default-image

এ বছর ছিল টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৩তম আয়োজন। ১৯৮৫ সালে এশিয়ার সবেচেয়ে নামী এই চলচ্চিত্র উৎসব যাত্রা শুরু করলেও প্রথম তিনটি আয়োজন দুই বছরের বিরতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় উৎসবের সংখ্যাগত হিসাবের দিক থেকে এবারের আয়োজন হচ্ছে ৩৩তম। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে বড় কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি এই আয়োজনকে। ফলে প্রতিবছর এর কলেবর কিছুটা বৃদ্ধিই পেয়েছে। তবে এবারের উৎসব সেদিক থেকে ছিল একেবারেই ভিন্ন।
বিশ্বজুড়ে এখন চলছে করোনাভাইরাস–আতঙ্ক। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনার লড়াইয়ে মানুষ এখনো সফল হতে পারেনি। করোনা বিঘ্নিত করে চলেছে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এরই অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি হিসেবে চলচ্চিত্রের জগতেও পড়ছে করোনার কালো ছায়া।
রোগ যেহেতু ছড়াচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে, ফলে মানুষ এখন আগের মতো দর্শকসমাগমের জায়গায় সহজে এবং নিশ্চিন্তে যেতে পারছে না। এর বাইরে ভ্রমণের ওপরও নেমে এসেছে নানা রকম নিয়ন্ত্রণ। এসব বাস্তবতাকে হিসাবের মধ্যে রেখে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অধিকাংশ চলচ্চিত্র উৎসব অনলাইনেই আয়োজন সেরে ফেলছে। তবে জাপানের রাজধানীতে সদ্য শেষ হওয়া ৩৩তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনলাইনের পাশাপাশি সরাসরি আয়োজনও রেখেছিল বিশেষ একটি বার্তা দিতে। আর উদ্যোক্তাদের সেই বার্তা হচ্ছে, তাঁরা মনে করেন, শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও মানবসমাজ এর সবটাই কাটিয়ে উঠতে সংকল্পবদ্ধ। উদ্যোক্তারা মনে করেছেন, এই উৎসবের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বার্তা তাঁরা বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিতে চান।

বিজ্ঞাপন

তবে উৎসবস্থলে স্বাস্থ্যবিধির কড়াকড়ি ছিল। কঠোর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সার্বক্ষণিকভাবে মাস্ক পরা এবং সিনেমা হলে প্রবেশ ও হল থেকে বের হওয়ার পথে হাত জীবাণুমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রেখেই কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

জাপানি ছবির পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রদর্শনীকক্ষে উপস্থিত থেকে সাংবাদিক আর দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকায় বিদেশের যেসব ছবি এবারের উৎসবে যোগ দিয়েছে, সেই সব ছবির নির্মাতা বা কুশলীদের কেউ টোকিও আসতে না পারায় উৎসব চলাকালে অনলাইনে এঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। তাতে উৎসবের রঙে একটু ভাটা পড়লেও মেনে নিয়েছেন সবাই। অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, এবারের আয়োজন হচ্ছে হাইব্রিড বা মিশ্র। এ রকম নানা নতুনত্বকে মেনে নিয়েই ১১ নভেম্বর সফল সমাপ্তি টেনেছে ৩৩তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

default-image

বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার উৎসবের কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। আগের মতো তিনটি প্রতিযোগিতা বিভাগ এবারের উৎসবে ছিল না। এর বদলে উৎসবের জন্য জমা পড়া ১০৭টি দেশ ও ভূখণ্ডের মোট ১ হাজার ৩৫৬টি ছবি থেকে বাছাই ৩২টি বাছাই ছবির মধ্যে সেরা একটি ছবি নির্বাচিত করার দায়িত্ব দর্শকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আরও ১০৬টি ছবি ১০ দিন ধরে চলা প্রদর্শনীর সময় নির্বাচিত কয়েকটি হলে দেখানো হয়। আর তাই এবারের উৎসবে পুরস্কার ছিল শুধু একটি।

কাটছাঁট আয়োজন ও সেই সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে ভীতি সত্ত্বেও দর্শকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পান আয়োজকেরা। ১০ দিন ধরে দেখানো ১৩৮টি ছায়াছবিতে মোট দর্শক হয়েছিল ৪০ হাজার ৫৩৩ জন। এক বছর আগে স্বাভাবিক সময়ের উৎসবে ১৮৩টি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী হয়, দর্শক ছিলেন ৬৪ হাজার ৪৯২ জন।

default-image

দর্শকদের ভোটে এবার শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার জিতে নিয়েছে জাপানি পরিচালক আকিকো ওকুর ‘হোল্ড মি ব্যাক’। সমকালীন টোকিওর কর্মজীবী এক নারীর জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের কিছুটা হাস্যকর উপস্থাপনার এই ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নন। পরিচালক এবং নায়িকা দুজনেই সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। পুরস্কার গ্রহণের পর নিজের অনুভূতির বর্ণনা দিয়ে পরিচালক আকিকো ওকু বলেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মুখে দুর্দিনের এই সময়ে দর্শকেরা যে টিকিট কেটে ছবি দেখতে এসেছেন, সে জন্য তিনি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। অভিনেত্রী নন বলেন, এবারের উৎসবে দর্শকদের বাছাই ছবির পুরস্কারটি একমাত্র পুরস্কার হওয়ায় দর্শকেরা তাঁর অভিনীত ছবিটি বেছে নেওয়ায় তিনি অভিভূত।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দেওয়া সমাপনী ভাষণে উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান হিরোইয়াসু আন্দো মহামারি সত্ত্বেও প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত হয়ে ছবি দেখার জন্য দর্শকদের ধন্যবাদ জানান এবং উৎসবের সফল সমাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করে পরবর্তী উৎসবের ঝামেলামুক্ত আয়োজন প্রত্যাশা করেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0