জোটের এই আয়োজন মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয় উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত। এই আয়োজনে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা লাখো শহীদকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। জোট আয়োজিত বিজয় উৎসবের গতকাল ছিল তৃতীয় দিন।
গতকাল শহীদ মিনারে সমবেত সংগীত পরিবেশন করে ক্রান্তি, নিবেদন, দৃষ্টি ও সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে কণ্ঠশীলন, স্বরশ্রুতি, সংবৃতা ও ঢাকা স্বরকল্পন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যম। একক সংগীত পরিবেশন করেন মনোরঞ্জন ঘোষাল, বুলবুল মহলানবীশ, তানিয়া মান্নান, বিশ্বজিৎ, হাবিবুল আলম, মাহবুব রিয়াজ, এস এম মেজবা প্রমুখ। পথনাটক পরিবেশন করে মৈত্রী থিয়েটার ও দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ।
এ ছাড়াও রাজধানীর আরও ১১টি মঞ্চে ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন।

ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশনা  ছবি: প্রথম আলো
ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশনা ছবি: প্রথম আলো

ছায়ানটে বিজয় উৎসব
বিজয় দিবসের আনন্দ পৌঁছে গিয়েছিল ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে। গতকাল সন্ধ্যায় নিজস্ব মিলনায়তনে ছায়ানট সংগীতানুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের শুরুতে ছায়ানটের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’ এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ দুটি গান। এরপর প্রদর্শিত হয় সেন্টু রায় নির্মিত তথ্যচিত্র তোমারি তরে মা।

মানবাধিকার দিবস থেকে বিজয় দিবস

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ‘মানবাধিকার দিবস থেকে বিজয় দিবস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানমালার শেষ দিন ছিল গতকাল। এদিন জাদুঘর চত্বরে সকালে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় সোসাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেন, কল্পরেখা, খেলাঘর, ইউসেপ স্কুল ও নৃত্যশ্রী।
মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্মৃতিচারণা করেন এ বধ্যভূমিতে শহীদদের সন্তানেরা। এরপর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয় চারুলতা একাডেমি, কথাসুর সাংস্কৃতিক সংগঠন, মিথস্ক্রিয়া আবৃত্তি পরিষদ, নৃত্যাঙ্গন, বধ্যভূমির সন্তান দল, সপ্তডিঙ্গা গণসংগীত ও মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম।

শেষ হলো ‘বিজয় নিশান’

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও অপরাপর সমমনা সংগঠনগুলোর আয়োজনে তিন দিনব্যাপী বিজয় উদ্যাপন অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। ‘লোহিত বিজয় নিশান হাতে জেগে ওঠো অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার শেষ দিন ছিল সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও বইমেলা।
গতকাল বিকেলে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শেষ দিনের আয়োজন শুরু হয়। এরপর বিকেল চারটা ৩১ মিনিটে গোটা বিশ্বের বাঙালিদের সঙ্গে শাহবাগে জাতীয় সংগীতে গলা মেলান আয়োজকেরা। তারপর ‘বিজয় নিশান’-এর উদ্যোগে একটি প্রতিবাদী পদযাত্রা বের হয়ে হাকিম চত্বরে গিয়ে মূল অনুষ্ঠানস্থলে মিলিত হয়। পরে গণসংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা। তাঁরা পরিবেশন করেন ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ প্রভৃতি গান। এরপর দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের শিল্পীরা। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ছিল বইমেলা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, গীতিনাট্য, পারফর্মিং আর্ট ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।

গ্রুপ থিয়েটারের আয়োজন সাভারে

সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের মুক্তমঞ্চে নানা আয়োজনে মধ্য দিয়ে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন বিজয় দিবস উদ্যাপন করে। অনুষ্ঠানে নাটক পরিবেশন করে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, বুনন থিয়েটার ও নিরাভরণ থিয়েটার। আবৃত্তি, নৃত্য ও দেশের গান পরিবেশন করে জাহাঙ্গীরনগর গীতনাট। আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য আফসার আহমেদ।
ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আকতারুজ্জামান, নাট্যকার আনন জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মীর জাহিদ হাসান।