ঢাকার চলচ্চিত্রের ৬০তম বর্ষপূর্তি...

মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রের পোস্টার
মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্রের পোস্টার

ঢাকার চলচ্চিত্রের হীরকজয়ন্তী উদ্‌যাপনে আমাদের উদ্যোগের কথা শুনে গত সপ্তাহে অভিনেত্রী কবরী বললেন, ‘তোমরা কেন? এই উদ্যোগ তো এফডিসির নেওয়ার কথা!’
বললাম, ঢাকার চলচ্চিত্রের হীরকজয়ন্তী উদ্‌যাপিত হতে যাচ্ছে, যেভাবেই হোক—এটাই কি গুরত্বপূর্ণ নয়?
১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট আবদুল জব্বার খান পরিচালিত মুখ ও মুখোশ এই অঞ্চলের মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় বিপুল উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়। সেই ধারায় আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের সূচনা হয় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে। যা পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে।
একটু পেছনে ফিরে যাই। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের যাত্রারম্ভ হয়। আর ভারতে চলচ্চিত্র তো ১৯১৩ সাল থেকেই দর্শকদের মনোরঞ্জন করে আসছে। ভারত ও পাকিস্তানের ছবির একচ্ছত্র বাজার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা ছিল ভারত ও পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে একটি নিরাপদ ও সুর‌ক্ষিত বাজার। ঢাকায় তখন চলচ্চিত্র নির্মাণে স্টুডিও ও প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় প্রতিবেশী দেশের আমদানিকৃত ছবির ওপরই ঢাকার চলচ্চিত্র দর্শক ও সিনেমা হলগুলো নির্ভরশীল ছিল। ১৯৫০-এর গোড়ার দিকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মিলে প্রায় ১০টির মতো সিনেমা হলে পাকিস্তান-ভারতের ছবির রমরমা ব্যবসা ছিল। ১৯৫৩ সালে ঢাকার সংস্কৃতি অঙ্গনের মঞ্চনাটকের অন্যতম প্রাণপুরুষ আবদুল জব্বার খান তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সহযোগিতায় মুখ ও মুখোশ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে একটি আইমো ক্যামেরা এনে চিত্রগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। ঢাকায় কেবল মুখ ও মুখোশ-এর শুটিং ও গান রেকর্ডিং করা সম্ভব হয়েছিল। ল্যাবের যাবতীয় কাজ লাহোরের শাহনুর স্টুডিওতে সম্পন্ন করা হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় মাত্র এক লাখ দশ হাজার টাকায় নির্মিত মুখ ও মুখোশ ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা ফজলুল হক, ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি পরিচালকের হাতে প্রথম সবাক বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয় অতঃপর। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের দুটি হল ছাড়াও মুখ ও মুখোশ ছবিটি চট্টগ্রামের নিরালা ও খুলনার উল্লাসিনী হলে প্রায় চার সপ্তাহ প্রদর্শিত হয়।

বাঙালিসমগ্র জাদুঘর চলতি বছর আগস্ট মাসে ঢাকার চলচ্চিত্রের ষাট বছর পূর্তির লগ্নে এই উদ্‌যাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়। ভাষা, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ক্রীড়ার মতো চলচ্চিত্রও আমাদের সমাজকে তার সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

মাস খানেকের প্রস্তুতিতে বিগত ষাট বছরে আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিস্তৃত কর্মযজ্ঞকে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে আনা আয়াসসাধ্য নয়। সবার সহযোগিতায় এ কাজে অবতীর্ণ হয়ে বলা যায়, কোনো প্রতিকূলতার সম্মুখীন হইনি আমরা, এখনো।

জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রের পোস্টার
জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রের পোস্টার

সমস্যাটা অন্য জায়গায়, যেমন ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের অনেক স্মরণীয়, উল্লেখযোগ্য ছবির প্রিন্ট নেই, থাকলেও নিম্নমানসম্পন্ন। পোস্টার আর ফটোসেটও নেই। আমাদের চলচ্চিত্রের গৌরবোজ্জ্বল এবং উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা মধ্য ষাট থেকে শেষ সত্তর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শেষ সত্তর থেকে রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের দরুন চলচ্চিত্রের সৃজনশীল ধারাটি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত ও বাধাগ্রস্ত হয়। লাহোর ও মুম্বাইয়ের ১৯৫০ ও ৬০ দশকের আজগুবি, ফোক ও ফ্যান্টাসিনির্ভর চলচ্চিত্রের ঢাকাই সংস্করণ ঢাকার চিরসবুজ, স্নিগ্ধ, সামাজিক ও বক্তব্যধর্মী ছবিকে আশির দশক থেকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমান্বয়ে।
আবদুল জব্বার খানের মুখ ও মুখোশ থেকে শুরু হওয়া ঢাকার ছবির যাত্রাপথ ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আসিয়া, পর্যায়ক্রমে গোটা ষাট দশকে কাচের দেয়াল, কখনো আসেনি, সূর্য স্নান, রূপবান, সুতরাং, কাগজের নৌকা, বেহুলা, ময়নামতি, দর্পচূর্ণ হয়ে ১৯৭০ সালে জীবন থেকে নেয়া ছবির মাধ্যমে পরিপুষ্ট ও বেগবান হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সাল থেকে ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, আবার তোরা মানুষ হ, তিতাস একটি নদীর নাম, আলোর মিছিল, লাঠিয়াল, সূর্য কন্যা, সুপ্রভাত, সূর্য গ্রহণ, বসুন্ধরা, গোলাপী এখন ট্রেনে, সারেং বউ, নোলক, ডুমুরের ফুলসূর্য দীঘল বাড়ি—ঢাকার চলচ্চিত্রকে শৈল্পিক ও সামাজিক দুই ধারায় শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়।
আশির দশক-পরবর্তী সময়ে ‘ফোক’ ও ‘ফ্যান্টাসি’ ছবি নির্মাণের পাশাপাশি বলিষ্ঠ বক্তব্যমূলক কিছু সাহিত্যাশ্রয়ী ছবি ঢাকার নির্মাতারা অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে নির্মাণ করেছিলেন। মধ্য নব্বই থেকে ঢাকার চলচ্চিত্রে ‘নতুন’ শিল্পী, কলাকুশলীদের আগমনে আমাদের চলচ্চিত্রের ট্রিটমেন্ট ও বিষয়বস্তু—দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে।
পূর্ণিমা সেন গুপ্ত, জহরত আরা, বিলকিস বারী, সুমিতা দেবী, ফতেহ লোহানী, কাজী খালেক, শবনম, কবরী, রাজ্জাক, সোহেল রানা, শাবানা, সুজাতা হয়ে ববিতা, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর থেকে বর্তমানের মাহিয়া মাহি ও পরীমনি—ছয় দশকের সুবিস্তৃত চলচ্চিত্রশিল্প আমাদের। শত সহস্র জ্ঞানী-গুণী নির্মাতা, চিত্রগ্রাহক, চিত্রনাট্যকার, চিত্র সম্পাদক, রূপসজ্জাকর, শিল্পনির্দেশক, গীতিকার, সুরকার, অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজক আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে ছয় দশক ধরে কাজ করেছেন। তাঁদের সবার সম্মিলিত মেধা, শ্রম ও নিষ্ঠায় আজ শক্ত অবস্থানে আমাদের চলচ্চিত্র।

আগামীকাল ২৮ অক্টোবর, শুক্রবার, সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরে আমাদের চলচ্চিত্রের হীরক জয়ন্তী উদ্‌যাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আপনাকে আমাদের মাঝে পেলে সবিশেষ উৎসাহিত হব। আপনি আসছেন তো।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বাঙালিসমগ্র জাদুঘর